১৪, ডিসেম্বর, ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ ঠেকানো ‘পাঠাও চালকের’ আজানা গল্প

৩০ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২৮

রাজধানী ঢাকার যানজটে স্বস্তির বাহন মোটরসাইকেল।  এ কারণে গত এক বছরে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিংয়ের সুযোগ করে দিয়ে সাধারণের মাঝে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে পাঠাও।  অ্যাপভিত্তিক এই সার্ভিস জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী অনেকেই পাঠাওয়ের চালক হিসিবে বাড়তি উপার্জন করছেন।  তাদেরই একজন সাংবাদিক, লেখক ও সাহিত্যক আল মামুন সোহাগ। 

ফেসবুক এবং ব্লগে নিধিরাম সর্দ্দার হিসেবেই বেশি পরিচিত তিনি। 
নড়াইলে বেড়ে উঠা সোহাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগে ২০০২-২০০৩ সেশনে স্নাতক এবং ২০০৬-২০০৭ সেশনে স্নাতকোত্তর ভর্তি হন।  পেশায় ছিলেন একজন সাংবাদিক।  সাংবাদিকতার পাশাপাশি মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন চলতি বছরের এপ্রিলে। 

শুরুটা করেছিলেন মোটরসাইকেলের খরচ উঠানোর চিন্তা থেকেই।  চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয় করতে ক্রমেই এখানে সময় একটু বাড়িয়ে দেয়ার চিন্তা করেন তিনি।  পর্যায়ক্রমে পাঠাও সার্ভিসের মাধ্যমে ভালো টাকা আয় করতে শুরু করে তিনি। 

আল মামুন সোহাগ জানান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করে প্রতিদিন খরচ বাদে গড়ে ৫০০ টাকা আয় হয়।  বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সময় দেন তিনি।  এই সময়ের মধ্য প্রতিদিন তিনি ৫-৬ টি রাইড শেয়ার করে থাকেন।  এখন পর্যন্ত তার রাইড সংখ্যা ৮ শতাধিক। 

“বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশের তরুণ সমাজেরও দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন এসেছে।  তারা এখন পড়ালেখার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে রাইড শেয়ার করে থাকেন।  এমনকি মেয়েরাও রাইড শেয়ার করে এখন এই সুযোগ গ্রহণ করছেন।  সেটা সত্যি আমাদের জন্য ইতিবাচক” বলেন নিধিরাম সর্দ্দারখ্যাত এ তরুণ। 

পাঠাও চালক হিসেবে ইতোমধ্যে তার হয়েছে নানা রকমের অভিজ্ঞতা।  তারমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আল মামুন সোহাগ বলেন, ‘চলতি মাসের শুরুর দিকে রাজধানীতে চলন্ত গাড়ির ভেতর ধর্ষণের শিকার হতে যাওয়া একজন নারীকে বাঁচাতে পেরেছি।  হয়তোবা পাঠাও ব্যবহার না করলে এটা সম্ভব হতো না।  কেননা পাঠাও-এর চালক না হলে হয়তো ওই মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতাম না। ’

ঘটনার বিস্তারিত জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নভেম্বরের ৮ তারিখ রাত আনুমানিক দশটা।  নীলক্ষেত থেকে আমার কাছ থেকে ‘পাঠাও রাইড’ নিয়েছেন মফিজুর নামের এক ব্যক্তি।  আলাপে পরিচয় হলো তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সিনিয়র ছিলেন।  এখন একটি মন্ত্রণালয়ে চাকরি করছেন।  ওনাকে টেকনিক্যাল মোড় হয়ে সনি সিনেমা হলের সামনে নামিয়ে আমি বাসায় যাবো।  আমাদের বাইক টেকনিক্যাল মোড় পার হওয়ার পর পাশ দিয়ে যাওয়া একটি বাসের ভিতর এক নারীর চিৎকার শুনতে পাই।  মফিজুর ভাই বললেন, “বাসের সামনে গিয়ে বাইক থামান তো।  কোনো ঝামেলা মনে হচ্ছে। ” অনেক কষ্টে ওই গাড়ির সামনে দাঁড়ালাম, কারণ চালক গাড়ি থামাচ্ছিল না। ’

‘‘চলন্ত বাসের ভেতর ওই নারীর এমন চিৎকারে আমরা দু’জন একটু থমকালাম।  মফিজুর ভাই বললেন: এই ড্রাইভার, কী সমস্যা? বাস থামাও।  তারা বললো: জামাই-বউ বাসে উঠে ঝামেলা করতেছে।  আপনারা এর মধ্যে আইসেন না।  একথা বলে আমাদের বাইক পাশ কাটিয়ে বাস টান দিয়ে চলে গেল।  আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম।  সন্দেহ বেড়ে গেলে।  বাসের পিছু নিলাম।  এর মধ্যে আরেকটি লেগুনার লোকজনও বাসের ঘটনা খেয়াল করেছে।  ওই লেগুনাটি বাসের সামনে গিয়ে ব্রেক করলো।  আমিও পাশে গিয়ে ব্রেক করলাম।  বাসের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করা।  সমস্ত লোকজন বাসের দরজা ধাক্কাধাক্কি করতে লাগলাম। ”

পরের দৃশ্যপট বর্ণনা করতে গিয়ে আল মামুন সোহাগ বলেন, ‘এই ঘটনা দেখে বাইক নিয়ে দু’জন পুলিশও চলে এসেছে।  ড্রাইভার দরজা খুলতে না চাইলে এবার পুলিশ ওই মেয়েটিকে জানালার কাছে আসতে বললো।  আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাসের মধ্যে কি আপনার স্বামী আছে? তিনি বললেন, না।  আপনারা আগে দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন।  এবার পুলিশ ওই চালকের উপর রেগে গেল।  তিনি বাসে উঠে ড্রাইভারকে বললেন সামনে যেতে। ’

“আমরা উপস্থিত জনতা তবু একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, হয়তো বড় কোনো দুর্ঘটনা থেকে একটি মেয়ে প্রাণে বেঁচে গেল আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগে।  হয়তো তনু, রূপার পরিণতির খুব কাছেই ছিল সে’, বলছিলেন আল মামুন সোহাগ। ”

চোখ-কান খোলা রাখলে এবং বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ালে মানুষরূপী পশুরা কোনভাবেই পার পায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সবাইকে বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। 

আল মামুন সোহাগের এই সাহসী ভূমিকার জন্য তাকে ‘হিরোজ অব পাঠাও’ ঘোষণা করেছে অ্যাপভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান। 

খুলনার নড়াইলে বেড়ে উঠেন তিনি।  স্কুলজীবন পেরিয়ে কলেজে ওঠা পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।  বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সেটা বন্ধ হওয়ায় সাংবাদিকতা থেকে কিছুদিন ধরে দূরে আছেন।  তবে অাবারো সাংবাদিকতায় ফেরার অপেক্ষায় আছেন বলে জানিয়েছেন সোহাগ। 

বর্তমানে একটি পুস্তক প্রকাশনীর এডিটর হিসেবে কাজ করছেন তিনি।  নিজেও গল্প এবং কবিতা লিখেন।  ‘সে প্রথম প্রেম আমার’ নামে একটি বই লিখেছেন তিনি।  আসছে বই মেলায় পত্রিকায় প্রকাশিত তার লেখা ‘১০টি ভূতের ছোট গল্প’ নিয়ে নতুন বই প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এ ‘হিরোজ অব পাঠাও’। 

চ্যানেল আই অনলাইন