খাগড়াছড়িতে ৪১তম ককবরক দিবস উদযাপন

দহেন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: ১৯ জানুয়ারী “ককবরক” দিবস। ভারতবর্ষের অন্যতম প্রাচীন ত্রিপুরা জাতির মাতৃভাষা এবং ত্রিপুরা রাজের একটি আদি ভাষা ককবরক। ১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারীতে ত্রিপুরা রাজ্যের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করায় প্রতিবৎসর এই দিনে ককবরক দিবস পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে ১৯ জানুয়ারী ২০১৯খ্রি. শনিবার বিকাল ৪.০০ ঘটিকার সময় বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ, ককবরক রির্সাচ ইনস্টিটিউট, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম, বাংলাদেশ ও য়ামুক (একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন) এর যৌথ উদ্যোগে পালিত হয়েছে।

বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি অপূর্ব ত্রিপুরার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত, লেখক ও গবেষক বাবু প্রভাংশু ত্রিপুরা মহোদয়। অনুষ্ঠানে আলোচনায় উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি সুরেশ মোহন ত্রিপুরা, সংস্কৃতি কর্মী যশোবর্ধন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি ককবরক রির্সাচ ইনস্টিটিউট এর সভাপতি প্রার্থনা কুমার ত্রিপুরা, ককবরক লেখক ও নাট্যকার অলিন্দ্র ত্রিপুরা, জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক ও বিটিকেএস’র সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, বিটিকেএস ‘র সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত ত্রিপুরা (বিবিসুৎ), বিটিকেএস’র অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক শাপলা দেবী ত্রিপুরা প্রমুখ।

অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, ককবরক ত্রিপুরার হাজার হাজার বছরের আদি ভাষা। ‘কক’ মানে ভাষা, ‘বরক’ মানে মানুষ। অর্থাৎ যে জনগোষ্ঠির মানুষ ককবরক ভাষায় কথা বলে এবং তারা ত্রিপুরা জাতি হিসেবেও পরিচিত। কবরক ভাষা তিবব-বর্মণ ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম। ভারতের উত্তর-পূর্বাংশ এবং বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী পার্বত্য চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে আজ ককবরক ভাষি জনগোষ্ঠির মানুষ আছে। ভাষাটির তিববত-বর্মণের মতো অন্যান্য ভাষা যেমন বড়ো, গারো এবং দিমাসার’র সাথে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

আলোচকবৃন্দ ছাড়াও মুক্ত আলোচনায় অনুভূতি প্রকাশ করেন য়ামুকের সভাপতি প্রমোদ বিকাশ ত্রিপুরা, বিটিকেএস খাগড়াছড়ি সদর আঞ্চলিক শাখার সভাপতি কাজল বরন ত্রিপুরা ও সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কান্তি ত্রিপুরা, জাবারাং এর কো অর্ডিনেটর বাবু বিনোদন ত্রিপুরা টিএসএফ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নক্ষত্র ত্রিপুরা, এনজিও কর্মী বিপ্লব ত্রিপুরা, টিএসএফ কেন্দ্রীয় কমিটির সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক খঞ্জন জ্যোতি ত্রিপুরা, টিএসএফ সদর শাখার সাধারণ সম্পাদক খলেন জ্যোতি ত্রিপুরা প্রমুখ।

আলোচনা সভার ফাঁকে ফাঁকে ককবরক গান ও কবিতা আবৃত্তি করা হয়। গান আবৃত্তি করেন সুকান্ত ত্রিপুরা আর ককবরক কবিতা আবৃত্তি করেন দয়ানন্দ ত্রিপুরা, কৃর্ত্তিকা ত্রিপুরা, নিশি ত্রিপুরা, সুবর্না ত্রিপুরা, খঞ্জন জ্যোতি ত্রিপুরা, চারু বিকাশ ত্রিপুরা ও খলেন জ্যোতি ত্রিপুরা। এছাড়াও টিএসএফ’র উদ্যোগে ককবরকের বিভিন্ন ধরনের বই প্রদর্শনী করা হয়।

বিটিকেএস কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবু খগেন্দ্র কিশোর ত্রিপুরার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিটিকেএস কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক দয়ানন্দ ত্রিপুরা এবং ৪১তম ককবরক দিবসের ধারণাপত্র পাঠ করেন খাগড়াছড়ি ককবরক রির্সাচ ইনস্টিটিউট এর সদস্য জগদীশ ত্রিপুরা।

ধারণা পত্রে বলা হয়, আধুনিক সাহিত্য ভান্ডার গড়ে তুলতে হলে ককবরকের লিখিত চর্চাকে অবশ্যেই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এটা সম্ভব হতে পারে-

(০১) একটি সুনির্দিষ্ট ককবরক বানানরীতি চালু করা।

(০২) ককবরক অভিজ্ঞ ব্যক্তি বর্গের সমন্বয়ে সর্বজনগ্রাহ্য একটি সাধারণ “ককবরক শব্দ ভান্ডার” বের করা।

(০৩) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ককবরক পড়ানোর প্রতি শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতনা বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন বই, পুস্তিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি প্রকাশনার মাধ্যমে ককবরকে যতটুকু সাহিত্য চর্চা হয়েছে সেই কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে নতুন প্রজন্মের ককবরক প্রেমীদের অবশ্যই আরো অধিক সক্রিয় হতে হবে। কারণ ত্রিপুরাদের আত্মপরিচয়ের একটি প্রধান উপাদান বলেই শুধু নয়, তাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্যও ককবরকের লিখিত চর্চার বিকাশ ঘটানো দরকার বলে উল্লেখ করেন।