১৭, জানুয়ারী, ২০১৮, বুধবার | | ২৯ রবিউস সানি ১৪৩৯

বোমার নগরীতে বাস করছি আমারা!

২১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:৪৯

বুধবার দুপুর ১২টা ৮ মিনিট।  অন্তত ৩০ জন যাত্রী নিয়ে রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের সামনের রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল মোহাম্মদপুর থেকে খিলগাঁওগামী মিডওয়ে পরিবহনের একটি বাস।  সিগন্যাল ছাড়তেই চলতে শুরু করে বাসটি।  হঠাৎ ঘটে বিস্ফোরণ।  এর পর বাস থেকে ধোঁয়া উড়তে শুরু করে।  কিংকর্তব্যবিমূঢ় নারী-শিশুসহ সব যাত্রী প্রাণ বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বাসের জানালা ও দরজা দিয়ে নামার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। 

শেষ তিন যাত্রী নামার আগেই ফের বিকট
শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে বাসটিতে।  মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাসে।  অল্পের জন্য বেঁচে যান যাত্রীরা।  হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে বাসের চালক আতিক মোল্লাসহ চারজন আরোহী দগ্ধ ও আহত হন।  আতিক মোল্লা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।  চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসের গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকেই অগ্নিকা-ের সূত্রপাত।  জানা গেছে, বাসটির গ্যাস সিলিন্ডার ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। 

শুধু চালক আতিক মোল্লার বাসই নয়, সারা দেশে এমন মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে দেড় লাখেরও বেশি যানবাহন চলাচল করছে।  এসব গ্যাস সিলিন্ডার এক একটি টাইম বোমার চেয়েও ভয়ঙ্কর আখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যানবাহনের যে কোনোটিতে যখন তখন আতিকের বাসের মতো বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।  ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ প্রাণহানি। 

গত ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর বিকট বিস্ফোরণের পর মনজিল পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে।  ৪ অক্টোবর গুলিস্তান-ডেমরা রুটের আশিয়ান পরিবহনে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে।  ১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুরের নয়াবাড়ি এলাকায় কুমিল্লাগামী জৈনপুর পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লেগে আহত হন ৩ জন।  গত বছর ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের ঘিওরে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লেগে দগ্ধ হয় ১৬ যাত্রী।  জানা গেছে, অগ্নিকা-গুলো ঘটে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে।  একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে ১৯৪টি গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। 

জ্বালানি হিসেবে তেল ছেড়ে পরিবেশবান্ধব সিএনজিতে রূপান্তরের মাধ্যমে ধোঁয়া থেকে মুক্তি মিললেও তদারকির অভাব আর পরিবহন মালিকদের উদাসীনতায় সিএনজিচালিত গাড়িগুলো চলন্ত বোমায় পরিণত হয়েছে। 

গ্যাস সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ কিনা, তা পরীক্ষা করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয়।  সারা দেশে এমন ৫৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্ট সেন্টার আছে মাত্র ১৩-১৪টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।  আইন করে বিআরটিএর ফিটনেস নেওয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা গেলে সবাই সচেতন হবেন।  ফলে প্রাণহানি ও যানবাহনও নিরাপদ হবে।  জনসচেতনতার পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের। 

দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে গবেষণা করছেন তেজগাঁওয়ে অবস্থিত সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেডের (সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন সেন্টার) ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) আমির হামজা।  তিনি গতকাল বলেন, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাড়িতে লাগানো গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা।  কিন্তু গাড়ি নিয়মিত পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে ৩০ শতাংশেরও কম।  এ কাতারে এগিয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার।  কিন্তু ঝুঁকি জেনেও ৬০ শতাংশ কমার্শিয়াল যানবাহনের মালিকপক্ষই কোনো পরীক্ষার ধার ধারছেন না।  বরাবরই তারা থেকে যাচ্ছেন উদাসীন। 

তিনি আরও জানান, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে তিন হাজার পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরার পর রাস্তায় চলাচলকারী এক একটি গাড়ি চরম প্রেসারে থাকে।  গ্যাসভর্তি এসব সিলিন্ডার উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে।  সিলিন্ডার দুর্বল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা চলমান টাইম বোমা হয়ে উঠতে পারে।  বড় বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেশি।  কারণ বাস-ট্রাকগুলোয় ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে।  গ্যাস ধরে রাখতে অনেক গাড়ির মালিক আবার নিয়মের বাইরে গিয়ে বাড়তি সিলিন্ডার ধোলাইখাল কিংবা নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করে গাড়িতে সংযোজন করেন।  বাড়তি সিলিন্ডারটিই ভালো সিলিন্ডারগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।  এ কারণেও অনেক ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। 

আমির হামজা বলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নির্ধারিত সময়ের বাইরে একদিনও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা যাবে না।  পাঁচ বছর অন্তর প্রতিটি সিলিন্ডার পরীক্ষা করাতে হবে।  পুরনো গাড়ি কেনার সময় সিএনজি রূপান্তর যন্ত্রপাতি এবং সিএনজি সিলিন্ডারসংক্রান্ত তথ্যাদি/কাগজপত্র সঠিক কিনা তা বুঝে নিতে হবে।  সিএনজি রূপান্তর করার সময় সিলিন্ডারটি প্রকৃত সিলিন্ডার কিনা তাও যাচাই করে নেওয়া অত্যাবশ্যক।  শুধু সিলিন্ডার পরখ করলেই হবে না, সিলিন্ডারের মুখের স্টপ ভাল্বও (সেফটি ভাল্ব) যথাযথ রয়েছে কিনা তা দেখতে হবে।  কারণ এই ভাল্বের কারণেও অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটছে। 

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে সোয়া দুই লাখের মতো সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে।  এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করা গাড়ির সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক।  এগুলোর ৮০ ভাগই পুনঃপরীক্ষা করা হয়নি।  সিএনজি নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পর পর রিটেস্টের বিধান রয়েছে।  কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়েই এসব যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে।