মহান আল্লাহ জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। স্ত্রীর কাছে যে স্বামী উত্তম তাকেই উত্তম ব্যক্তি হিসেবে হাদিসে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তৈরি করেছেন; এটি তার নিদর্শন বলে ঘোষণা করেছেন।
তাঁর নিদর্শনের মধ্যে হল এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিণী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পার আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এর মাঝে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে। (সুরা রুম, আয়াত: ২১)
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে স্বামীকে উত্তম স্বামী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম ব্যক্তি। (তিরমিজি ৩৮৯৫)
স্ত্রীকে অবজ্ঞা না করে তাদের যথাযথ সম্মান দেয়া সুন্নত। কোনো কাজে তার পরামর্শ নেয়াও সুন্নত। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন সবাইকে মাথা মুণ্ডন ও পশু জবাই করতে বললেন তখন সাহাবায়ে কেরাম কাবা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তা মেনে নিতে পারছিলেন না। তখন তিনি এ ব্যাপারে স্ত্রী উম্মে সালামাহ (রা.)-এর কাছে পরামর্শ চাইলেন।
উম্মে সালামাহ (রা.) বললেন,
হে আল্লাহর রসুল, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোনো কথা না বলে আপনার উট আপনি জবাই করুন এবং নাপিত ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।
সে অনুযায়ী রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন এবং কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে নিজের পশু জবাই করলেন এবং নাপিত ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিলেন। তা দেখে সাহাবিরা উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কোরবানি দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী ও পরিবার পরিজনের সঙ্গে সুন্দর আচরণকারী ছিলেন, তাদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলতেন, মাঝে মাঝে হাসি ঠাট্টা করতেন, তাদের সঙ্গে ভালোবাসা ও বদান্যতার সঙ্গে আচরণ করতেন।
ইবনে সাদ (রহ.) আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তাকে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে একান্তে অবস্থানকালীন সময়ের স্বভাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বলেন,
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে কোমল ব্যক্তি, সদা হাস্যোজ্জ্বল, তিনি কখনও তার সঙ্গীদের সামনে পা প্রসারিত করে বসতেন না। (তিরমিজি)
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা সফরে গেলে স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তাদের সঙ্গে প্রেমময় সম্পর্ক তৈরি করতেন। ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতেন না। স্ত্রীর সঙ্গে দৌঁড় প্রতিযোগিতা করতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমি হায়েজ অবস্থায় পানি পান করে সে পাত্র রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিতাম। আমার মুখ লাগানো স্থানে তিনি তার মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আমি হায়েজ অবস্থায় হাড়ের টুকরা চুষে তা রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিতাম। তিনি আমার মুখ লাগানো স্থানে তার মুখ লাগাতেন। (মুসলিম ৩০০)
উম্মতকে আত্মীয়দের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন নবীজি
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে অনেক বেশী ভালোবাসতেন। লিখে কিংবা বলে তার ভালোবাসার পরিধি বোঝানো যাবে না। দুনিয়াতে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বেশি। বাবা তার সন্তানকে যতটুকু ভালোবাসে, নবীজি তাঁর উম্মতকে এর চেয়েও বহুগুণ বেশী ভালোবাসতেন।
তবে এক হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-إِنَّمَا أَنَا لَكُمْ مِثْلُ الْوَالِدِ لِوَلَدِهِ আমি তোমাদের জন্য সন্তানের পিতার সমতুল্য। (ইবনে মাজাহ, হাদিস- ৩১৩)
অর্থাৎ, আমি তোমাদের কাছে পিতার মত। একজন ন্যায় নিষ্ঠাবান পিতা মায়া, মমতা ও ভালোবাসা নিয়ে সন্তানের সুখ শান্তি অর্জন এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকেন। সন্তানের সুখের জন্য বাবা নিজের সুখ শান্তি বিলীন করে দেন।
তেমনি প্রিয় নবী উম্মতের উভয় জগতের সফলতার জন্য নিজের জীবনকে বিলীন করে দিয়েছেন। নিজের সুখের কথা ভুলে দিনরাত উম্মতের পিছনে ছুটেছেন। বরং তিনি পিতার চেয়েও বহুগুণ বেশী চেষ্টা প্রচেষ্টা করেছেন।
সামনের হাদিস শরিফের প্রতি লক্ষ্য করুন
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ النَّاسِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا، فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ جَعَلَ الْفَرَاشُ وَهَذِهِ الدَّوَابُّ الَّتِي تَقَعُ فِي النَّارِ يَقَعْنَ فِيهَا، فَجَعَلَ يَنْزِعُهُنَّ وَيَغْلِبْنَهُ، فَيَقْتَحِمْنَ فِيهَا، فَأَنَا آخِذٌ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ، وَهُوَ يَقْتَحِمُونَ فِيهَا
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার ও লোকদের উদাহরণ এমন ব্যক্তির মত, যে আগুন প্রজ্জলিত করল। আর যখন তার চারদিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন কীট-পতঙ্গ ও ঐ সমস্ত প্রাণী যারা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা তাতে পুড়তে লাগল। তখন সে লোকটি সেগুলোকে আগুন থেকে ফিরানোর চেষ্টা করতে লাগল; কিন্তু সেগুলো তাকে পরাজিত করে আগুনে পতিত হল। তদ্রুপ আমিও তোমাদের কোমর ধরে বাঁচাবার চেষ্টা করছি; কিন্তু তোমরা তাতেই পতিত হচ্ছ। (সহিহ বুখারি, হাদিস- ৬৪৮৩)তেমনি প্রিয় নবী উম্মতের উভয় জগতের সফলতার জন্য নিজের জীবনকে বিলীন করে দিয়েছেন। নিজের সুখের কথা ভুলে দিনরাত উম্মতের পিছনে ছুটেছেন। বরং তিনি পিতার চেয়েও বহুগুণ বেশী চেষ্টা প্রচেষ্টা করেছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 























