১৭, জানুয়ারী, ২০১৮, বুধবার | | ২৯ রবিউস সানি ১৪৩৯

পীরেরবাগের কথিত পীর বরকত উল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:০৩

নিজস্ব প্রতিবেদক– রাজধানীর মিরপুর থানার ১৩ নং ওয়ার্ড এর দক্ষিণ পীরেরবাগ এলাকার কথিত পীর মুফতি বরকত উল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে অসামাজিক, অনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী ত্রাস সৃষ্টিকারীসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

এ ব্যাপারে পীরেরবাগ বাড়ীর মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মিরপুর মডেল থানায় অভিযোগ করেন।  পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর কাছেও অভিযোগ দায়ের করেছেন।  ইতিমধ্যে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত
প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। 

উপ-পুলিশ কমিশনার মিরপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে এ তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন তদন্ত টিমের প্রধান মিরপুর বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন পিপিএম।  তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হলেও এ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। 

এদিকে এহেন অভিযোগে ভন্ড পীর বরকত উল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।  তবে বরকত উল্লাহ কাসেমী তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। 

জানা গেছে, চলতি বছরের ২৪ আগস্ট বরকত উল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে পীরেরবাগ বাড়ীর মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আলহাজ মো: আব্দুস সোবহান ও সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো: আবুল কালাম সাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ মিরপুর মডেল থানায় করা হয়েছে। 

অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, মুফতি বরকত উল্লাহ কাসেমী দক্ষিণ পীরেরবাগ বাইতুন নুর জামে মসজিদের খতিব ছিলেন।  খতিব থাকাকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের জন্য খতিব পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হয়।  পরে সে এলাকার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অত্র এলাকার ধর্মপ্রাণ জনসাধারণের কাছ থেকে টাকা পয়সা সংগ্রহ করে জমি ক্রয় করে তিনতলা বিল্ডিং করেছে।  উক্ত ক্রয়কৃত জমি মাদরাসা ও মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দেওয়ার কথা থাকলেও অদ্যাবধী ওয়াকফ করে দেয়নি। 

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, এই মসজিদ ও মাদরাসার নাম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিজের নামে কয়েকটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছে।  এছাড়া সে গ্রামের বাড়িতে নিজের নামে ও তার স্ত্রীর নামে অজস্র সম্পত্তির মালিক হয়েছে।  যাকাত, ফেতরা, মান্নত, কোরবানির চামড়া সব সংগ্রহ করে নামে মাত্র মসজিদ ও মাদরাসায় খরচ করে বাকি সম্পূর্ণ অর্থ নিজের নামে সম্পদ বর্ধিত করছে। 

এছাড়া ওই মসজিদ ও মাদরাসায় নামে মাত্র তার নিজের বানানো একটি কমিটি আছে, সেখানে গত তিন বছরে একটি মিটিংও দেননি এবং কোন আর্থিক হিসাবও মসজিদের কাউকে দেননি।  তবে ধনবান লোকদের কাছ থেকে দান নেওয়ার জন্য মাঝে মধ্যে তিনি মাদরাসা মসজিদ প্রাঙ্গনে সভার আয়োজন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। 

এদিকে বরকত উল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে গত ১৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ আরেকটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।  এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় মো: আবুল কালাম আজাদ। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বরকত উল্লাহ কাসেমী নিজেকে স্বঘোষিত পীর নাম ধারণ করে দীর্ঘ দিন থেকে পানি পড়া, ভুয়া তাবিজ পড়া ও কুফুরী কালামের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করছে এবং রাজারবাগ পুলিশের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা নিয়ে মানুষের সাথে দীর্ঘদিন যাবত প্রতারনা করে আসছে। 

শুধু তাই নয়, এলাকার সর্বস্তরের জনগনের টাকা দিয়ে মসজিদ মাদরাসা গড়ে তুলে তার ভাই, ভাতিজা, শ্যালক ও আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে আল্লাহর ঘর মসজিদকে ব্যক্তিগত পীরের খানকা হিসাবে ব্যবহার করছে বরকত উল্লাহ কাসেমী। 

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, জনগনের কষ্টার্জিত দানের টাকায় গড়ে তোলা মসজিদ প্ল্যানটি আবাসিক হিসেবে পাস করিয়েছেন ধর্ম ব্যবসায়ী বরকত উল্লাহ কাসেমী।  তাই তার বিরুদ্ধে অবৈধ ও অনৈতিক কার্যকলাপ ও প্রতারনাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে তার প্রতিবাদে এলাকাবাসী চলতি বছরের ২০ আগস্ট কয়েক হাজার পোষ্টার লাগায়।  কিন্তু তার অনুসারীরা পরদিন সব পোষ্টার ছিড়ে ফেলে। 

তার ৬দিন পর এলাকার সর্বস্তরের মানুষ ও বাড়ির মালিক কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধিরাসহ বরকত উল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে একটি শান্তি মিছিল সমাবেশ করেন।  এ সময় বরকত উল্লাহ কাসেমীর সন্ত্রাসী বাহিনীরা মিছিলে অতর্কিত হামলা চালায়।  এতে বহু মানুষ আহত হয় এবং অনেকে ঘর ভাংচুর করে তান্ডব সৃষ্টি করেন।  পরে প্রায় দেড় ঘন্টা পর মিরপুর মডেল থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন। 

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দুদক ও মিরপুর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও বরকত উল্লাহ কাসেমীর ভয়ে গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না কেউ।  তারা বলছেন, তিনি নিজে একজন প্রভাবশালী, এবং এলাকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার চলাফেরা আছে।  তার বিরুদ্ধে এর আগে যারা কথা বলেছেন তাদেরকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন কাসেমীর লোকজন।  এছাড়া টাকা দিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করার ক্ষমতাও রাখেন তিনি। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, বরকত উল্লাহ কাসেমী একজন ভন্ড পীর হিসেবে এলাকায় পরিচিত।  তিনি মানুষের সাথে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছেন।  তার ভয়ে এলাকার অনেক মানুষ কোনো কথা বলতে সাহস পায় না।  একজন মুসলমান হয়ে এমন ধর্ম ব্যবসায়ীকে কখনো মেনে নেওয়া যায় না। 

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দুদুক চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগের পরিপেক্ষিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।  পরে ২২ অক্টোবর এই কমিটির প্রতিবেদন উপ-পুলিশ কমিশনার মিরপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন তদন্ত টিমের প্রধান মিরপুর বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন পিপিএম। 

প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, বরকত উল্লাহ কাসেমী দক্ষিণ পীরেরবাগ বাইতুন নুর জামে মসজিদের খতিব থাকাকালে তারাবি নামাজ পড়ানোর হাদিয়া হিসেবে তাকে ৫ হাজার টাকা দিলে ৭ হাজার টাকা না দেওয়ায় সে ২বার ফেরত দেয় এবং মসজিদ কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে কটুক্তি করেন।  এছাড়া মসজিদে জানাজার নামাজ নিয়ে মিথ্যাচার এবং বাইতুন জামে মসজিদের বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের কারণে মসজিদ কমিটি তাকে অব্যাহতি প্রদান করেন। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর ২৪ এপ্রিল ২০১২ তারিখে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় বরকত উল্লাহ কাসেমী বিবৃতি দেয়।  সেখানে ছাপা হয়, ইলিয়াস আলীকে ফেরত পাওয়ার আগ পর্যন্ত ১৮ দলীয় জোটকে হরতাল চালিয়ে যেতে হবে, তা না হলে ১৮ দলীয় জোটের ১৮ নেতাকে পর্যায়ক্রমে হাসিয়া সরকার গুম করবে।  ইলিয়াস আলী সরকারের হাতেই আছে।  ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য সরকারের পক্ষে জনগণ।  এছাড়া বরকত উল্লাহ কাসেমী সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

এছাড়া আরও উল্লেখ করা হয়, জনগণের টাকা নিয়ে মাদরাসার নামে জমি ক্রয় না করে তার নামে জমি ক্রয় করে।  পরে এলাকাবাসীর তোপের মুখে ক্রয়কৃত জমি মাদরাসা ও মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দেওয়ার মৌখিক স্বীকারোক্তি দেন তিনি।  এছাড়া, বরকত উল্লাহ কাসেমী তার সাঙ্গপাঙ্গ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে গ্রামবাসীর মিছিলে অতর্কিত হামলা করে’ উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। 

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ‘বরকত উল্লাহ কাসেমীর কর্মকাণ্ড নজরদারীতে আনা এবং সরকার বিরোধী বা আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কোন কর্মকান্ডের তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ প্রদান করেন। 

এ ব্যাপারে পীর মুফতি বরকত উল্লাহ কাসেমীর কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।  একটি মহল তাকে উৎখাত করার জন্য মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়েছে দাবি করে তিনি  বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ অসত্য একটি অভিযোগ।  এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, আমার কোন বাহিনী নেই, তাদের পোষ্টার তারা নিজেরাই ছিড়ে ফেলেছে।  এবং সে ইলিয়াস আলীকে ফেরত পেতে পত্রিকায় কোন বিবৃতি দেয়নি।  তার বিরুদ্ধে দেওয়া পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেও দাবি করেন বরকত উল্লাহ কাসেমী।