সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজারের অধিক হত্যা !

মু. ইলিয়াস হোসেন, ঢাবি প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিদায়ী ২০১৮ সালে ৫,৫১৪ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,২২১ জন নিহত ও ১৫,৪৬৬ জন আহত হয়েছে।

এসময় রেল পথে ৩৭০টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়, নৌ পথে ১৫৯টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত ও ২৩৪ জন আহত এবং ৩৮৭ জন নিখোঁজ হয়েছে, আকাশ পথে ০৫টি দুর্ঘটনায় ৫৫ জন নিহত এবং ৩২ আহত হয়েছে। সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশ পথে সম্মিলিতভাবে ৬,০৪৮টি দুর্ঘটনায় ৭,৭৯৬ জন নিহত এবং ১৫,৯৮০ জন আহত হয়েছে।

দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্র সমূহে প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে দেখা গেছে , বিদায়ী ২০১৮ সালে ছোট-বড় ৫,৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,২২১ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১৫,৪৬৬ জন। এতে ১,২৫২ জন চালক-শ্রমিক, ৮৮০ জন শিক্ষার্থী, ২৩১ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৭৮৭ জন নারী, ৪৮৭ জন শিশু, ১০৬ জন শিক্ষক, ৩৪ জন সাংবাদিক, ৩৩ জন চিকিৎসক, ০৯ জন প্রকৌশলী, ০২ জন আইনজীবী এবং ১৯২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে।

উল্লেখিত সময়ে সংগঠিত দুর্ঘটনায় সর্বমোট ৭,৩৫০টি যানবাহনে পরিচয় মেলেছে। যার মধ্যে ১৮.৯২ শতাংশ বাস, ২৮.৬৮ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৭.৯৩ শতাংশ কার-জীপ-মাইক্রোবাস, ৯.৬১ শতাংশ অটোরিক্সা, ২৫.৩০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৩.৭২ শতাংশ ব্যাটারী চালিত রিক্সা, ৫.৮০ শতাংশ নছিমন করিমন ও হিউম্যান হলার সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

সংগঠিত দুর্ঘটনার ৪১.৫৩ শতাংশ গাড়ি চাপা, ২৯.৭২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬.১৮ শতাংশ খাদে পড়ে, ০.৫৫ শতাংশ চাকায় ওড়না পেছিয়ে এবং ০.৮৯ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সমূহঃ

১। বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালনা। ২। বিপদজনক অভারটেকিং। ৩। রাস্তা-ঘাটের নির্মান ক্রটি। ৪। ফিটনেস বিহীন যানবাহন। ৫। যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা। ৬। চালকের অদক্ষতা। ৭। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার। ৮। মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। ৯। রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা। ১০। রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা। ১১। ওভারলোড। ১২। ছোট যানবাহন বৃদ্ধি।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশ মালাঃ

১। ট্রাফিক আইন, মোটরযান আইন ও সড়ক ব্যবহার বিধিবিধান সম্পর্কে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য, মসজিদ, মন্দির, গির্জায় জনসাধারণের জন্য ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা।

২। টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র সমূহে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা।

৩। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ করা, ফুটপাত বেদখল মুক্ত করা।

৪। রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা। জেব্রাক্রসিং অংকন করা।

৫। গণপরিবহন চালকদের প্রফেশনাল ট্রেনিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

৬। যাত্রী ও পথচারী বান্ধব সড়ক পরিবহন বিধি প্রনয়ন।

৭। গাড়ীর ফিটনেস ও চালদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে আধুনিকায়ন করা।

৮। জাতীয় মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেন এর ব্যবস্থা করা।

৯। অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

১০।সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠনপূর্বক সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের চিকিৎসা ও পূণর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

১১।লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নকালে চালকের ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা।

১২। পর্যাপ্ত মানসম্মত গণপরিবহন নামানোর উদ্যোগ নেয়া।

আজ ২৫ জানুয়ারী শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্চে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, “বিগত ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনসমূহ দেশবাসী ও গণমাধ্যমের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত হওয়ায় সরকার অত্র সংগঠনের প্রতিবেদনসমূহ গুরুত্ব দিয়ে সড়ক নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, রোডশো, বিআরটিএতে রোড সেইফটি ইউনিট গঠন, ২২ টি জাতীয় মহাসড়কে ত্রিহুইলার অটোরিক্সা, নছিমন করিমন উচ্ছেদ, বেশ কয়েকটি জাতীয় মহাসড়কের ২ লাইন/৪ লাইন চালু করা, সড়ক বিভাজক স্থাপন, আন্ডারপাস-ওভারপাস নির্মাণ, ফিটনেস বিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, চালক প্রশিক্ষণ, ফিটনেস পদ্ধতি ডিজিটাল করাসহ নানামূখী কার্যক্রমের কারণে যানবাহনের সংখ্যানুপাতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সক্ষম হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

বেসরকারী সংগঠন সমূহের ধারাবাহিক কার্যক্রম ও গণমাধ্যমসমূহে বছরব্যাপী সড়ক নিরাপত্তামূলক টকশো, রিপোর্ট ও সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় এই সেক্টরে উল্লেখ্য যোগ্য ভুমিকা রাখছে। সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়ে সড়ক নিরাপত্তায় যতাযথ পদক্ষেপ নিলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সক্ষম হবে বলে আমরা মনে করি।”