১৭, জানুয়ারী, ২০১৮, বুধবার | | ২৯ রবিউস সানি ১৪৩৯

নতুন পাঠ্যবইয়ে বানান ভুলে সরকারের ১৪ কোটি টাকা ক্ষতি

০৭ জানুয়ারী ২০১৮, ১১:২৪

গেল বছর থেকে শুরু হয়েছে বানান ভুলের মিছিল।  সেই মিছিল যেন পিছ পা হবার নয়।  বানান ভুল সহ নানা বিষয়ে বিতর্ক শুরু হয় গত বছর।  প্রথমিক ও ইফতেদায়ী বইয়ে সংযোজন বিয়োজন নিয়ে বিতর্কের কারণে পাঠ বইয়ে বিভিন্ন বিষয় পরিবর্তন করা হয়।  আর এর সাথে যোগ হয়েছে বানান ভুল। 

পাশাপাশি বিতর্কিত তথ্য থাকায় বাতিল করতে হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চারটি বই।  আর এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১৪ কোটি টাকা।  এবছরও বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু ভুল দেখা গেছে।  মোটা দাগে ভুলগুলো
হলো— বানান, মুদ্রণ প্রমাদ, কাটিং, নিম্নমানের ছাপা ও বাক্যগঠন। 

বানান : গত বছর বিনামূল্যে বিতরণ করা বইয়ে বানান ভুলের বিতর্কের পর তা আংশিক সংশোধন করা হলেও ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের জন্য দেয়া জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)বইয়ে চোখে পড়েছে বানান ভুলের ছড়াছড়ি।  ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৭৩ ও ৮৯নং পৃষ্ঠায় নকশিকাঁথার জায়গায় নক্সিকাথা, জসীমউদ্দিনের জায়গায় জসীমউদদিন লেখা আছে।  এ ধরনের অগণিত বানান ভুল চোখে পড়ে বইটিতে।  এছাড়া একই অবস্থা সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা এবং অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য কনিকা বইয়েও। 

না প্রকাশ করার শর্তে এক পুস্তক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, এখন তো সবাই রাজনীতির প্রভাব খাটায়।  অনেক নতুন নতুন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বের হয়েছে।  এগুলোর হর্তাকর্তা প্রভাবশালীরা।  এরা টেন্ডারের সময় ছাপার অর্ডার নিয়ে আসেন।  টাকা পেলেই হলো।  কোয়ালিটি কেমন হচ্ছে সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। 

অগণিত মুদ্রণ প্রমাদ : বানান ভুল তো আছেই।  এ বছর দেয়া বোর্ডের বইগুলোতে দেখা যায় প্রচুর মুদ্রণ প্রমাদ।  ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইগুলোর সূচিপত্রে গল্প, উপন্যাস এবং কবিতার লেখকদের নামের বানানের ক্ষেত্রে বিষয়টা চোখে পড়ে বেশি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এবছর দেয়া বই নিয়ে এখনো কোনো কথা উঠেনি; হয়তো বা এই কারণে যে, বাচ্চারা সে পর্যন্ত পড়েই নাই।  সে চাপ্টারগুলো এখনো তাদের দেখা হয় নাই।  কিন্তু এটা কোনো ভাবেই কাম্য নয়।  এতে করে শিক্ষা ব্যবস্থা তো আছেই, একইসঙ্গে প্রকাশক ও সম্পাদকদের উপরও অনাস্থার সৃষ্টি হবে।  পরপর দু’বছর তো একই ধরনের ভুল মেনে নেওয়া যায় না। 

কাটিং : বই কাটিং করতে গিয়ে সপ্তম, অষ্টম, নবম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান বইয়ের পাতাগুলো এমনভাবে কাটা পড়েছে যে প্রতি পৃষ্ঠায় থাকা প্রতীক ও লেখাও কেটে গেছে।  লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কনিকা’ বইয়ের ১২নং, সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ের ৩৩নং পৃষ্ঠার নিচের দিকে ঠিক প্রশ্নের অংশ কাটিংয়ের ফলে কাটা পড়েছে।  ফলে প্রশ্ন পড়া যায় না। 

নিম্নমানের ছাপা : এবছরের বইগুলোর মলাট ঝকঝকে হলেও ছাপা খুবই নিম্নমানের।  এর ফলে অনেক বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর, বর্ণ ও অলঙ্করণগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় না।  ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৯১নং ও সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ের ৮১, ৮৮, ৮৯, ৯২, ৯৩, ৯৬নং পৃষ্ঠার লেখা অন্য পৃষ্ঠা থেকে দেখা যায়।  ফলে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার পাঠ অস্পষ্ট হয়ে গেছে।  এছাড়া চিত্রের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।  অনেক বইয়েরই ছবি বুঝা যায় না।  এতে শিক্ষার্থীদের পড়তে ও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। 

জুবিলী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মরিয়মের বাবা আবুল হাশেম বলেন, এমন হলে তো হয় না।  এ তো সস্তার তিন অবস্থার মতো। 

সেন্ট্রাল গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষার্থী জুলির মা মিসেস রোকসানা বলেন, বিনামূল্যে বই দেয়া হচ্ছে বলে এই কোয়ালিটি? বাচ্চারা কিভাবে বুঝবে? পড়বে?

লেখকের বৃত্তান্ত ভুল : বাংলা সাহিত্যের এক অহঙ্কার আমাদের পল্লীকবি জসিমউদ্দিন।  তিনি তার কর্মজীবন ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে শুরু করেন।  কিন্তু পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে তার কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে।  এই ভুল তথ্যটি চোখে পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৭৩নং পৃষ্ঠার কবি পরিচিতিতে। 

বাক্যগঠন : বানান, মুদ্রণ প্রমাদসহ অনেক ধরনের ভুলের পাশাপাশি এ বছরের পাঠ্যবইয়ে লক্ষ্য করা যায় অগণিত ভুল বাক্যগঠন, দাড়ি, কমা আর সেমিকোলন ব্যবহারের ক্ষেত্রে।  ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৭৩নং পৃষ্ঠায় পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবি পরিচিতিতে, সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ের ৮১, ৮৯, ৯৪নং পৃষ্ঠা ও অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৩৯ ও ৪৩নং পৃষ্ঠায় একটু ভালোভাবে চোখ বুলালেই এই ভুলগুলো চোখে পড়বে যে কারোও। 

অর্থ গচ্চা : এবছর বিতর্কিত তথ্য থাকায় মাদ্রাসা বোর্ডের চারটি বই বাতিল করা হয়েছে।  এই বইগুলো হলো–২০১৮ সালের জন্য ছাপানো সপ্তম শ্রেণির ‘আল্ আকায়েদ ওয়াল ফিক্‌হ’, অষ্টম শ্রেণির ‘আল্ আকায়েদ ওয়াল ফিক্‌হ’ নবম ও দশম শ্রেণির ‘কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ’ ও ‘হাদিস শরিফ’।  বাতিলের পর বইগুলো সংশোধন করে পাঠানো হচ্ছে সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোয়।  এই চারটি বই বাতিল, সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণের ফলে সরকারের মোট ১৪ কোটি টাকা গচ্চা গেছে। 

হাস্যকর উদাহরণ : প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’র বর্ণ পরিচয় অংশে ছাগল এবং ওড়না রয়েই গেছে।  আমার বাংলায় ১১ আর ১২নং পৃষ্ঠায় এই হাস্যকর তথ্য রয়েছে।  ‘অ’-তে ‘অজ’ (ছাগল) লেখা হয়েছে।  ‘অ’ চেনাতে ছাগলের ছবি দেয়া আছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের অলঙ্করণ ব্যবহার সঠিক হয়নি।  ছাগল একটি প্রাণী ঠিক আছে।  কিন্তু আমরা তো আমাদের সময় আজগর পড়েছি।  অধ্যায়গুলোকে হাস্যকর করে তো লাভ নেই। 

তিনি বলেন, দুর্বল মেধা আর অপরিপক্ক লোক ব্যবহারের ফলেই এই ভুলগুলো হচ্ছে।  আর বাক্যগঠন ও বানান, এটাতো লেখক আর প্রুফ রিডার দু’জনকেই খেয়াল রাখতে হবে।  এখন তো সবই কম্পিউটারাইজড।  তারপরও কেন এমন হচ্ছে তা আমার বোধগম্যতার বাইরে।  নিশ্চয়ই মনিটরের সামনের লোকটি দক্ষ না এবং তার ভাষার উপর দখল কম।  আর এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না। 

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে  বলেন, বানান ভুল সংশোধন করা হয়েছিলো।  তারপরও আপনার মাধ্যমে জানলাম বিষয়টি দেখবো।  আর মাদ্রাসার বইগুলো রচনা থেকে শুরু করে ছাপানো বাদে বাকি কাজ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি, মাদ্রাসা বিভাগ ও মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড।  পাণ্ডুলিপির সিডি এনসিটিবিতে পাঠালে সংস্থাটি কেবল বই ছেপে দেয়।  ফলে এই বইয়ের ভুল থাকা ও নতুন করে ছাপার দায় এনসিটিবির নয়।