বিমান ছিনতাইয়ের নাটকীয় ঘটনার বর্ণনা করলেন বিমানযাত্রী

কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর হয়ে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের ‘ময়ূরপঙ্খী’ উড়োজাহাজটি ছিনতাই চেষ্টার বর্ণনা দিলেন ওই বিমানের এক যাত্রী কাজী মশিউর রহমান। এদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক এই মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই নাটকীয় ঘটনার বর্ণনা করেন। নিম্নে তার স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হল-

কাজী মশিউর রহমান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘কর্মজীবনের ইস্তফা দিয়ে আমি ও লিলি অবসর নেয়ার পরপরই ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে আমরা বিজি ১৪৭ চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী বিমানে আরোহণ করি। লিলি এবং আমি বিমানের জানালার পাশে দুই নাম্বার সারিতে বসলাম। এটি বিমানের বাম পাশের সামনের সারির পরের সারি। ৫০ মিনিটের এই ফ্লাইটের প্রথম ১৫ থেকে ২০ মিনিট বা ওইরকম সময় তেমন উল্লেখ করার মতো ছিল না।’

‘হঠাৎ আকস্মিকভাবে ইকোনমি ক্লাস থেকে একজন তরুণ উঠে এসে বিজনেস ক্লাসে প্রবেশ করলেন। তিনি আমার সামনের ফাঁকা আসনে বসে গেলেন। তার সঙ্গে ছিল একটি ব্যাকপ্যাক। এতে কেবিন ক্রু অবাক হলেন। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিবাদ জানানোর আগেই তিনি তার ব্যাকপ্যাক খুলে ফেললেন। তার ভেতর হাত দিয়ে বের করলেন একটি অস্ত্র, একটি লাইটার ও বিস্ফোরকের মতো দেখতে একটি ডিভাইস। এক পর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে বন্ধ ককপিটের খুব কাছে সামনের সারির গ্যালারিতে চলে গেলেন। এবং ইংরেজিতে বললেন- ‘এই বিমানটি ছিনতাই করা হয়েছে! অবিলম্বে ককপিটের দরজা খুলুন। যদি বিমানটি অবতরণ করে তাহলে আমি এটা উড়িয়ে দেব।’

‘এ শব্দগুল কেবিনের সামনে সন্ত্রাসের আবহ ছড়িয়ে দিল। তখনও পর্দা নামান (পরে তা খুলে দেয়া হয়)। ফলে পিছনের দিকে যারা বসা ছিলেন তারা বুঝতে পারেননি সামনে কি ঘটছে। তখন আমরা সরাসরি দেখতে পাচ্ছি, ছিনতাইকারী সশস্ত্র অবস্থায়। যে নিজেকে প্রমাণ করতে সামনের একটি ফাঁকা শৌচাগারের দরজায় একবার তার হ্যান্ডগান দিয়ে গুলি করল। কেবিনের বাতাসে বারুদের গন্ধ। যুবকটি চিৎকার করে বলতে লাগলো- ‘আমি একজন স্কটিশ নাগরিক। আমার মাত্র একটিই দাবি। তাহল, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাই। সে একজন সেলিব্রেটি…।’

‘এবার বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করল। বিমান উদ্বেগজনক গতিতে ৩০ হাজার ফুট উপর থেকে মাটির দিকে যেন মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর মত নেমে আসতে লাগল। নিচে নামার এই পথে বিমানটি ভয়ঙ্করভাবে এপাশ ওপাশ দুলতে লাগল। এ সময় পাইলটের একটিই লক্ষ্য ছিল। তা হলো, ককপিট ভেঙে ফেলার আগেই তিনি বিমানটিকে চট্টগ্রামে অবতরণ করাতে চান।’

‘তিনি জানতেন, তার হাতে প্রায় ১৫০ জন মানুষের প্রাণ। আমি ওই উত্তেজিত যুবকের কাছে চিৎকার করে জানতে চাইলাম- ‘আমাদের সবাইকে হত্যা করে কি ভাল কাজ করবেন? আমাদেরকে অবতরণ করতে দিন, যাতে আমাদের ১৫০ জনের সবাই কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাতে পারি যেন, আপনি যা চান তা পূরণ করা হয়। তিনি ছিলেন নাছোড়বান্দা।’ বললেন, যদি বিমানটি অবতরণ করে তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি তা ঘটতে দেবেন না। তিনি বোমা দিয়ে বিমানটি উড়িয়ে দেবেন।’

‘তার এক হাতে বিস্ফোরকের ফিউজ ধরা। তার কাছে আরেক হাতে একটি লাইটার নিয়ে দুলাতে লাগলেন এবং আমাদেরকে হুমকি দিতে লাগলেন যে, আমাদের সবাইকে উড়িয়ে দেবেন। বলতে লাগলেন ‘আমি জানি বিমানটি যখন অবতরণ করবে তখন আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। অবশেষে বিমান রানওয়েতে অবতরণ করলো। আমরা যে গতিতে টারমাকে আছড়ে পড়েছি তাতে বিমানের ক্ষয়ক্ষতি বা রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি।’

‘কিন্তু পাইলট খুব দ্রুত আমাদের গতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হন। আমার নিজের অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। আমি ছিলাম ওই তরুণের কাছাকাছি, একেবারে সামনের সারিতে। যখন আমরা পেছনে পৌঁছাই, ততক্ষণে একটি ইমার্জেন্সি এক্সিট (জরুরিভাবে বের হওয়ার দরজা) খোলা হয়েছে। সেটির সামনে মানুষের জটলা। এর বিপরীত পাশে যে ইমার্জেন্সি এক্সিটটি রয়েছে সেটি তখনো খোলা হয়নি। তাই সেটি খোলার চেষ্টা করি। এর আগে বিমানের এক্সিট দরজা খোলার অভিজ্ঞতা ছিল না।’

‘কিভাবে আমি সেটা খুলেছি তাও বলতে পারবো না। তবে আমি দরজাটি খুলেছি এবং বিমানের পাখার ওপর বের হয়ে এসেছি। পাখা থেকে টারমাক কতটুকু নিচে তখন আমি বুঝে উঠতে পারিনি। অবশ্যই এটা ১২ ফুট বা এর আশেপাশে হবে। আর কোন বিকল্প না থাকায়, আমি টারমাকে লাফিয়ে পড়ি। অনুভব করছিলাম যে, আমি পড়ছিই। আমার পতনটা খুব মসৃণ হয়নি। পরে বুঝতে পারি যে, আমার গোড়ালি বাজেভাবে ছিলে গেছে এবং হাঁটু মুচড়ে গেছে।’

‘কিন্তু যখনই চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছি, আমি লিলিকে নামতে সাহায্য করার কথা ভেবেছি। আমি ওপরে তাকিয়ে তাকে পাখার কিনারায় বসে কান্না করতে দেখি। সে আমার এই কথায় সাড়া দেয়ার আগেই পেছন থেকে কেউ তাকে ঠেলে ফেলে দেয়। এয়ারপোর্টে ফিরে আসার পর মুক্ত হওয়ার তীব্র অনুভূতি আমাকে গ্রাস করল। এই সময়ে আমার মনে পড়ে যে, আমরা পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাসসহ সব মূল্যবান সামগ্রী বিমানে ফেলে এসেছি। সৃষ্টিকর্তার দয়ায় আমরা বেঁচে গেছি। আগের ৩০ মিনিটে অনেক ক্ষেত্রেই আমি নিজেকে বলেছি যে, এটাই, এভাবেই আমার জীবন শেষ হবে। কিন্তু কি এক কঠিন অবস্থা, মানুষ বলবে যে, তার অবসরের প্রথম দিনই ছিল তার জীবনের শেষ দিন।’