২৬, সেপ্টেম্বর, ২০১৭, মঙ্গলবার | | ৫ মুহররম ১৪৩৯

বৃথা গেল তাসকিনের হ্যাটট্রিকটি

২৯ মার্চ ২০১৭, ১০:২৭

একবার দুবার নয়,  ক্রিকেট ইতিহাসে আরও ৪০বার ঘটেছে এমনটি।  চার বছর আগে সেদিনের তারিখটিও ছিল ২৮ মার্চ, প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলংকা, খেলাও ছিল লংকার মাটিতে, পাল্লেকেলেতে।  সেদিনও বৃষ্টি নেমেছিল লংকানরা ৩০২ রান তোলার পর! গতকালও ছিল ২৮ মার্চ, প্রতিপক্ষ সেই লংকা, খেলাও চলছিল লংকার মাটি ডাম্বুলায়।  গতকালও বৃষ্টি এসেছিল লংকানরা ৩১১ তোলার পর! এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল।  অমিলটা হলো তার পরই, সেদিন জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ আর গতকাল ম্যাচ পণ্ড হওয়ায় বৃথা গেল তাসকিনের হ্যাটট্রিক। 
ডাম্বুলার বৃষ্টি থেমে

আর ডিএল মেথডের অঙ্ক সামনে আসেনি টাইগারদের।  রাত সাড়ে ৯টার দিকে ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফট পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন ম্যাচটি।  সিরিজে কোনো রিজার্ভ ডে নেই, তাই সিরিজ জয়ের জন্য ১ এপ্রিল কলম্বোর দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে মাশরাফিদের।  বৃষ্টির কারণে ৩-০ না হোক, ২-০-তে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা অবশ্য এখনও থাকছে। 

ফর্মের তুঙ্গে থাকা টাইগারদের জন্য তিন শতাধিক রান তাড়া করা কঠিন কিছু ছিল না।  অতীতে তিনশ'র ওপর রান তাড়া করে তিন ম্যাচে টাইগারদের জয়ের ইতিহাস রয়েছে।  তা ছাড়া চার বছর আগের বৃষ্টিবিঘি্নত ওই ম্যাচটিও কিন্তু জিতেছিলেন মুশফিকরা।  সেবার বৃষ্টি থামার পর টাইগারদের সামনে লক্ষ্য ছিল ২৭ ওভারে ১৮৩ রান তোলার, এক ওভার বাকি থাকতেই সেই রান তুলে নিয়েছিলেন মুশফিকরা।  লংকার মাটিতে সেটাই ছিল বাংলাদেশিদের প্রথম জয়।  গতকালও যদি ম্যাচ হতো, ডিএল মেথডের হিসাব ছিল এমন_ ২০ ওভারে ১৬৭ রান করতে হবে বাংলাদেশকে।  তা ছাড়া বাংলাদেশ এখন আর সেই দল নয় যে, বৃষ্টিতে ম্যাচ পণ্ড হলে ড্রেসিংরুমের ভেতরে ভেতরে খুশির হাওয়া বইবে! বরং ম্যাচে রেজাল্ট যা-ই হোক না কেন, মাঠে নেমে লড়তে পছন্দ করে মাশরাফিদের এই দল। 

প্রথম ম্যাচটি অমন দাপুটে জয়ের পর গতকাল দ্বিতীয় ওয়ানডেতে এসে দলের বোলিংয়ে স্বস্তি ছিল না মাশরাফিদের মধ্যে।  ম্যাচের মধ্যে মাশরাফির বিরক্তি মুখ দেখেই তা স্পষ্ট।  এদিন টসে হেরে অবশ্য মুচকি হাসি দেন মাশরাফি।  কি মুশফিক কি তিনি নিজে, এবারের লংকা সফরে একটিবারের জন্যও টসভাগ্য খোলেনি বাংলাদেশের।  আর টস জিতেই যে থারাঙ্গা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে 'ব্যাটিং ফার্স্ট' বলবেন সেটিও হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মাশরাফি।  কিন্তু যেটা ভাবতে পারেননি, সেটা হয়তো ১৮ রানে প্রথম উইকেট পড়ার পর লংকানদের ১১১ রানের জুটির কথা।  পিচে যে বোলারদের জন্য কিছুই ছিল না সেটা শুরুর সাতটি ওভারেই প্রমাণ মিলে যায়।  মাশরাফির গতির হেরফেরে বিভ্রান্ত হয়ে পুল করতে গিয়ে ক্যাচ তুলেছিলেন গুনাথিলাকা, উঁচুতে ওঠা ক্যাচটি ফাইন লেগে দৌড়ে গিয়ে বেশ ধরেছিলেন মুশফিক।  কিন্তু তার পরই থারাঙ্গা আর কুশল মেন্ডিস মিলে ধীরে ধীরে ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন ঠিক আগের ম্যাচে তামিম-সাবি্বরের মতোই! খুব চেষ্টা করেছিলেন মাশরাফি এই জুটি ভাঙতে।  মুস্তাফিজকে নিয়ে এসেছিলেন নয় ওভার পরই, সাকিবকেও এনেছিলেন ১৪তম ওভারে।  কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না তখন।  পাটা উইকেটে মুস্তাফিজের কিছু ফুলটস বলও হয়ে যায়, ওয়াইড আসতে থাকে হতাশা থেকে।  প্রথম দুটি ওভারেই মুস্তাফিজের কাছ থেকে ১৭ রান বেরিয়ে যায়।  মাশরাফি নিজে প্রথম স্পেলে মেডেনসহ ৫ ওভারে ১৬ রান দিলেও বিশ্রাম নিতে হয় কিছুক্ষণের জন্য।  বোলিং করতে গিয়ে এদিন পায়ের ব্যথা টের পান মাশরাফি।  ম্যাচের আগে আধাঘণ্টা ধরে ডান পায়ে যে ব্যান্ডেজ টেপগুলো বাঁধেন তিনি, সেটা ঠিকঠাক করতে দেখা যায় তাকে।  আর এভাবেই কুড়ি ওভারে ১০১ রান তুলে নেয় লংকানরা।  দু-একটি হালকা এলবিডবি্লউর আবেদন ছাড়া ওই সময়ের মধ্যে আর কোনো কিছুই বাংলাদেশিদের পক্ষে ছিল না।  তারপর হঠাৎই সেই সুযোগ চলে আসে, মুস্তাফিজের বিমার (শরীর বরাবর সোজা ধেয়ে আসা বল) থেকে ব্যাট ছুঁয়ে অনিচ্ছাতেই যেন রানের জন্য দৌড়ে ছিলেন থারাঙ্গা।  স্লিপ থেকে রিয়াদের সরাসরি থ্রোতে সেটিই রানআউট হতে হয় থারাঙ্গাকে।  তারপর আবার সেই হতাশার গল্প, মেন্ডিস আর চান্দিমালের ৮৩ রানের জুটি।  এরই মধ্যে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিও করে নেন কুশল মেন্ডিস।  ৩৫ ওভারেই দুইশ' পার করা লংকানরা তখন তিনশ'র দিকে ঝড়ের বেগে ছুুটছে, এ সময়ই মুস্তাফিজকে সরে এসে চালাতে গিয়ে এলবিডবি্লউ হয়ে যান চান্দিমাল, ডিআরএস নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি।  কুশল মেন্ডিস ফের জুটি বাঁধেন শ্রীবর্ধনের সঙ্গে, এবারও আসে ৫৫ রান।  মিরাজ বোল্ড করেছিলেন শ্রীবর্ধনকে।  তখন অবশ্য ইনিংসের বাকি ছিল আর ২৬টি বল, রান উঠে গেছে ২৭১!

পরের কুড়ি মিনিটে বোধহয় বাংলাদেশের জন্যই মঞ্চ তৈরি করে রেখেছিল ডাম্বুলা।  পাঁচ উইকেট পড়েছিল বাকি সময়ে, মাশরাফির পরের ওভারে একটি চার হাঁকানোর পর রানআউট হয়েছিলেন থিসারা পেরেরা, গ্গ্নাভস খুলে উইকেটের পেছন থেকে মুশফিকই ওই রানআউটি করেছিলেন।  একই ভাবে দিলুরুয়ান পেরেরাকেও মুস্তাফিজের ওভারে রানআউট করেছিলেন মুশফিক।  এভাবে দু-দুটি রানআউট করার পর নিজেই যেন হেসে ফেলেছিলেন।  কিন্তু তখনও মুখে হাসি ছিল না মাশরাফির।  কারণ তার আগের ওভারটিতেই তাসকিন ১৩ রান বের করে দিয়েছিলেন।  তখনও কেউ ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারেননি যে, শেষ ওভারটিতে এই তাসকিনের জন্যই কী অপেক্ষা করছে! গুনারত্নের কাছে বাউন্ডারি খাওয়ার পর ইয়র্কার দেওয়ার চেষ্টা ছিল তাসকিনের; কিন্তু সেটি ফুলটস হয়ে ধরা দেয় গুনারত্নের সামনে, মিস টাইমিংয়ে মিডঅফে ক্যাচ চলে যায় সৌম্যর কাছে।  তখনও উইকেট পাওয়ার আনন্দ ধরা দেয়নি তাসকিনের মধ্যে।  পরের বলে যখন লাকমলকে ক্যাচ বানিয়ে নেন মুস্তাফিজ, তখন শুধু মুচকি হাসি মাখা ছিল তাসকিনের।  আর হ্যাটট্রিক বলটি যখন বিষাক্ত ইয়র্কার হয়ে ভেঙে দেয় নুয়ান প্রদীপের স্টাম্প, তখন বাঁধ ভেঙে ঝরে পড়ে তাসকিনের সব উচ্ছ্বাস।  হোক না টেল এন্ডারের তিন উইকেট, কিংবা শেষ ওভারের তিনটি বল_ এভাবে হ্যাটট্রিক আর ক'জনই বা করেছে এ পর্যন্ত।  ইতিহাস বলে, তাসকিনের আগে চার বাংলাদেশি শাহাদাত হোসেন রাজীব, আবদুর রাজ্জাক, রুবেল হোসেন আর তাইজুল ইসলাম হ্যাটট্রিক করেছেন।  গতকাল পঞ্চম বাংলাদেশি হিসেবে নিজের নামটিই যেন সেখানে বসিয়ে নিলেন তাসকিন।  ম্যাচটি পণ্ড হয়ে গেলেও ওয়ানডে ইতিহাসে তাসকিনের এই হ্যাটট্রিকের কথা লেখা থাকবে।