মুক্তিযুদ্ধ করেও আজ দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার ঝুলি হাতে লাল মিয়া

আজ পর্যন্ত কোন স্বাধীনতা বীরোধিকে হয়ত কেউ ভিক্ষা করতে দেখেনি। কিন্তু বার বার দেশের লড়াকু বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অনেকে ভিক্ষা করতে দেখে থাকবেন। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেও আজ তার জীবন বিপন্।  দুবেলা দুমুটো ভাতের জন্য দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে ফিরছেন।

এই মুক্তিযোদ্ধার  নাম লাল মিয়া বয়স ৭৫। রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায় হলেও মুক্তিযুদ্ধের পর জীবিকার টানে চলে আসেন নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল খ্যাত পলাশ উপজেলায়। বর্তমানে লাল মিয়া অসুস্থ্য অবস্থায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

লাল মিয়ার তার সনদ নম্বর ম: ১৪০৪৪০, তারিখ: ২২.১০.২০০৯, আইডি নম্বর: ০৭০৩১০০৩৪৯, গেজেট: ৩৬০৭, তারিখ: ২৪.১১.২০০৫।

আলাপচারিতায় তিনি জানালেন, মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়স থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতেন। আর ১৯ বছর বয়সে চাচার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্বরপুর থানার চাঁন্দারগাঁও গ্রামে বেড়াতে যান লাল মিয়া। সেখান থেকেই তিনি আনসার প্রশিক্ষণ নেন। পরে থেকে যান চাচার বাড়ি কৃষি কাজ করেন সেখানে। দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা আসে। ২০ বছর বয়সী লাল মিয়া বাবা-মাকে না জানিয়েই সুনামগঞ্জে চাচার বাড়ি থেকেই যুদ্ধে চলে যান। ৫ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর সালাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে চীনাকান্দি বিডিআর ক্যাম্পে ফজলুর রহমান, কাসেম আলী, মন্নান, তারা চাঁন, মনসুর আলী, সিরাজ, আলী হোসেন, আ. আলীম, রশিদ, সাত্তার, ওমর আলী, বাবু, দুলু, বিসম্বর, খালেক, গফুর, বারেক ও সিরাজসহ অন্যান্য সহযোগীদের নিয়ে ক্যাম্পে অবস্থান শুরু করেন আনসার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাল মিয়া। এখান থেকে ভাতেরটেক, সুরমা নদীর পাড়ে লালপুর, উড়াকান্দা, বেরিগাওঁ, মঙ্গলকাটা, টুকেরঘাট ও শালবন এলাকায় পাক সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে লালপুর গ্রামের সুরমা নদীর পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সংঘটিত যুদ্ধের স্মৃতি তিনি আজও ভুলতে পারেননি।

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানি স্বাক্ষরিত সনদ হাতে নিয়ে জন্মভূমি কিশোরগঞ্জে ফেরেন লাল মিয়া। বাড়ি ফিরে পরলোকে চলে যাওয়ায় বাবাকে দেখতে পাননি তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়া। বিয়ের পর হাতে ছিল না তেমন কোনও কাজ, অন্যের বাড়িতেও কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। দুঃখ, দুর্দশার সংসার জীবনে চার সন্তানের জনক হন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়া পরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে বাম হাত ও বাম পায়ের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এরপর তার জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে জীবিকার টানে চলে আসেন নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল পলাশ উপজেলায়। এখানে এসেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে কোনও কাজ জোটেনি তার ভাগ্যে। পাশে নেই কষ্টে লালনপালন করা সন্তানরাও। চার সন্তানের তিনজনই বিয়ে করে সংসার করছে কিন্তু নিজেদের অভাব অনটনের কারণে বাবার খোঁজ নিতে পারেন না। এলাকার সচেতন মহলের কাছে হাত বাড়িয়েও কোনও ফল পাননি লাল মিয়া। বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে ভিক্ষা বৃত্তিতে নামতে হয় তাকে।