ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটির আয়োজনে “শতদেশ ভ্রমনের গল্প”

মু. ইলিয়াস হোসেন, ঢাবি প্রতিনিধিঃ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সংগঠন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটি”। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র লক্ষ্য গবেষণা’র বিকাশের লক্ষ্যে এই সংগঠন তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের নিয়ে বহুমাত্রিক প্রোগ্রামের আয়োজন করে আসছে। দেশের পরিসর পেরিয়ে আমাদের গবেষকদল বহির্বিশ্বেও দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি গড়ে তুলছে।

গত বছরের ৩-১১ আগস্ট তারিখে মেঘালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিয়েছে গবেষণা সংসদের ২২ সদস্যদের গবেষক দল। সেখানে সংগঠন থেকে ৫ টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র সহ বিভিন্ন দেশের নানা কনফারেন্সে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পাচ্ছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রথম এই গবেষণা সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ আন্তর্জাতিক মানের গবেষক সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সেই ধারাবাহিকতায় ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৩.৩০ মিনিটে সেন্টার ফর অ্যডভান্স রিসার্চ ইন আর্টস এণ্ড সোস্যাল সাইন্স অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী প্রোগ্রাম “শতদেশ ভ্রমণের গল্প”।

বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের ১০০ টি দেশ ভ্রমণকারী কাজী আসমা আজমেরী শতাধিক তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের শুনালেন তাঁর শতদেশ ভ্রমণের মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা। উদ্বুদ্ধ করলেন বিশ্বভ্রমণের প্রতি তরুণ শিক্ষার্থীদের। সাথে সাথে ভিসা কেন্দ্রীক জঠিলতা এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে কিভাবে জ্ঞানার্জনের অন্যতম মাধ্যম দেশ ভ্রমণ করা যায় দিয়েছেন সেই দিকনির্দেশনাও। সীমিত খরচে বেশি দেশ কিভাবে ঘুরা যায় সেই তথ্যগুলো উঠে এসেছে তাঁর বক্তৃতায়।

তার ভাষায়,” আমি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ১০০ টি দেশ ভ্রমণ করেছি বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করে, আমি বিদেশী পাসপোর্ট নেই না কেন? আমি তাদের বলি, বিদেশী পাসপোর্ট নেওয়াতে গৌরবের কিছু নেই। একজন দেশপ্রেমীক হিসেবে আমাদের বিদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করা উচিত নয়। আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই আমার দেশকে দেশের ইতিহাসকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আমাদের স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমার বন্ধুদের সাথে গর্বভরে আলোচনা করেছি। পৃথিবীর একমাত্র জাতি হিসেবে আমরা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। সর্বপ্রথম যখন আমি দেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হই তখন আমি সবেমাত্র গ্রাজুয়েশন শেষ করেছি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমার কোন চাকুরী ছিলনা। পরিবার থেকেও পর্যাপ্ত সাপোর্ট ছিলনা। আমি আমার গহনা বিক্রি করে প্রথম নেপাল ভ্রমণ করি।

অতঃপর আমি থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, মালেয়েশিয়া, সিংগাপুর, দুবাই, নাইজেরিয়া ইত্যাদি দেশগুলো ভ্রমণ করি। ভাগ্যক্রমে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করার সুযোগ পাই। আমি শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। আমি দেশ ভ্রমণের জন্য বছরের একটি অংশকে নির্দিষ্ট করে নেই।

তোমাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, দেশ ভ্রমণ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল। হার না মানার মানসিকতা থাকতে হবে। বিভিন্ন সংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমার বিরাট একজন অনুপ্রেরণা মরক্কোর ইবনে বতুতা। আমি মরক্কোতে গিয়েছি। সেখানকার পরিবেশ আমায় বিমুগ্ধ করেছে।

আমার বাবা বলতেন, তুমি যদি কোন দেশ বা জাতি সম্পর্কে জানতে চাও তাহলে সেদেশের জাদুঘরগুলো দেখতে যাবে। আমি যখনই যে দেশে ভ্রমণ করেছি তখনই সেদেশের জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে গিয়েছি। মিসরের ফারওদের মমি আমাকে বিস্মিত করেছে।

তোমাদেরকে বলব, তোমরা ভ্রমণ শুরু কর। প্রথমে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল এবং ভুটান দিয়ে শুরু করতে পারো। ভ্রমণের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তোমার মাথায় রাখতে হবে সেটি হলো পূর্বপরিকল্পনা। শপিং এবং মালামাল বহনের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। সর্বোপরি জ্ঞানার্জনের জন্য বিশ্বভ্রমণ করবে।” এভাবে তাঁর দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণের কাহিনী বর্ণনা করেছেন তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে।

উপস্থিত ছিলেন বাংলার সক্রেটিস খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি তার বক্তব্যে দেশ ভ্রমণ এবং দেশের প্রকৃতি, জনজীবন ইত্যাতি নিয়ে গবেষণা করতে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণীত করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতে পরামর্শ দেন।

যারা তাদের মেধা ও মননশীলতা দিয়ে পরিচ্ছন্ন করবে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার এবং যাবতীয় অপসংস্কৃতি, বিনির্মাণ করবে সুখী, সমৃদ্ধ দেশ। সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাইফুল্লাহ সাদেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটিকে বিভিন্ন দেশের রিসার্চ সোসাইটির সাথে গবেষণা করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের রিসার্চ সোসাইটি হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।