১৭, জানুয়ারী, ২০১৮, বুধবার | | ২৯ রবিউস সানি ১৪৩৯

কোটি টাকার কষ্টিপাথরের মূর্তির আসল দাম কত ?

১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:৩৬

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে 'কষ্টিপাথরের' মূর্তি উদ্ধার করা হয়।  উদ্ধার-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্রত্নবস্তুর দাম কোটি কোটি টাকা।  কিন্তু রাসায়নিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষায় এর অন্তত অর্ধেকই ভুয়া বা নকল বলে প্রমাণিত হচ্ছে।   

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রকৃত প্রত্নবস্তুর দাম নির্ধারণের কোনো পদ্ধতি নেই।  কারণ বস্তুগতভাবে উপাদানটির বাজারমূল্য আহামরি কিছু নয়।  প্রাচীনত্বই এর বিশেষত্ব। 
 

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) সহেলী ফেরদৌস সমকালকে বলেন, অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রত্নসম্পদের চোরাচালান ঠেকাতে কাজ করে পুলিশ।  বিভিন্ন সময় কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধার হচ্ছে।  এগুলোর দাম পুলিশ নির্ধারণ করে না।  কারণ পুলিশ এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয়।  প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা এর দাম নির্ধারণ করেন।   

অন্যদিকে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রত্নসম্পদ ও সংরক্ষণ) মো. আমিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, প্রথমত, প্রত্নতত্ত্বের ভাষায় কষ্টিপাথর বলে কিছু নেই।  স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে কালো রঙের পাথরে নির্মিত বস্তুকে এ নামে অভিহিত  করেন। 

প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ওগুলো 'ব্ল্যাক বেসল্ট স্টোন' বা আগ্নেয়শিলা শ্রেণির কালো রঙের পাথর।  দ্বিতীয়ত, কালো পাথরে হলেই সেগুলো প্রত্নবস্তু নয়।  কোনো নমুনা প্রত্নবস্তু কি-না তা নির্ধারণের কিছু স্বীকৃত প্রক্রিয়া আছে।  কিন্তু প্রত্নবস্তু হলেও এর দাম নির্ধারণ করা হয় না।  কারণ এগুলো অমূল্য।   

উল্লেখ্য, আগ্নেয়গিরির লাভা শীতল হয়ে অতি কঠিন শিলায় পরিণত হয়।  তা বিভিন্ন রঙে ও মিশ্রিত রঙে পাওয়া যায়।  কষ্টিপাথর বা নিকষপাথর সোনাসহ কিছু ধাতু যাচাইয়ের কাজে ব্যবহূত হয়।   

প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পুলিশ-র‌্যাব ও আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন নমুনা প্রত্নবস্তু কি-না তা পরীক্ষার জন্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।  এখানে রাসায়নিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেগুলোর প্রাচীনত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।  প্রত্নবস্তু হিসেবে স্বীকৃত হতে গেলে সেই নমুনাটি অন্তত ১০০ বছরের পুরনো হতে হয়।  শুধু পুরনো হলেই চলবে না, সেটি হতে হবে মানুষের তৈরি বা ব্যবহূত উপাদান।  সেটির শৈল্পিক গুরুত্বও থাকতে হবে।  সংগ্রাহকদের কাছে প্রত্নবস্তু বিক্রর জন্য চোরাচালানি চক্র অনেক প্রতারণার আশ্রয় নেয়।  কষ্টিপাথরের মূর্তি, প্রাচীন ধাতব মূর্তি ও মুদ্রা প্রত্নবস্তু হিসেবে অনেক দামে বিক্রি করলেও বেশিরভাগ সময় পরীক্ষায় তার অনেকগুলো ভুয়া প্রমাণিত হয়।   

সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের মাধ্যমে পাওয়া ২৪টি নমুনার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।  এর মধ্যে ১১টিই প্রত্নবস্তু নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।  প্রতি বছরই পরীক্ষার পর অর্ধেক, কখনও তার চেয়েও বেশি নমুনা সাম্প্রতিককালে নির্মিত বলে প্রমাণ হয়।   

রাজধানীর সবুজবাগ থানার ২০১৫ সালের ৯ মের মামলা সূত্রে একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।  জব্দের সময় এটিকে 'কোটি টাকার কষ্টিপাথরের মূর্তি' বলা হলেও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটি কাদামাটির তৈরি সাম্প্রতিক মূর্তি।  এর ভেতরে চুম্বক স্থাপন করা হয়েছিল।  এটা প্রতারকদের কাজ বলে ধারণা সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের।   

একই বছরের ২৯ জুলাই বরগুনার তালতলী থানার মামলার সূত্রে পাঠানো হয় আরেকটি 'কষ্টিপাথরের মূর্তি'।  সেটি পরীক্ষা করেও একই মত দেন বিশেষজ্ঞরা।  ওই বছরের ১৭ এপ্রিল গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী, ১৫ জুন যাত্রাবাড়ী, ৫ আগস্ট মানিকগঞ্জের শিবালয়, ৩ অক্টোবর সবুজবাগ, ৫ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাট, ২২ সেপ্টেম্বর কদমতলী, ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ও ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার মামলা সূত্রে পাঠানো নমুনাগুলোও নকল প্রমাণিত হয়েছে। 

র‌্যাব সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩০৬টি অভিযানে ৪৯০টি মূর্তি ও ৮১১টি মূর্তির ভগ্নাংশ র‌্যাব উদ্ধার করেছে।  এ সংক্রান্ত ২২০টি মামলায় ৪৪৫ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব, যার মধ্যে চলতি বছরে দুই মামলায় চারজন।  তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চারটি মূর্তি। 

গত ২ মে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের বালান্দা গ্রাম থেকে একটি বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার করে র‌্যাব-১২।  তখন র‌্যাবের স্থানীয় ক্যাম্পের এক কর্মকর্তা জানান, ৩৪ কেজি ওজনের মূর্তিটির আনুমানিক বাজারমূল্য এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সমকালকে বলেন, জাতীয় স্বার্থে র‌্যাব প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার করে।  এগুলোর সাধারণ কোনো বাজারমূল্য নেই।  চোরাচালানে জড়িত ক্রেতা-বিক্রেতারা যে দামে এসব কেনাবেচা করে বলে তথ্য পাওয়া যায়, সেটাকেই সম্ভাব্য দাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। 

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি বা অন্যান্য প্রত্নসম্পদ উদ্ধারের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।  তবে সর্বশেষ গত ৮ নভেম্বর জয়পুরহাট সদর উপজেলার আমাদই ইউনিয়নের পূর্ব সুন্দরপুর গ্রাম থেকে একটি মূর্তি উদ্ধার করা হয়।  এর দাম এক কোটি টাকা হতে পারে বলে তখন জানায় পুলিশ।