কর্ণফুলীতে শীর্ষ মাদক কারবারি অধরা, তালিকায় চুনোপুঁটি

চট্টগ্রাম ব্যুরো: দেশে নতুন মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরি করা হচ্ছে। যার লক্ষ্য মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারী গডফাদার এবং মাদকের বড় সিন্ডিকেট এর বিরুদ্ধে বলে জানা যায়। দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলছে। কিন্তু এখনো টনক নড়েনি কর্ণফুলী এলাকার শীর্ষ মাদক চোরাকারবারিদের। এতে এলাকার অভিভাবকেরা শংকিত তাদের স্কুল,কলেজ পড়–য়া ছেলে সন্তানদের নিয়ে।

সাগরের লোনাজল আর কর্ণফুলী নদী মোহনায় এ উপজেলার অবস্থান। যা মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে খ্যাত,কেননা শহরের প্রবেশদ্বার এটি। সাগর পথে সহজ যোগাযোগে প্রভাবশালী শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে গড়ে তুলেছে একাধিক মাদক সিন্ডিকেট আর চোরাকারবারীর রমরমা ব্যবসা।

সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন মাদক সম্রাট গা ডাকা দিয়েছে এমন তথ্য রয়েছে। যদিও এখনো অধরা উপজেলার প্রভাবশালী কিছু মাদক কারবারিরা। যারা বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে মূলত ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। এসব অপরাধীরা অতি কৌশলী হওয়ার ফলে থানা পুলিশ এখনো নাগাল পায়নি তাদের। শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানায় পুলিশের অভিযান সীমিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে নজরে রেখেছে বলেও তথ্য দেন পুলিশ। প্রশাসনের তালিকায় চুনোপুঁটি মাদক সেবীরা। বাকি রাঘববোয়াল এখনো অধরা বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকা তালিকায় চুনোঁপটিরা এবং এলাকায় বসবাসরত মাদকের শীর্ষ চোরাকারবারিদের অনেকেই নেই। কেননা পুর্বের ওসি এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দাদের কাজে না লাগালেও বর্তমান ওসি সজাগ রয়েছে বলে জানা যায়। যদিও মাদক সম্রাটরা তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়ে এখনও মাদক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তালিকা ধরে অভিযান শুরু করছে কিনা জানা না গেলেও প্রতিদিন কর্ণফুলী থানায় সোর্পাদ হচ্ছে মাদকে আটক ব্যক্তি এমন খবর গণমাধ্যমে আসছে।

সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকাভুক্ত কর্ণফুলী উপজেলার ইয়াবা,হিরোইন,গাজাঁ,মদ সহ মাদক ব্যবসায়ীরা হলেন-ইছানগর এলাকার শাহেদ প্রকাশ সন্দীপ শাহেদ, শিকলবাহার বাংলাপাড়ার সৈয়দ আহাম্মদ,একই ইউনিয়নের পাঠানিয়াপাড়ার নুরুল আলম প্রকাশ রাক্ষুস,চরলক্ষ্যা মৌলভী পাড়ার জানে আলম,খোয়াজনগর আজিমপাড়ার আব্দুল গফুর প্রকাশ লাল মিয়া,শিকলবাহা কর্ণফুলী গার্ডেন এলাকার মুজিবুর রহমান প্রকাশ মুজিইব্যা,শিকলবাহা আহসানিয়া পাড়ার মনোয়ারা বেগম,একই পাড়ার মোঃ নজরুল,ইছানগর সৈন্যেরগোষ্টির মোঃ লিটন,উত্তর চরলক্ষ্যার মোঃ নুরুল মিয়া, চরলক্ষ্যা ৩নং ওয়ার্ডেও নুরুল আলম প্রকাশ নুরু,চরলক্ষ্যার বলিরগোষ্টির পেয়ার আহমেদ প্রকাশ দাগী,ইছানগরের মোহাম্মদ কাশেম প্রকাশ ধামা কাশেম,ইছানগর পোড়াবাড়ির মোঃ রাশেদ,মইজ্জারটেক ইয়াছিন চেয়ারম্যানের বাড়ির মোঃ ছাবের হোসেন প্রকাশ কানা ছাবেরা,খোয়াজনগর কবির মেম্বার বাড়ির ছগির আহম্মেদ,শিকলবাহা বাংলা পাড়ার মোঃ সোহেল, শিকলবাহা চিড়ারটেক এলাকার সেলিম উদ্দীন,একই ইউনিয়নে মনু হাজির বাড়ির মোঃ রনি,চরপাথরঘাটা লেঙ্গারগোষ্টির খুরশিদ আহাম্মদ, চরলক্ষ্যা বোর্ড বাজারের সেলিম,চরলক্ষ্যার মোঃ মুন্না মিয়া,মৌলভীপাড়ার মোঃ সাহাব আলী,শাহমীরপুর ৬নং ওয়ার্ডের বাবলা,ডাঙ্গারচরের বাবুল হক,চরলক্ষ্যা দফাদার বাড়ির বাইল্লা,খোয়াজনগর বেলার বাপের বাড়ির মোঃ বাবুল হক,চরপাথরঘাটা ১নং ওর্য়াডের মোঃ জাবেদ,বক্তিয়ার পাড়া দানু মেম্বার বাড়ির মোঃ বাবুল,শিকলবাহা বাংলা পাড়ার ফরিদ,জুলধা পাইপের গোড়ার নুরুল ইসলাম,মোঃ হাসান প্রকাশ ডান্ডা মিয়া,চরলক্ষ্যা মনুর বাপের বাড়ির মোঃ হোসেন প্রকাশ কাইল্যা,পাইপের গোড়া বাজারের মোঃ জাবেদ,জুলধা মাতব্বর পাড়ার জয়নাল মাস্টার, বাদুর তলার মোঃ সেলিম ড্রাইভার ,ইছানগর এলাকার মোঃ সেলিম,চরলক্ষ্যার সৈন্যেরবাড়ির সেলিম উল্লাহ,ইছানগর কবির আহমেদ বাড়ির মোঃ সেলিম উদ্দীন(হাজতে),চরলক্ষ্যার লোকমান ও আলী, ইছানগর আব্দু রশিদ বাড়ির মোঃ দিল আহমদ প্রকাশ দিলু,ইছানগর মির্জা বাড়ির জহির কলোনীর মোঃ তারেক,পারকি এলাকার মোহাম্মদ সেলিম প্রকাশ ইছাইয়া বর্তমানে শিকলবাহা,পশ্চিম চরলক্ষ্যা নাগরু বাপের বাড়ি মোহাং মন্নানের নাম রয়েছে।

এছাড়াও মাদক ব্যবসায় দাম্ভিকতা দেখাচ্ছে বলে পুলিশের অভিযোগে রয়েছে-শাহমীরপুর রাজ্জাক পাড়ার হোসনে আরা প্রকাশ মদ্দা হোসনী,দৌলতপুর ২নং ওয়ার্ডের একাধিক মামলার আসামী আইয়ুব,জুলধা পাইপের গোড়ার চোরাকারবারী মাদারী শুক্কুর,চরপাথরঘাটার কিছু মাছ ব্যবসায়ী,উপজেলার কতিপয় ইউপি সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের পদে থাকা নানা ছোটবড় নেতারা এসব কাজে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়। যাদের প্রতি স্থানীয় প্রশাসন তীক্ষ দৃষ্টি রেখেছে যেকোন মুর্হুতে আটক হতে পারে এসব মাদক কারবারীরা। এদের মধ্যে বেশ কজন পলাতক ও জেল হাজতে থাকলেও বেশির ভাগেই অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানান, এরা বেশিরভাগেই এলাকায় প্রভাবশালী এবং দাপুটে। কেননা জেলা পর্যায়ের ক্ষমতাসীন কিছু নেতা ও বিএনপি জামাতের নেতারা এসব মাদক কারবারির আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা। যার প্রভাবে কর্ণফুলী পুলিশও অভিযানে যেতে সময় নিচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। ফলে এখনো অধরা থেকে যাচ্ছে বড় সিন্ডিকেট আর মাদক ব্যবসায়ীরা।

সূত্রে আরো জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে যাদের নাম তালিকায় রয়েছে, সেসব গডফাদার, সরকারদলীয় প্রভাবশালী আশ্রয়দাতা, বিনিয়োগকারীসহ পৃষ্ঠপোষক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাও জনপ্রতিনিধিদের আইনের আওতায় আনা না গেলে,কর্ণফুলীতে মাদকের মূলোৎপাটন সম্ভব নয় বলে বলে মন্তব্য করেন স্থানীয়রা।

না হয় দিনদিন মরণ নেশা ইয়াবার বিষাক্ত ছোঁবলে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম নিঃশেষ হয়ে যাবে অচিরেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অন্য মাদকের পরিবর্তে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এই উপজেলায়। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কর্ণফুলীতে মাদকাসক্তের হার শতকরা ৭৫-৮০ ভাগই এখন ইয়াবাসেবী। পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সেবন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় দ্রুত ইয়াবার বিস্তার ঘটছে। মাদক কারবারিদের এ দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, এসব প্রতিরোধ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১১নং মাতব্বরঘাট,১০নং ঘাটপাড়, ব্রিজঘাট, ইছানগর ঘাট,বাংলাবাজার ঘাট,শিকলবাহা চিড়ারটেক ,ডাঙ্গারচর ঘাট,কক্সবাজার হতে আসা মাছের ট্রাক, টেকনাফ হতে আসা গরুর চালান,সাদা প্রাইভেট কার কিংবা নাম্বারবিহীন কিছু মোটর সাইকেলে করে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা লোকালয়ে নিয়ে আসে।

জানা যায়, চরপাথরঘাটার ব্রিজঘাট কয়লার মাঠ,পুরাতন ঘাটের কিছু দোকান,বিএফডিসি রোডের চিকন ঘাট,ইছানগর খালিমাঠ,খোয়াজনগর বশির মেম্বার কলোনী ,চরপাথরঘাটা মাদ্রাসাপাড়ার খোলামাঠ,সিডিএ আবাসিক, শাহমীরপুর রাজ্জাক পাড়ার হোসনীর বাসা বাড়ি,শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাড় যেন মাদক সেবনের গোপন আস্তানা নামে পরিচিত এবং এসব স্থানে নিয়মিত বসে মাদক সেবনের আসর।

আর এসব আসরে গাঁজা সাধারণত ‘শুকনা’, ‘সবজি’ নামে পরিচিত, ইয়াবা বা বাবা দু-তিন প্রকার রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় ছোট মাথা এবং ৪০০ থেকে ৫০০টাকায় বিক্রি হচ্ছে বড় মাথা। আর মাত্র ২০ টাকায় পাওয়া যায় গাঁজার পুঁটলি। অনেকে গ্রাম হিসেবে কিনে থাকেন। মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের অভিযানে এলাকার চিহ্নিত কয়েকজন চুনোপুঁটি মদ ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও রহস্যজনকভাবে বড় বড় ইয়াবা লাঘববোয়ালেরা বহাল তবিয়তে রয়েছে।

এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতও এখনো পর্যন্ত মাদক বিরোধী কোন উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেননি। তবে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়।
মাদক কারবারীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুর বিধান রাখা হবে বলে সংসদে জানিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এই নতুন আইনের পটভূমিতে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছে। দেশের যুব সমাজকে রক্ষা করতে এই লড়াই ছাড়া কোন পথ নেই বলে জানা যায়।
কর্ণফুলীতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের সাড়াঁশি অভিযান দৃশ্যমান নয় কেন জনগণের এমন প্রশ্নে কর্ণফুলী থানার (ওসি তদন্ত ) ইমাম হাসান বলেন, “মাদকের ব্যাপারে প্রশাসন জিরো টলারেন্সে আছে। সারাদেশের ন্যায় কর্ণফুলীতেও অভিযান চলছে । মাদক তো প্রতিদিনেই ধরছি, কোনদিনও বাদ যাচ্ছেনা”।

কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী জানান, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার মহান জাতীয় সংসদে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড আনছে। সুতরাং উপজেলায় মাদক নির্মূলে প্রশাসনেরও আরো বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনে রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও শ্রমিক নেতা ইজ্ঞিনিয়ার ইসলাম আহমেদ জানান,মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও কর্ণফুলী প্রশাসন অনেকটা নীরব তা মানতে হবে। তবে আমি সামাজিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো অচিরেই। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারি কমিশনার (কর্ণফুলি জোন) জাহেদুল ইসলাম জানান-“মাদকের বিরুদ্ধে যে একদম অভিযান হচ্ছেনা তা সঠিক নয়। প্রতিদিনেই কয়েকটি মাদক মামলা নথিভূক্ত হচ্ছে কর্ণফুলী থানায়। যা অন্যান্য থানায়ও হচ্ছেনা বলে দাবি করেন তিনি”।