১৯, নভেম্বর, ২০১৭, রোববার | | ২৯ সফর ১৪৩৯

ক্রিকেট মাঠে চোখ রাঙানি! মাশরাফিকে ধন্যবাদ

১০ নভেম্বর ২০১৭, ১০:৪০

রেজানুর রহমান: কাজের ফাঁকে ফাঁকে টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম।  বিপিএলের ৬ষ্ঠ দিনে চট্টগ্রাম ও রংপুর দলের খেলায় হঠাৎ উত্তেজনা লক্ষ করলাম।  মাশরাফিকে কে ধমক দিচ্ছে? একটু খেয়াল করতেই দেখলাম, চট্টগ্রাম দলের তরুণ পেসার শুভাশীষ রায় ক্ষেপে উঠেছেন মাশরাফির ওপর।  ক্রিকেটের মতো উত্তেজনাপূর্ণ খেলায় এ রকম হতেই পারে।  কিন্তু মাশরাফিকে কেউ খেলার মাঠে ধমক দেবেন, তাও আবার দেশেরই তরুণ খেলোয়াড়দেরই একজন, এটা মেনে নিতে পারছিলাম না।   মাশরাফিকে শুধু ধমকই দিলেন
না শুভাশীষ, দুই একবার মাশরাফির দিকে তেড়েও গেলেন। 

পরিস্থিতি দেখে আমাদের অফিসের এক ক্রিকেট-পাগল তরুণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো, দেখেছেন! দেখেছেন! কত্তো বড় বেয়াদব! মাশরাফির সঙ্গে ঝগড়া করে! মাশরাফি কে, সে তা জানে না? তাকে তাৎক্ষণিকভাবে থামিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি এভাবে ক্ষেপে যাচ্ছ কেন? খেলার মাঠে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়।  মাশরাফি সিনিয়র খেলোয়াড়, জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন বলে কি অন্যায় করলে তাকে কিছু বলা যাবে না? আমাদের তরুণ সহকর্মী আর কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালো না।  তবে ব্যাপারটা সে মোটেই মেনে নিতে পারেনি, এটা বোঝা যাচ্ছে।  খেলা শেষে মাশরাফির দল হেরে গেছে।  টিভিতে বার বার তার বিষণ্ন মুখের ছবি দেখাচ্ছে।  শুধু কি পরাজয়ের জন্য এই বিমর্ষতা? নাকি তরুণ সতীর্থ খেলোয়াড়ের ধমক সহ্য করতে পারছেন না? কী ঘটেছিল মাঠের খেলায়? মাশরাফি কি সত্যি সত্যি অন্যায় করেছিলেন? আর যদি অন্যায় করেও থাকেন, শুভাশীষের মতো তরুণ খেলোয়াড় কি এতটাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন? বার বার শুভাশীষের পক্ষে নিজেকে দাঁড় করাতে চাইলাম।  কিন্তু কেন যেন তা সম্ভব হলো না।  বার বার মাশরাফির করুণ মুখটাই চোখের সামনে ভাসছে। 

ঘটনার ব্যাপারে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় মাশরাফির প্রতিক্রিয়া পড়ে আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না।  এই না হলে মাশরাফি! এক প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি বলেছেন, ‘ওটা সিরিয়াস কিছু নয়।  ম্যাচের উত্তেজনার সময় এমন হতেই পারে।  আমি মনে করি, আমার তাকে (শুভাশীষকে) স্যরি বলা উচিত।  ওর জায়গা থেকে ও ঠিক আছে।  আমিও জিততে চেয়েছি, সেও জিততে চেয়েছে।  তার ওপর ও ছোট।  আমারই উচিত ছিল মাথা ঠাণ্ডা রাখা। ’

এমন মন্তব্যের জন্য মাশরাফিকে অনেক ধন্যবাদ।  এই ধরনের উদারতা মাশরাফির পক্ষেই দেখানো সম্ভব।  তিনি তো ঘটনাটা উল্টোভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারতেন।  শুভাশীষের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারতেন।  বলতে পারতেন, মাঠে শুভাশীষের ব্যবহারে খুব কষ্ট পেয়েছি।  ওর মতো তরুণ খেলোয়াড় আমার মতো একজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের সঙ্গে এ ধরনের ব্যবহার করবে, তা আশা করা যায় না।  এ ধরনের আরও কত কী বলতে পারতেন মাশরাফি।  অথচ মাশরাফি সেদিকে এক পাও হাঁটেননি।  সমস্ত দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে বলেছেন, আমারই উচিত ছিল মাথা ঠাণ্ডা রাখা। 

এই যে মাথা ঠাণ্ডা রাখার কথা বলা হলো, আমরা ক’জন তা পারি? এ ক্ষেত্রে মাশরাফির উদারতা সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।  প্রসঙ্গ ক্রমে কিছু শঙ্কারও কথা বলি।  ক্রিকেট দারুণ রকমের উত্তেজনাপূর্ণ খেলা।  এই খেলায় জেতার জন্য ভাইকেও ভাই ছাড় দেয় না।  কাজেই শুভাশীষ যা করেছে, তা অশোভন কিছু নয়।  তবু প্রশ্ন থেকেই যায়।  ক্রিকেট চরম উত্তেজনাপূর্ণ খেলা বলেই কি ভদ্রতা, নম্রতা ও শিষ্টাচারের কোনও চর্চা গুরুত্ব পাবে না।  অন্য দেশে কী হয়, তা বলতে পারব না।  আমাদের দেশে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা তরুণদের আইডল হয়ে উঠেছেন।  আমাদের ক্রিকেটারদের জীবনাচরণ তরুণদের আকৃষ্ট করে। 

ধরা যাক, মাশরাফি ও শুভাশীষের ঘটনায় কোনও তরুণ উদ্বুদ্ধ হলো তার বয়োজ্যেষ্ঠ কারও বিরুদ্ধে অশোভন আচরণ করতে।  সে যদি হঠাৎ বলেই ফেলে, শুভাশীষ তো আমাদের মাশরাফির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছে।  কাজেই আমি করলে দোষ কোথায়?

বালাইষাট! কেউ যেন মাশরাফি ও শুভাশীষের ঘটনা থেকে নেতিবাচক কিছু গ্রহণ না করে।  ঘটনাটিকে ইতিবাচক হিসেবেই যেন দেখে।  মাশরাফি তো বলেই দিয়েছেন, ‘আমার উচিত হয়নি মাথা গরম করা’।  ক’জন এমন সত্য ভাষণ দিতে পারে? বাংলাদেশের ক্রিকেটের জয় হোক।  সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার