১৯, ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, সোমবার | | ৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

খালেদা জিয়া দণ্ডিত হবেন, না খালাস পাবেন?

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০:২২

আজ বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে টানটান উত্তেজনার মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা হবে।  বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধান আসামি; তাই এ রায়ে আগ্রহ শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।  তিনি দণ্ডিত হবেন, না খালাস পাবেন- এ আলোচনা সর্বত্র।  সবার দৃষ্টি আদালতে। 

আজ ঢাকায় মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ হলেও দুই প্রধান দলের পাল্টাপাল্টি ঘোষণায় নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।  রাজধানীতে বিজিবি টহল দিচ্ছে।  সতর্কাবস্থায়
রয়েছে পুলিশ-র‌্যাব। 

এতিমখানার জন্য বিদেশ থেকে আসা দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ৩ জুলাই বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।  বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান রায় ঘোষণা করবেন বলে দিন ধার্য রয়েছে। 

দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে খালেদা জিয়ার।  কারা সূত্রের খবর, তার জন্য কারাগারের ভিআইপি সেল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।  চলছে পরিস্কার ও ঘষামাজার কাজ।  তাতে কারও কারও ধারণা, সাজা হতে পারে।  কারাগারে নেওয়া হতে পারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে।  এতে ভীত নন জানিয়ে সরকারকে হুঁশিয়ার করে তিনি বলেছেন, জেল বা সাজার ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। 

বিএনপি আগেই হুঁশিয়ার করেছে, খালেদা জিয়ার সাজা হলে সরকার পতনের কঠোর আন্দোলনে নামবে তারা।  ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পাল্টা হুঁশিয়ারি, আন্দোলনে নাশকতা হলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।  ১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া আদালত থেকে ফেরার পথে বিএনপির মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলায় উত্তেজনার পারদ আরও চড়েছে।  'নাশকতা প্রতিরোধে' আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আজ সকাল থেকে সারাদেশের সব দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  বিএনপি কর্মসূচি না দিলেও দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা- কী হবে আজ।  পুলিশ সতর্ক করেছে, নাশকতা হলে একবিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না।  তাই রায় নিয়ে টানটান উত্তেজনা। 

বিএনপির কর্মসূচি না থাকলেও দলটির নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, দলীয় প্রধানের 'কিছু হলে' তারা বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড়বেন না।  তিন দফায় ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন খালেদা জিয়া।  ১০ বছর ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা।  তিনি আসামি বলেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার গুরুত্ব আর দশটি মামলাকে ছাড়িয়েছে; পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। 

গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে পতনের পর দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর।  জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় সাজা ভোগ করেছেন এরশাদ।  কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির টাকা লোপাটের দায়ে ১৯৯৯ সালে নিম্ন আদালতে ১৫ বছর সাজার রায় হয় প্রয়াত কাজী জাফরের।  কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে খালেদা জিয়াই প্রথম রাজনীতিক, যার মামলা রায় ঘোষণার পর্যায়ে এসেছে। 

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হলে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না খালেদা জিয়া।  পাঁচ বছরের জন্য সরকারি পদ গ্রহণে অযোগ্য হবেন।  তবে সাজা হলে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ পাবেন খালেদা জিয়া।  আপিল আবেদন গ্রহণ করে নিম্ন আদালতের সাজা স্থগিতের এখতিয়ার রয়েছে হাইকোর্টের।  সে ক্ষেত্রে জামিনের বিধান রয়েছে।  তখন নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা থাকবে না। 

মামলার বাদী দুদকের প্রধান আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল মনে করেন, আজই রায় হবে।  তার দাবি, তিনি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সব অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।  তিনি সমকালকে বলেন, দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় প্রধান আসামি খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন চাওয়া হয়েছে।  এ ছাড়া অপর আসামিদেরও সাত বছরের সাজা প্রার্থনা করা হয়েছে। 

অবশ্য খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া দাবি করেছেন, ন্যায়বিচার হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালাস পাবেন।  আদালতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের একটিও প্রমাণিত হয়নি।  রাজনৈতিক হয়রানি ও হেয়প্রতিপন্ন করতেই 'সেনাসমর্থিত' তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে 'মাইনাস টু ফর্মুলার' অংশ হিসেবে এ মামলা দায়ের করা হয়েছিল।  যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো জাল-জালিয়াতিপূর্ণ ও ঘষামাজা করা। 

বিএনপির অভিযোগ, সরকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই 'মিথ্যা' এ মামলাকে রায় পর্যন্ত টেনে এনেছে।  খালেদা জিয়াও একই অভিযোগ করেছেন।  গতকাল সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া বলেন, রায় দেওয়ার বহু আগেই শাসক মহল চিৎকার করে বলে বেড়াচ্ছে, 'আমার জেল হবে।  যেন বিচারক নয়, শাসক মহলই রায় ঠিক করে দিচ্ছে। ' নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, 'ন্যায়বিচার হলে বেকসুর খালাস পাব।  আর যদি শাসক মহলকে তুষ্ট করার জন্য অন্য কোনো রায় হয়, তাহলে তা কলঙ্কের প্রতীক হয়ে থাকবে। '

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, রায় কী হবে, তা তাদের জানা নেই।  আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেবেন।  রায়কে কেন্দ্র করে কেউ নাশকতা কিংবা অগ্নিসন্ত্রাস করতে চাইলে শক্ত হাতে তা প্রতিহত করা হবে।  গণমাধ্যমের খবর, ঘষামাজা চলছে কারাগারে।  পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের নারী সেল পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে।  খালেদা জিয়ার জন্য এই আয়োজন কি-না এ প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা হলে কারাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  কারা কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে। 

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়াও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামি সাবেক এমপি কাজী সলিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।  মামলার শুরু থেকেই তিন আসামি তারেক রহমান, ড. কামাল সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান পলাতক। 

মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সৌদি আরব থেকে এতিমদের জন্য আসা দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।  ১৩ মাস তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।  ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে চার্জ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।  ২৩৬ কার্যদিবসে ৩২ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, ২৮ কার্যদিবসে আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন ও ১৬ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়।  আজ রায় ঘোষণার মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকাজ শেষ হবে। 

রায় ঘোষণার দিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বিশেষ আদালত এলাকায়।  আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিভিন্ন অংশে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।  বসেছে জোর পুলিশ পাহারা।  গতকাল দুপুর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়।  পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে।  র‌্যাব-১০-এর কর্মকর্তা এএসপি মাসুদ রানা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল জোরদার করা হয়েছে।  সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করা হচ্ছে। 

শুধু আদালত এলাকা নয়, রাজধানীজুড়েই বেড়েছে নিরাপত্তা টহল।  রাজধানীর মোড়ে মোড়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।  টহল দিচ্ছে র‌্যাব।  রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে তল্লাশিচৌকি।  ঢাকায় প্রবেশকালে যানবাহনে তল্লাশি করা হচ্ছে।  ঢাকার চারদিকের সেতুগুলোতেও সন্দেহভাজন প্রবেশকারীদের তল্লাশি করা হচ্ছে।  ব্যাগ হাতে কাউকে বিনা তল্লাশিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।  দূরপাল্লার পথে, মহাসড়কেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।  বাস থামিয়ে যাত্রীদের তল্লাশি করা হচ্ছে।  এতে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। 

বিএনপির অভিযোগ, তাদের নেতাকর্মীরা গণগ্রেফতারের শিকার হয়েছেন।  গত এক সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন।  তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করা হচ্ছে।  তবে পুলিশের দাবি, দলীয় পরিচয় দেখে নয়, শুধু অভিযুক্তদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে। 

শুধু ঢাকা নয়, বিভাগীয় ও জেলা শহরেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।  বেড়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা।  এসব এলাকায় মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ নয়, তাই শঙ্কা বেশি।  আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় পক্ষই আজ পথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।  সংঘাত-সহিংসতা এড়াতে ছয় জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি।