২৫, সেপ্টেম্বর, ২০১৭, সোমবার | | ৪ মুহররম ১৪৩৯

হাতিরঝিলের জোড়া কপোত কপোতীর আবেগী সুখ

৩১ জুলাই ২০১৭, ০১:১১

হাতিরঝিলকে বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন রাজধানীবাসী।  দৃষ্টিনন্দন একাধিক সেতু হাতিরঝিলের সৌন্দর্যকে করেছে বহুগুণে নান্দনিক।  এখানে প্রায় প্রতিদিন-ই হয় প্রেমের জন্ম, কখনো ঘটে প্রেমের মৃত্যু।  প্রেমিক যুগল ঘুরতে এসে তাৎক্ষণিক অভিমান করে সেতু থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। 

দিনের পুরো সময়েই হাতিরঝিলে বেড়াতে আসেন কোনো না কোনো প্রেমিক যুগল।  তবে বিকেল থেকে হাতিরঝিলে রীতিমতো যুগলদের ঢল নামে।  জোড়ায় বসে গল্প
করেন নানা বয়সের যুগল। 

প্রায়-ই খবরে আসে হাতিরঝিলের লেকে ভাসছে কোনো তরুণ বা তরুণীর লাশ।  এর বেশিরভাগই প্রেম ঘটিত।  অনেকের ফাস্ট ডেটিং এখানে।  আবার সারা জীবনের কান্নাও এখানে।  প্রশাসনের চোখ আড়াল করে এখানে চলে অনেক অসামাজিক কাজও।  সব মিলিয়ে এ এক ‘আজব’ বিনোদন কেন্দ্র। 

মাত্র বিশ দিনের পরিচয়।  ধীরে ধীরে জানা শোনা।  এরপর মন বিনিয়য়।  তা এক সময় গড়ায় প্রেমে।  এতোদিন শুধু মুঠোফোনেই কথা হয়েছে।  কিন্তু গতকালই (রোববার) প্রথম একে অপরকে দেখবেন বলে ছুটে এসেছেন।  কিছুক্ষণ এক সঙ্গে ঘুরবেন।  বিনিময় করবেন দু’জনের ভালো লাগার অনুভূতি আর না বলা কথাগুলো।  বলছিলাম রাজধানীর হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা প্রেমিক জুটি (ছদ্মনাম) অপু আর মৌসুমীর কথা।  রোববার বিকেলে হাতিরঝিলের মগবাজার প্রান্তে লেকের ধারে বসে কথা হয় এই জুটির সঙ্গে।  এই প্রেমিক যুগলের দু’জনের বয়স আর কত হবে।  ১৬ থেকে ১৭।  তাতেই তারা বুঝতে শিখেছেন নিজেদের ভালোলাগার বিষয়গুলো।  নিজের অনুভূতিগুলো কার সঙ্গে শেয়ার করবেন সেটাও।  তাইতো প্রথম দেখাতেই জানালেন তাদের ভবিষ্যতের কথাগুলো।  অপু ও মৌসুমীর মতো হাজারো উঠতি প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে প্রথম দর্শনের নিরাপদ বিনোদন কেন্দ্র এই হাতিরঝিল।  সেই সঙ্গে এই হাতিরঝিল তাদের কাছে বিনোদনের উত্তম জায়গাও বটে।  যেখানে রয়েছে অন্তরের জমানো ভালোবাসার আবেগময় বিনিময়।  অপু ও মৌসুমীর পরিচয় জানতে চাইলে অনেকটাই অপ্রস্তত হয়ে যান তারা।  এরপর জানালেন দু’জনের পরিচয়ের গল্প।  কিভাবে তারা দুজনের কাছে প্রিয় হয়ে উঠলেন আর তাদের প্রেমের পরিণতি কোথায় গড়াতে চান তার কথাও। 

তেজগাঁও এলাকায় একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করেন তারা।  সেখানে ভালো-লাগা।  এরপর মুঠোফোন সংগ্রহ করে দু’জনের আলাপচারিতায় প্রেম।  কবে বিয়ে করছেন জানতে চাইতেই অপু জানালেন, বেশি দেরি করতে চান না।  এবার কোরবানির ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাবেন।  গিয়েই বাবা মাকে জানাতে চান নিজের পছন্দ ও বিয়ের কথা। 

মধুবাগ হাতিরঝিলে ঢুকতেই ফ্লাইওভারের নিচে কথা হয় মৌসুমী নামের দর্শনার্থীর সঙ্গে, মৌসুমী জানালেন, হাতিরঝিলে অনেকবার এসেছেন তিনি।  কিন্তু মনের মানুষের সঙ্গে এটাই তার প্রথম ঘুরতে আসা।  এ কারণে অনুভূতিটাও একটু ভিন্ন।  এ দিনে হাতিরঝিলকে একটু ভিন্নরূপে লাগছে বলে জানালেন এই উঠতি প্রেমিকা।  এক সময় হাতিরঝিল ছিল বড় জলাভূমি।  এর উপর দিয়ে চলতো পাল তোলা নৌকা।  পর্তুগিজরা এপথে ঢাকায় এসে তেঁজতুরি বাজার ও তেজগাঁও এলাকায় তাদের বসতি গড়েছিল।  ঢাকার রাজাধিরাজ ভাওয়াল রাজাও এ পথে যাতায়াত করতেন।  জনশ্রুতি আছে, রাজাধিরাজ ভাওয়াল রাজার হাতির পাল স্নান (গোসল) করতে বা পানি খেতে এই জলাভূমিতে বিচরণ করতো।  পরে সেই জলাভূমি লোকমুখে পরিচিতি পায় হাতিরঝিল হিসেবে। 

হাতিরঝিল এখন আর আগের মত নেই।  নেই আগের মত কালো পানির দৌরাত্ম।  পঁচা পানির উৎকট দুর্গন্ধও।  পাল্টে গেছে এর দৃশ্যপট।  উন্নয়নের ছোঁয়া এখনকার হাতিরঝিল জুড়ে।  তৈরি হয়েছে উন্নত রাস্তাঘাট ও ব্রিজ।  যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে বাস সার্ভিস।  যে পানিতে আগে নামাই দুষ্কর ছিল তার উপর দিয়ে এখন চলে ওয়াটার ট্যাক্সি।  আর রাতের বেলা সাত রঙের আলোর ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।  সব মিলে বলা যায় অনেকটাই কল্পনার রাজ্যের মতোই।  কথা হয় হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা আরেক প্রেমিক জুটির সঙ্গে।  বিএফডিসির সামনের হাতিরঝিল অংশে দাড়িয়ে ছদ্মনাম শাহীন জানাচ্ছিলেন তার একান্ত অনুভূতির কথাগুলো।  তিনি বলেন, হাতিরঝিলে প্রায় ঘুরতে আসি।  তবে আজকের ঘুরতে আসাটার মজাটাই আলাদা।  কারণ (প্রেমিকাকে ইঙ্গিত করে) তার সঙ্গে একাকী দর্শণের প্রথম দিন আজ।  কাহীন ও সাফিনা দু’জনই ব্যাংকার।  চাকরি সূত্রেই তাদের পরিচয়।  অফিস শেষ করে আজ তারা দেখা করতে এসেছেন।  শুধু অপু শাহীনের মতো প্রেমিক-প্রেমিকারাই নয়, হাতিরঝিলে ঘুরতে আসেন ব্যস্ত ঢাকার লাখো মানুষ।  তাদের কাছে দিনদিন বিনোদনের উত্তম জায়গা হয়ে উঠছে হাতিরঝিল।  এছাড়াও সাত সকালে ব্যায়াম করার জন্যও অনেকে ছুটে আসেন।  সবমিলে সারাদিন মুখোরিত থাকে হাতিরঝিলের পরিবেশ। 

রোববার বিকেল গড়িয়ে স্বন্ধ্যার ভালোবাসার দৃশ্যপট দেখতে অপেক্ষারত এ প্রতিবেদকের কাছে বিএফডিসি রোডের মাথার হাতিরঝিলের দাবার কোর্টের পাশে লাল নীল আলোকছটা অন্য হাতিরঝিল মনে হচ্ছিল।  এক নং ব্রিজ থেকে হাতিরঝিলের পাড় ধরে বেগুনবাড়ির দিকে যেতেই চোখে পড়ে রাস্তার নিচে লেকের পানির কাছাকাছি জোড়ায় জোড়ায় জুটি, দিনের ভালোবাসার দৃশ্যপটের চেয়ে রাতের প্রেমও একটু আলাদা।  অনেক জুটি দিনের চাইতে রাতের রোমান্স বেশী পছন্দ করে তাই স্বন্ধ্যার অপেক্ষায় থাকে তারা।  লেকের পাড়ে কিংবা ঝিলের পানির খুব কাছাকাছি ঝোঁপের পাড়ে অবস্থান নেয়।  দুইজনের খুব কাছে ঘেঁষে হাতে হাত ধরে বসা দেখলেই মনে হবে এযেন অনন্তকালের চাওয়া পাওয়ার বন্ধন।  অনেক জুটিকে দেখা গেছে হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাবের আদান-প্রদান করছে।  প্রেমিকার কোলে প্রেমিকের মাথা আবার কখনো প্রেমিকের ঘাড়ে পড়ে প্রেমিকার নিঃশ্বাস।  কারো কারো মধ্যে চলে মিষ্টি-মধুর একান্তে খুনসুটি।  আবার যুগলদের মান অভিমান চলে অনেক সময়। 

(দঃ) বেগুন বাড়ির হাতিরঝিলের মুখে রয়েছে হাতির ঝিল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় একটি ফাস্টফুডের দোকান।  রঙ্গিন আলোকসজ্জায় রোমান্টিক পরিবেশ বলা চলে।  ভেতরে প্রেমিক জুটিদের মিষ্টি আলাপচারিতা ও খুনশুটির মাঝে কথা হয় এক জুটির সঙ্গে।  জাহাঙ্গীর ও সোমা (ছদ্মনাম) এসেছেন ধানমন্ডি থেকে।  প্রেমের এক বছরের চেনা জানা এমনটাই বললেন প্রেমিক জাহাঙ্গীর।  তিনি হাতিরঝিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কথা স্বীকার করে বলেন, এখানে একান্তে কাছের মানুষকে নিয়ে সবাই আসে।  অনেকের কাছে বিষয়টি দৃষ্টিকটু একান্তে বসা, হাতে হাত রাখা, খুনশুটি করা, কোলে মাথা রাখা, কিন্তু এটা প্রিয় মানুষটির প্রতি আবেগ-ভালোবাসায় হতে পারে।  তিনি বলেন, হাতিরঝিলের চলাচলের রাস্তায় একান্তে বসা যায় না তাই আমি নিজেও নিচে নেমে বসলাম।  সেখানেও নিরাপত্তা কর্মীরা কিছুক্ষণ আগে খারাপ ব্যবহার করে উঠিয়ে দিল।  তাই উপরে উঠে এসে এখানে বসলাম।  মনে হচ্ছে ভালোবাসতেও অনেক বাধা।