আসন্ন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগের দিন কেন্দ্রে ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্তে প্রশ্ন ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাতের ভোটখ্যাত ২০১৮ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় ভোট গ্রহণের দিন সকালে কেন্দ্রে ব্যালট পাঠানোর নিয়ম চালু হয় ২০২৩ সালে হাবীবুল আউয়াল কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর। তবে বর্তমান কমিশন আবারও আগের দিন ব্যালট পাঠানোর নিয়মে ফিরে গেছে। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কিনা– এ প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু না বললেও বিলুপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেছেন, কারচুপির সুযোগ বন্ধে ব্যালট ভোট গ্রহণের দিন সকালে পাঠানো উচিত। এটি একটি মীমাংসিত ব্যাপার। আগের রাতে ব্যালট পাঠালে অনিয়মের শঙ্কা এবং সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার আশঙ্কা করছেন, জয়ী হতে মরিয়া ব্যক্তিরা ২০১৮ সালে রাতের ভোটের অভিজ্ঞতা আগামীতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন। তিনি বলেন, এ আশঙ্কা তৈরির সুযোগ রাখা ঠিক হবে না। যদি রাতে অনিয়ম নাও হয়, পরাজিত প্রার্থীরা নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে রাতের ভোটের অভিযোগ তুলতে পারেন। তাই নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত এবং কারচুপির সুযোগমুক্ত রাখতে ব্যালট সকালেই পাঠানো উচিত। নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে নৌকায় সিল মেরে বাক্স বোঝাই করার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের তদন্ত না করলেও চলতি বছর গঠিত কমিশন তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।
সেই নির্বাচনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে সারাদেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের অধিকাংশ দখল নেয় পুলিশ ও র্যাব। বাহিনী দুটির সদস্যরা সেই সময়কার রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্যালটে রাতভর সিল মেরে বাক্সে ঢোকান। অধিকাংশ কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরা হয়েছিল।
২০১৮ সালের নির্বাচনে দেখানো হয়েছিল ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। অথচ অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র সেই নির্বাচনে সারাদিন ভোটারশূন্য ছিল। ফলাফলে দেখানো হয় ২৬১ আসনে প্রার্থী দিয়ে ২৫৯ আসনে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির শরিক জাতীয় পার্টি ২৬ আসনে মহাজোটের সমর্থন নিয়ে ২২টিতে জয়ী হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট মাত্র আটটি আসন পেয়েছে বলে দেখানো হয়। ফলাফলে দেখানো হয়, আওয়ামী লীগ একাই প্রদত্ত ভোটের ৭৬ শতাংশ এবং বিএনপি জোট ১৩ শতাংশ পেয়েছে। জাতীয় পার্টি ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলে দেখানো হয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২১২টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট গ্রহণের তথ্য দেওয়া হয়। ৬৮২টি কেন্দ্রে নৌকা প্রদত্ত ভোটের শতভাগ পেয়েছে বলে দেখানো হয়। ছয় হাজারের বেশি কেন্দ্রে নৌকার প্রাপ্ত ভোট ৯০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়। এমন অবিশ্বাস্য নির্বাচন বন্ধে ২০২৩ সালে হাবীবুল আউয়াল কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় আগের রাতে নয়, ব্যালট পাঠানো হবে ভোট গ্রহণের দিন সকালে। এতে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রদত্ত ভোট কমে হয় ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ।
নির্বাচন ও গণভোট এক দিনে হওয়ায় বর্তমান কমিশন ভোট গ্রহণ শুরুর সময় সকাল ৮টা থেকে এগিয়ে সাড়ে ৭টা নির্ধারণ করেছে। আগের দিন কেন্দ্রে ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তে অসুবিধা দেখছে না বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, যেখানে দিনের ভোট রাতে হওয়ার শঙ্কা থাকে, সেখানে ব্যালট আগে পাঠালে অনিয়মের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এখন দিনের ভোট রাতে হওয়ার আশঙ্কা নেই। আগামীতে যদি তেমন কোনো শঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার হবে।
এদিকে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, দশকের পর দশক নির্বাচনের আগের দিন কেন্দ্রে ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এতে সমস্যা নেই। শেখ হাসিনা রাতের ভোট চালু করে বহু বছরের এ পদ্ধতিতে অবিশ্বাস তৈরি করে গেছেন। জামায়াত প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ এবং নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের আচরণ দেখতে চায়। যদি সবকিছু আইনানুগ ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে আগের দিন কেন্দ্রে ব্যালট পাঠানো হলে জামায়াত আপত্তি করবে না। যদি কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে জামায়াত নির্বাচনের আগে দলীয় অবস্থান জানাবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















