কর্ণফুলীতে পুলিশ ও মালিক সমিতির টোকেনই অবাধে চলছে নিষিদ্ধ যানবাহন

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রতিনিধি: নগরীর নিকটবর্তী কর্ণফুলী উপজেলার আরাকান মহাসড়ক ও অলিগলিতে সিএনজি এবং ব্যাটারী চালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম দিন দিনবেড়েই চলছে।

জানা যায়, ট্রাফিক পুলিশ ও কথিত মালিক সমিতির টোকেনেই চলছে এসব সিএনজি ও তিন চাকার নিষিদ্ধ যানবাহন। সচেতন মহলের দাবি, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে চলছে এসব যানহতে চাঁদাবাজি। যেন টোকেনই ভরসা আবার টোকেনে ব্যবসা।

Advertisement

অপরদিকে, হাইকোর্টের নিদের্শ অমান্য করে আইন কানুনের তোয়াক্কানা করেই ট্রাফিক পুলিশের টিআই ও সার্জেন্ট সহ কিছু নামস্বর্বস্ব মালিক সমিতির যোগসাজেসে টোকেনে আদায় করছে লাখলাখ টাকা। এ যেন কাঁচা টাকার রমরমা বাণিজ্যে। যে টাকার একটি বড়অংশ স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পকেটেও যাচ্ছে বলে প্রচার রয়েছে।

তথ্যমতে, কর্ণফুলী উপজেলার প্রধান সড়ক গুলোতে অবৈধ কিছু সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারী চালিত টমটম এবং তিন চাকার রিক্সা চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। মৃত্যুর মিছিলেযোগ হচ্ছে নতুন নতুন মানুষ ও শিশুদের নাম। আরাকান মহাসড়কের মইজ্জ্যারটেক ও শিকলবাহা ক্রসিং গুলোতে মেট্রোপুলিশ ও হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান করলেও স্থানীয়রা বলছে তা নামমাত্র আইওয়াশ।

ধরা ছোয়ার বাহিরে এসব যানবাহন বরং সমিতি ও তাদের নির্দিষ্ট টোকনের মাধ্যমে চলছে অবাধে সিএনজি অটোরিকশা সহ নিষিদ্ধ যান। সুত্রে মতে, গত বছরের ডিসেম্বরে সিএনজি হতে মাসে ১০০ টাকা আদায় করলেও নতুন বছরে বাড়ছে চাঁদার পরিমাণ। মইজ্জ্যারটেকে ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি এখন মাসে ১২০ থেকে ২০০ টাকা করে প্রতি সিএনজি হতে আদায় করছে এমনটি অভিযোগ স্বয়ং সিএনজি ড্রাইভারদের।

অন্যদিকে নিষিদ্ধ টমটম ও তিন চাকার ব্যাটারী চালিত অটো রিক্সা হতে কিছুদিন কুদ্দুস নামে আরেক ব্যক্তি মাসিক হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেন এবং সমিতি গুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ স্টিকার লাগিয়ে কয়েক হাজার সিএনজি হতে লক্ষ লক্ষ টাকা হজম করারও অভিযোগ ওঠেছে।

অপরদিকে শফি, হারুন ও জব্বার নামে তিন সিএনজি চালক বলেন,‘পুলিশকে দেয়ার কথা বলে শ্রমিক সংগঠন গুলো তুলছে এই টাকা। মূলত ঘাটে ঘাটে অর্থ লেনদেনের কারণেই সরকারি নির্দেশনার পরও কর্ণফুলীর উপজেলার মহাসড়কে বন্ধ করা যাচ্ছেনা নিষিদ্ধ চাঁদাবাজি ও তিন চাকার যান।

তবে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে ট্রাফিক পুলিশ বলছে, মহাসড়কে কোন ভাবেই চলতে দেয়া হবেনা তিন চাকার যান।’ তবে মাঠের তথ্যের সাথে কথায় আর কাজে আসমান জমিন ফারাক তাদের। সরেজমিনে দেখা যায়, এই সড়কে চলা প্রায় সবগুলো সিএনজি অটোরিক্সার সামনের গ্লাসে জল রংয়ের কতগুলো বিশেষ স্টিকার লাগানো।

অনেকের মতে যা পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকার বিনিময়ে এই স্টিকার গুলো কেনা হয়েছে শ্রমিক সংগঠনের কাছ থেকে। শ্রমিক সংগঠন ও সমিতি গুলো মাসে মাসে একেক রংয়ের এসব স্টিকার কোথায় পায় জানতে চাইলে ড্রাইভারেরা বলেন, ট্রাফিক পুলিশেই মূলতএসব স্টিকার সমিতিকে দেন। এই টোকেন থাকা মানে মহাসড়কে চলার বৈধতা। আর কোন বৈধ কাগজপত্র লাগেনা তাদের।

ট্রাফিক পুলিশ গাড়ির লাইসেন্স চেক করেন কিনা জানতে চাইলে সিএনজি ড্রাইভার শফি বলেন, ‘গাড়ি চালাচ্ছি গত ৪বছর হবে কখনো কাগজ দেখতে চাইনি। তবে প্রতি মাসে মাসে টোকেন ঠিকেই চেক করেন।’

উপজেলার মইজ্জ্যারটেকের সালাম ড্রাইভার বলেন, ‘হাইওয়ে রোডে চলার জন্য টোকেন আছে। এই টোকেন আমরা টাকা দিয়ে প্রতিমাসে নিই। টোকেনের টাকা দেয়া হয় আমাদের সমিতির লোকের কাছে। এরা ট্রাফিক পুলিশ হতে টোকেন এনে তাদের গাড়িতে লাগিয়ে দেয় বলে জানান।’

সচেতন মহলের দাবি, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের কোন কার্যকর পদক্ষেপনা থাকায় এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর টোকেন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। আর অভিযোগ ওঠেছে, এ বাণিজ্যের সাথে জড়িত রয়েছেন ট্রাফিক পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট হর্তাকর্তাগণ।

নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্বেও এসব বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করলে তারা এ সব বিষয়েকিছু বলতে অপরাগতা পোষন করেন। কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনেরও এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি।

বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ যানবাহন চলাচল করলেও বাংলাদেশ রোডট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ) ও পুলিশ প্রশাসন যেন দেখেও দেখছে না। সে সুযোগে রমরমা টোকেন বাণিজ্যে মেতে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট চক্র। ফলে হাতিয়ে নিচ্ছে তারা বছরে অর্ধ কোটি টাকারও বেশি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআরটিএ কিংবা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া এসব টোকেন বিতরণ করছে উপজেলা ভিত্তিক বিভিন্ন সিএনজি-অটোরিকশা মালিক সংগঠন ও শ্রমিক সমিতির নেতাকর্মীরা। এ থেকে মোটা অঙ্কের মাসিক মাসোহারা পায় বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এমনটি অভিযোগ সচেতন মহলেরও।

এসব অবৈধ সিএনজি চলাচলে প্রশাসনের ঝামেলা এড়াতে মালিক ও চালকরা প্রশাসনের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে স্থানীয় কিছু নেতাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে মাসোহারা দিয়ে রাস্তায় চলাচলের বৈধতা কিংবারুট পারমিট নেন। সেজন্য মাসে সিএনজি প্রতি টাকা দিয়েটোকেন নিতে হয়।

অনুসন্ধানে আরো ওঠে আসে, এসব যানবাহনের টোকেন বাণিজ্যের নেতৃত্বে আছেন চট্টগ্রাম অটো রিকশা-অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়ন রেজি নং চট্ট-১৪৪১, কর্ণফুলী থানা অটো রিকশা অটোটেম্পো ও চার ষ্টোক শ্রমিক কল্যাণ বহূমুখী সমবায় মালিক সমিতিলিঃ রেজি নং-৮৮৮২, কাঞ্চনা ফুলতলা ডলুব্রীজ অটো রিকশা ও সিএনজি মালিক বহুমূখী সমবায় সমিতি লিঃ রেজি নং-১০৬১৭, গ্রাম অটোরিকশা অটো টেম্পো শ্রমিক ইউনিয়ন রেজি নং-চট্ট ১৪৪১, ডলুব্রীজ অটো রিকশা সিএনজি মালিক সমবায় সমিতি রেজি নং৮০১৫ (১৯৯) ও অঞ্চল ভিত্তিক কিছু নেতা।

তবে নেপথ্যে থেকে কারা এসব সমিতির নেতৃত্বে দিচ্ছেন তাদের ব্যাপারে ভয়ে মুখ খুলতে নারাজসাধারণ ড্রাইভারেরা। কর্ণফুলীতে মাসিক ‘টোকেন’-এ চলছে কয়েক হাজার সিএনজি। টোকেনের মাধ্যমে এসব অবৈধ অটোরিকশা ও চালককে বৈধতা দিচ্ছেনকতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্য ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। বিভিন্ন সড়কে চলছে অবৈধ অটোরিকশা।

এছাড়াও যারা কর্ণফুলী ব্যতিত অন্য উপজেলা হতে মইজ্জ্যারটেক মোড়েযাত্রী নিয়ে আসে। তাদের প্রতিটি সিএনজি হতে ‘চট্টগ্রাম অটোরিকশা-অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়ন’ নামক সমিতি রশিদ কেটেচাঁদা আদায় করে প্রতি সিএনজি ৪০ টাকা। আর কাটা রশিদে লিখাথাকে ২০ টাকা।

সিএনজি ড্রাইভারদের দেওয়া তথ্যমতে, কর্ণফুলীতে ‘চট্টগ্রাম অটোরিকশা অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়ন’ এর অধীনে ৭শ মতোবেশি সিএনজি ও কর্ণফুলী থানা অটো রিকশা অটো টেম্পো ও চারষ্টোক শ্রমিক কল্যাণ বহূমুখী সমবায় মালিক সমিতি লিঃ এর রয়েছে ১২শ’র মতো সদস্য।

তাহলে আনুমানিক হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার টাকা, মাসে৬ লাখের উপরে এবং বছরে ৭২ লাখ টাকা শুধু সিএনজি ও অটো রিক্সা থেকেই আদায় করা হচ্ছে। এ টাকা যাচ্ছে কার পকেটে? এ চাঁদাবাজি রুখবে কে? সেটাই সাধারণ জনগণের প্রশ্ন! দেখা যায়, পুরাতন ব্রিজঘাটে সিএনজি এসে দাড়ানোর আগেইরশিদ কেটে ল্যাইনম্যান জকির নামে এক লোক। তার দেওয়া ১৫টাকার রশিদে লেখা ল্যাইনমান ৫, এক্সিডেন্ট ফান্ড ৩, মৃত্যু ফান্ড ৭ মোট ১৫ টাকা।
নিচে সভাপতি সম্পাদক এর ছাপা স্বাক্ষর। চোখে পড়ার মতো একটি লাইন ও নজর কাড়ে “ধন্যবাদের সহিত গৃহীত হইল”এ যেন রমরমা চাঁদাবাজির চমক দৃশ্য। অপরদিকে মইজ্জ্যারটেক মোড়ে মোঃ ইউসুফনামে ব্যক্তির কাটা রশিদে দেখা যায়, ল্যাইনমান ৫, এক্সিডেন্ট ফান্ড ৩, মৃত্যু ফান্ড ৩, কল্যাণ ফান্ড ৪ মোট ১৫টাকা।

এছাড়াও আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী চৌমুহনী মোড়ে টোকেন এ চাঁদা তুলেন আবু ছালেক ও রাশেদ নামে দুই ব্যক্তি। এরা যে টোকেন দেয় তাতে দেখা যায়, মাসের নাম ও সিরিয়াল লিখা প্রিন্ট করা কাগজ। পাশে কলমে লেখা একেক টোকেনে একেক মুঠোফোন নাম্বার ও ভাই ভাই শব্দলেখা।

জানতে চাইলে ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চট্টগ্রাম অটো রিকশা-অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়ন’ এর সভাপতি মোঃ হানিফ বলেন,‘আমাদের সংগঠনের নিয়মে রয়েছে রশিদ দিয়ে টাকা তোলার তাই ল্যানম্যানের খরচ ও সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব চালকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদেরজন্য ফান্ডে কিছু মাসিক চাঁদা নেওয়া হয়।’

কর্ণফুলী থানা অটো রিকশা অটো টেম্পো ও চার ষ্টোক শ্রমিক কল্যাণ বহূমুখী সমবায় মালিক সমিতি লিঃ এর সভাপতি মোঃ আবু বলেন,‘ট্রাফিক পুলিশের সাথে আমাদের একটা কথা হয়েছে। কিছু টাকা তুলে বিপদে ড্রাইভারদের সাহায্য করি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশ বক্সের (ট্রাফিক ইনচার্জ) টিআই মোঃ মোস্তফামামুন সবৈর্ব অস্বীকার করে বলেন, ‘নতুন উপজেলা গরিব অসহায়কিছু লোক তিন চাকার গাড়ি চালাচ্ছে গ্রামের সড়কে। স্থানীয় নেতারা সুপারিশ করেছে বলে আমরা তাদের ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত এখনো নিতে পারিনি। তবে টোকেন দিয়ে ট্রাফিক পুলিশ কোন বানিজ্য করে না।’

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান,‘টোকেন বানিজ্য বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও যাত্রী হতে জেনেছি। দ্রুত তা বন্ধে র্কাযকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’