১৫, ডিসেম্বর, ২০১৭, শুক্রবার | | ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

স্কুলে ছাত্রলীগের ‘স্কুল কমিটি’ গঠনে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক

২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:০৯

দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ‘স্কুল কমিটি’ গঠন করতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ আসার পরপরই এ নিয়ে ফেসবুকে শুরু হয়  তুমুল বিতর্ক।  মাধ্যমিক পর্যায়ে কমিটির প্রয়োজন আছে কিনা সে নিয়ে যেমন তর্ক ওঠে।  আবার এই পর্যায়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শাখা থাকলেও ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠবে, এ নিয়ে চলছে যুক্তি উপস্থাপন। 

মঙ্গলবার (২১ নভেম্বর) ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত 
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ‘স্কুল কমিটি’ গঠনের বিষয়টি  জানানো হয়। 

সাংবাদিক আরিফ মাহমুদ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কারও কিছু বলার আছে? গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি, তাই আমাদের স্কুলপড়ুয়া সন্তানদের সেই সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে! কিছু বলার না থাকলে কমেন্টে অন্তত মারহাবা না লিখে যাবেন না।  ধন্য দেশ! অনেককে ট্যাগ করেছি এই পোস্ট।  আপনাদের কাছে প্রশ্ন, আপনারা কি চান ১২-১৪ বছরের মাধ্যমিকে পড়া ছেলে-মেয়েরা রাজনীতি করুক, ক্যাডার হয়ে উঠুক?  এরকম না চাইলে প্লিজ সবাই মিলে আওয়াজ তুলুন, প্রতিবাদ করুন, রুখে দিন।  আমরা সবাই মতামত দিলে সরকার বাহাদুরের সেটা না শুনে উপায় নেই । ’

একের পর এক নেতিবাচক পোস্টের বিপরীতে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল লিখেছেন, ‘ছাত্রলীগের স্কুল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তে ব্যাপক নেতিবাচক সমালোচনা দেখতেছি! মনে হয় ছাত্রলীগ নামটাই ভয়ানক কিছু! শিবির, ছাত্র ইউনিয়ন সবাই স্কুল লেভেলেই ফিশিং করে।  স্কুল কমিটি ছাত্রলীগের জন্ম থেকেই ছিল।  এর উদ্দেশ্য রাজনৈতিকভাবে সচেতন একটা প্রজন্ম তৈরি করা।  আমরা যেন ভুলে না যাই, বঙ্গবন্ধুও স্কুলজীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিছেন।  টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিরেই যারা ছাত্র রাজনীতি মনে করে তাদের রাজনৈতিক জ্ঞান আরেকটু ঋদ্ধ হওয়া জরুরি।  সমস্যা সমাধানে সংকটের গোড়ায় হাত দেওয়া হইতেছে।  বি পজিটিভ।  জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু...। ’

একাত্তর টেলিভিশনের পরিচালক (বার্তা) সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন নিয়ে কত সমালোচনা হচ্ছে! কিন্তু বহুদিন ধরেই স্কুল পর্যায়ে শিবিরের রাজনীতি আছে, বাম সংগঠনগুলোর আছে... সেগুলো থাকতে পারলে, ছাত্রলীগের থাকবে না কেন? সামগ্রিকভাবে ছাত্র রাজনীতির চরিত্র বদলানো নিয়ে আলাদা আলোচনা হতে পারে...। ’

অভিভাবক ও সাংবাদিক নাজনীন মুন্নী শঙ্কার কথাগুলো জানিয়ে তার পোস্টে লিখেছেন, ‘স্কুলে ১১ বছর বয়সে আমার বাচ্চাকে বিসিএস-এর প্রশ্ন দেবেন পরীক্ষায়।  আমি কিছু বলতে পারবো না।  সারাদিন-রাত পড়াশুনা করে প্রশ্নফাঁসের ফাঁসি নিয়ে ফেলু ছাত্রের জিপিএ পাওয়া দেখবো।  আমার কিছু বলার থাকবে না।  এসএসসির আগে আরও দুটো বোর্ড পরীক্ষা জেতাতে কোচিং এ লাখ টাকা ব্যয় করবো!! আমি বাধ্য কারণ, আমার সন্তানের ভালো আমার চেয়ে রাষ্ট্র নাকি বেশি চায়।  চুপ থাকি... কিন্তু এই ভয়াবহ বিজ্ঞপ্তি দেখে আমি পাথর হয়ে গেছি!!!! এখন কি আমার শিশুকে রাজনীতিও করতে হবে?! আমার বাচ্চা।  কষ্টের টাকায় নিজে না খেয়ে আমি পালি।  এই শিশু লালন-পালনে কতটা ভাগ আপনার, যে আপনার কথামতো সে চলতে বাধ্য? আপনার কাছে খুচরা আলাপ, আমার আর আমার সন্তানের জীবন মরণ।  মার চেয়ে মাসির দরদ বেশি হয়ে যাচ্ছে।  মা হয়ে এই দরদ নেওয়া যাচ্ছে না। ’

মুন্নীর পোস্টে সাংবাদিক সাইফুল হাসান রিকু ফেসবুক কমেন্টে লিখেছেন, ‘সত্যিকারের নাগরিক, দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে রাজনীতি করাই উচিত আমাদের।  রাজনীতি বিমুখ বলেই দেশটার এই অবস্থা।  বর্তমান রাজনীতি বদলাতে হলেও তা রাজনীতি দিয়েই করতে হবে।  প্রাকটিস শুরু হতে হবে কৈশোর থেকেই।  তোমার উদ্বেগের কারণটা আমি বুঝি ও স্বীকার করি।  কিন্তু এই উদ্বেগও দূর করতে পারে কেবলই রাজনীতি।  গণমুখী, কল্যাণকর, মানবিক রাজনীতি। ’

যুব ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত বাম রাজনৈতিককর্মী খজিস্তা বেগম জোনাকি তার পোস্টে লিখেছেন,‘শঙ্কার জায়গাগুলো কী।  ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির নির্দেশ নতুন কিছু নয়।  এটি আগেও ছিল।  অনেকেই বিষয়টিকে দারুণ নেতিবাচকভাবে দেখছেন।  অনেক কারণেই সেটি আমিও মনে করি, স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি তৎপর হলে এক ধরনের আশঙ্কা আছেই।  কারণ, এই ছাত্র সংগঠনটির প্রাকটিস হলো- দম্ভ দেখানো, পাওয়ার ব্যবহার আর বাণিজ্যকরণে ব্যস্ত।  প্রকৃত স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতির কোনও চর্চা নেই।  আর তাদের বড় দল ক্ষমতায় থাকলে তো অঅরও কাজই নেই।  বন্ধুদের জন্মদিন, নেতার জন্মদিন, দিবস পালন- এইসব কর্মসূচির বাইরে কাজ নাই।  পড়াশোনাও করে না।  ইতিহাস জ্ঞান হাস্যকর।  বর্তমান ছাত্রলীগের নেতৃত্বের মান বিবেচনা করেই বলছি।  আর সে অবস্থায় স্কুল কমিটির তৎপরতা নিয়েই উৎকণ্ঠা।  আমি যে ছাত্র সংগঠন করেছি এবং ছাত্র ইউনিয়নের প্রাকটিসে এ দফতরটি জেলা ইউনিটের শক্তিশালী অবস্থান।  সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট আর ছাত্রশিবিরও স্কুলের কমিটিকে প্রাথমিক বুনিয়াদি ধাপ মনে করে।  স্কুলে ছাত্রদের এ বিকাশ বিভিন্নভাবে তরান্বিত করা যায়।  নেতৃত্ববিষয়ক প্রশিক্ষণ, বইপড়া, ক্রিয়েটিভ লেখা কম্পিটিশনের মাধ্যমে।  যাক, নিশ্চয়ই ছাত্রলীগের স্কুল পর্যায়ের কমিটিগুলো এসব বিবেচনা করবে।  জাতিসংঘের শিশুসনদ বা জাতীয় শিশু উন্নয়ন নীতিতে সরকার আন্তর্জাতিক বা দেশীয় পলিসিতে স্বাক্ষর করা দেশ।  কোনও কারণেই শিশুদের রাজনীতিতে ব্যবহার করা যাবে না।  এটিও মাথায় রাখতে হবে।  আমার আরেকটি প্রশ্ন- যারা বিশ্ববিদ্যালয় গেটে রাজনীতি আর ধূমপানমুক্ত লেখেন, তাদের ব্যাপারে ছাত্রলীগ কিছু বলে না কেন।  রাজনীতি করা তো একজন ছাত্রের গণতান্ত্রিক অধিকার।  আর  তাকে তো সিগারেটের মতো বদঅভ্যাসের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক না।  এত কথা বললাম, ঐতিহাসিক ছাত্র সংগঠনের সমালোচনা না, দায়িত্বকে মনে করিয়ে দিতে।  নিশ্চয়ই জয় বাংলা। ’

বাংলা ট্রিবিউন