‘ড. জোহার রক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করেছিল’

রাবি প্রতিনিধি: ‘মহান শিক্ষক ড. জোহার আত্মত্যাগ ছিল দেশের জন্য। তিনি তাঁর ছাত্রদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের বুকে গুলি খেয়েছেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তিনি জীবন দিয়ে তাঁর ছাত্রদের বাঁচিয়ে পৃথিবীতে অনন্য শুধু নজিরই সৃষ্টি করেননি, বরং তাঁর রক্ত আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও বেগবান করেছিল। ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সোনার বাংলাদেশ।’

মঙ্গলবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘শহীদ ড. শামসুজ্জোহা স্মারক বক্তৃতা’য় স্মারক বক্তা হিসেবে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম’ শীর্ষক প্রবন্ধে এসব বলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরের দিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে রাবি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালাতে উদ্যত হলে রাবির তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা তাদের নিজের পরিচয় দিয়ে গুলি না চালাতে অনুরোধ করেন। কিন্তু সেনারা তাঁর নিষেধ উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে তাঁর বুকেই গুলি চালায়। এরপর গুরুতর অবস্থায় ড. জোহাকে তৎকালীন রাজশাহী মিউনিসিপ্যাল অফিসে ফেলে রাখা হয়। বিকেল চারটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপালে নেওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এ সময় ¯œাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা তুলে ধরে অধ্যাপক মান্নান বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ৪৭% ¯œাতক ডিগ্রিধারী বেকার। ভারতে এই সংখ্যা ৩৩% আর শ্রীলংকায় ৭.৮%। বেকারত্বের সূচকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। প্রতিবছর কুড়ি লক্ষ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে ছয় লক্ষ বিদেশি বাংলাদেশে কাজ করে বছরে ছয় বিলিয়ন ডলার বা পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা তাদের দেশে প্রেরণ করছে।’

‘বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বাংলাদেশের বিশাল তরুণ প্রজন্মকে প্রকৃত অর্থে জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে আমরা যে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের অথবা ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি তা অধরা রয়ে যাবে। এটি করার জন্য এই বিশাল তরুণ জনশক্তিকে আমাদের প্রকৃত সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে এবং তাদের যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী শিক্ষা আর দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। আর এই তরুণদের মনে রাখতে হবে আজকের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কাল কোন কাজে নাও আসতে পারে। তা যাতে না হয় শিক্ষা আর প্রশিক্ষণকে স্বীয় উদ্যোগে নিয়মিত শাণিত করতে হবে।’

প্রফেসর মান্নান আরো বলেন, ‘গত চার দর্শকে বাংলাদেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থায় চোখ ধাঁধানো পরিবর্তন হয়েছে। তবে একইসঙ্গে বদলে গেছে বিশ্ব। বিশ্ব এখন বিশ্বায়নের যুগে প্রবেশ করেছে। সমালোচকরা বিশ্বায়নের যতই সমালোচনা করুক কারও পক্ষে এটির বিপক্ষে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বসভ্যতায় বিশ্বায়ন ও শিল্প বিপ্লব ঘটেছে পরস্পরের হাত ধরে। বিশ্বায়ন ঘটেছে তিন ধাপে আর শিল্প বিপ্লব বর্তমানে চতুর্থ ধাপ পার করছে। বিশ্বায়নের প্রথম ধাপ শুরু হয় ১৪৯২ সালে যখন ক্রেস্ফোর কলম্বাস অনেকটা দৈবক্রমে তার জাহাজ নিয়ে আমেরিকার তীরে পৌঁছে যায়।’

‘বিশ্বের অনেক সম্পদশালী দেশ ঔপনিবেশিক শক্তির লাগামহীন শোষণের কারণে চরম দারিদ্যের স্বাদ পেয়েছে। ভারত উপমহাদেশ ও চীন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অন্যদিকে আফ্রিকা মহাদেশের সম্পদ লুণ্ঠন ছিল লাগামহীন। এই সব লুণ্ঠিত সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক ইউরোপ।’

অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান বলেন, ড. জোহা বলেছিলেন, ‘আমি বলছি গুলিবর্ষণ হবে না, যদি গুলিবর্ষণ হয় তবে কোন ছেলের গায়ে লাগার পূর্বে আমার গায়ে লাগবে।’ তিনি তাঁর কথা রেখে ছিলেন। তিনি ছাত্রদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। যারা দেশের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের জন্য নয়। তাই আমাদের ড. জোহার আদর্শ ধারণ করে দায়িত্ববান শিক্ষক-শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে শহীদ ড. জোহার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন ও তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।

রসায়ন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর মো. বেলায়েত হোসেন হাওলাদারের সভাপতিত্বে শহীদ ড. জোহার জীবনালেখ্য পাঠ করেন শিক্ষার্থী ফারজানা আশরাফী। সঞ্চালনা করেন বিভাগের শিক্ষক ড. বিলকিস জাহান লুম্বিনী ও ড. মো. মাহবুবর রহমান।

এর আগে প্রফেসর মান্নান শহীদ ড. জোহার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এসময় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক প্রফেসর প্রভাষ কুমার কর্মকার, ছাত্র-উপদেষ্টা প্রফেসর জান্নাতুল ফেরদৌস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ড. জোহা-ই এ দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তার মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটি (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে প্রতি বছর নানা কর্মসূচী পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, পেশাজীবি সংগঠন।