১৫, ডিসেম্বর, ২০১৭, শুক্রবার | | ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

কাঁচা চামড়ায় সয়লাব হাজারীবাগ

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৮:২২

রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা কাঁচা চামড়ার উৎকট গন্ধে ভরে আছে।  পুরো এলাকার রাস্তা, অলি-গলি, ঘর-বাড়ির আশেপাশে গরু- মহিষ-ছাগলের শিং, কান ও লেজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।  আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও চলছে পশুর চামড়ায় লবণ মাখানোসহ আনুষঙ্গিক কাজ।  কেউ কেউ এখানে কাঁচা চামড়া কিনে এনে মজুদ করছেন।  রবিবার সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় এমন চিত্র দেখা গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাজারীবাগের ১৫৫টি কারখানার নামেই সাভার চামড়া শিল্পে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।  কিন্তু সব কারখানা
সেখানে স্থানান্তর করা হয়নি।  ফলে এ সব কারখানার মালিকই পুরনো কারখানা ভবন খুলে কাঁচা চামড়া প্রসেসিংয়ের কাজ করছেন।  কেউ কেউ সেই ভবনে চামড়া কিনে মজুদ করারও পরিকল্পনা করছেন।  অথচ হাজারীবাগে যেকোনও ধরনের চামড়া প্রবেশ উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।   ওই আদেশের পরও পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে কাঁচা এনে জড়ো করা হচ্ছে হাজারীবাগে।  এই কাজে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও বাধা আসেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

জানতে চাইলে হাজারীবাগের সোনার বাংলা ট্যানারির পরিত্যক্ত ভবনের কেয়ারটেকার আব্দুল হালিম বলেন, ‘সাভারে প্লট পাওয়া গেছে।  সেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে।  কারখানায় মেশিনপত্র বসানোর কাজ চলছে।  উৎপাদনের জন্য সাভারের কারখানা শতভাগ উপযোগী হয়নি।  তাই এখানেই চামড়ার প্রাথমিক কাজটি করা হচ্ছে।  এখান থেকে সব চামড়াই সরিয়ে নেওয়া হবে।  সাময়িকভাবে কাঁচা চামড়ার কিছু প্রসেসিংয়ের কাজ করে রাখা হচ্ছে। ’

এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল হালিম বলেন, ‘আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে, জানি।  আর জানি বলেই হাজারীবাগের  কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।  এখানে এখন আর কোনও পণ্য উৎপাদন করা হয় না।  এসব কারখানার মেশিনপত্র খুলে নেওয়া হয়েছে।  তাই শুধু চামড়ায় লবণ লাগানোর কাজটি করা হচ্ছে।  হয়তো সাভারের কারখানা চালু না হওয়া পর্যন্ত এখানে চামড়াগুলো সংরক্ষণ করা হতে পারে।  এতে তো দোষের কিছু দেখি না। ’

হাজারীবাগের স্থানীয় বাসিন্দা ২১৩/১১ (ক) প্লটের মালিক জামসেদ জমাদার বলেন, ‘কয়েকদিন তো ভালো ছিলাম।  কোনও গন্ধ ছিল না।  পরিবেশও উন্নত হচ্ছিল।  কিন্তু এবারের কোরবানির দিন থেকেই আবার কাঁচা চামড়া প্রসেসিং শুরু হয়েছে।  আবার সেই উৎকট গন্ধে পুরো এলাকা ভরে উঠেছে।  নাক না চেপে হাঁটাই মুশকিল। ’

এক প্রশ্নের জবাবে জামসেদ জমাদার বলেন, ‘পুলিশকে অভিযোগ করে আর লাভ কী? পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই তো গতকাল সকাল থেকেই চামড়া প্রবেশ করেছে।  কই কোনও ব্যবসায়ীকে চামড়া নিয়ে হাজারীবাগে ঢুকতে পুলিশ বাধা দিয়েছে বলে তো শুনিনি!’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাজারীবাগ থানার ডিউটি অফিসার জানিয়েছেন, ‘কেউ এখন পর্যন্ত অভিযোগ করেনি।  অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে চামড়াবাহী পিকআপ হাজারীবাগে ঢুকছে, এমন দৃশ্য তার চোখে পড়েনি বলেও জানান ডিউটি অফিসার।           

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৬ মার্চ বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা এক আবেদনের শুনানি শেষে সাভারে স্থানান্তরের নির্দেশনা থাকা রাজধানীর হাজারীবাগে সব ট্যানারি বন্ধের নির্দেশনা দেন আদালত।  একইসঙ্গে কারখানাগুলোয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ সব ধরনের সেবা বিচ্ছিন্ন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়। 

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুসারে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর না হওয়ায় ট্যানারি মালিক ও সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে হাইকোর্টে ‘আদালত অবমাননা’ মামলা করেন পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে আইনজীবী মনজিল  মোরসেদ। 

ওই আবেদনে গত বছরের ১৬ জুন ১৫৪টি ট্যানারি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। 

পরে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার ও  লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়ার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের করা আপিল আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ক্ষতিপূরণ পুনঃনির্ধারণ করে দেন। 

এদিকে গত ৪ মার্চ বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর না হওয়ায় পরিবেশ দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বকেয়া ৩০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা দুই সপ্তাহের মধ্যে ১৫৪ ট্যানারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধের নির্দেশ দেন। 

পরিবেশ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে হাজারীবাগের ২০৫টি ট্যানারির সব ধরনের সেবাসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।  এর আগের দিন কাটা হয়েছিল অধিকাংশ কারখানার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন।  এসব কারখানার টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় তার আগের সপ্তাহে।