টিভি নাটকে ভাষার অশ্নীল সংলাপ ও অশ্নীল দৃশ্য!

নাটক হলো ফটোগ্রাফিক্যাল রিপ্রেজেনটেশন অব লাইফ। অর্থাৎ নাটক জীবনের প্রতিচ্ছবি। পুরোপুরি জীবন নয়। আমরা যখন ছবি তুলতে যাই, তখন নিশ্চয়ই একটু সুন্দর কাপড় পরে ছবি তুলি। তেমনি নাটকের ক্ষেত্রেও একই রকম। আমাদের চেষ্টা থাকবে, জীবনের বাস্তব বিষয়গুলোকে একটু মার্জিত ও রুচিশীলভাবে ফুটিয়ে তুলতে।

১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জাতি হিসেবে এই ভাষার গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। কারণ বাংলা ভাষা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাণ। আর শুদ্ধ বাংলাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের অন্যতম মাধ্যম টেলিভিশন। কারণ বর্তমানে টেলিভিশন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তাই তো টেলিভিশনকে বলা হয় জাতীয় জীবনের দর্পণস্বরূপ। এই দর্পণের মাধ্যমেই আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরছি।

প্রিয় তারকাশিল্পীরা টেলিভিশনের বিভিন্ন নাটক, টেলিছবিতে এই ভাষায় কথা বলছে। সুতরাং এটাই সঠিক এবং হালের ফ্যাশন। পাশাপাশি এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে নাটক দেখতে বসে ক্রমেই বিব্রত হন বাবা-মা। সন্তানের সঙ্গে টিভি সেটের সামনে বসতে ভয় পান। হঠাৎ করে সামনে চলে আসে নাটকের অশ্নীল সংলাপ ও অশ্নীল দৃশ্য, যাতে বিব্রত সবাই। পাশাপাশি আধুনিক ট্রেন্ডের নামে অভিনয়শিল্পীরা যেসব কুরুচিপূর্ণ পোশাক পরে থাকে, সত্যিই অবাক করার মতো!

টিভি নাটকে ভাষার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় হানিফ সংকেত বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থে লোক হাসানোর জন্য ভাষাকে বিকৃত করে, এমনকি আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে একরকম বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে হাসির নাটক না হয়ে সেগুলো হয়ে উঠছে হাস্যকর। নাটকে প্রমিত বাংলার ব্যবহার কমে যাওয়ার ফল খুব বেশি ভালো নয় জানিয়ে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ শুদ্ধভাবে ছবি তোলার প্রস্তাব করতে পারে না। অনেকেই বাংলা ভাষা ইংরেজির মতো করে বলে। শিক্ষিত এই নতুন প্রজন্ম ধরেই নিচ্ছে, এটা বোধ হয় স্টাইল।

টিভি নাটকে বাংলাভাষার অপব্যবহার নিয়ে জাহিদ হাসান বলেন, এ বিষয়ে আর কী বলব? বলে কি খুব বেশি উপকার হয়? কেউ কি সচেতন হয়? অভিনেতা ও নির্মাতা মাহফুজ আহমেদও নাটকে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলা ভাষার জন্য এত ত্যাগ পৃথিবীর অন্য কোনো জাতিকে করতে হয়নি। আমরাই একমাত্র জাতি- ত্যাগের বিনিময়ে, রক্তের বিনিময়ে ভাষা পেয়েছি। এ ভাষাকে এত সহজে বিকৃত করা কিংবা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সরকার যেন কঠোর হয়, প্রকৃত বাংলা ভাষা যেন কেউ বিকৃত করতে না পারে।

আবুল হায়াত বলেন, টিভি নাটকের ভাষার বিকৃতি আমি মোটেও ভালোভাবে দেখছি না। এ বিষয়টিতে আমি খুবই আহত। আমাদের বাংলা ভাষার একটা প্রমিত রূপ রয়েছে, যা সবারই রপ্ত করা দরকার। আঞ্চলিক ভাষায় আমরা নাটক করতেই পারি কিন্তু সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষাও সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও আঞ্চলিকতা টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। সে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ভাঁড়ামির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। ফলে নাটক হারাচ্ছে তার দর্শক। আবার নাটকে যদি আঞ্চলিক ভাষার আধিক্য বেশি হয়, সে ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নতুন প্রজন্মের ওপর।

সারা যাকের বলেন, আমাদের মনে রাখা উচিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা যে কোনো মাধ্যমে যা-ই করি না কেন, সেখানে শুদ্ধরূপে প্রমিত বাংলার ব্যবহার থাকা উচিত। আমরা যখন কোনো ভাষা উচ্চারণ করতে যাই, তখন সে ভাষার অভিধানে যেভাবে রয়েছে সেভাবেই তা করা উচিত। যেমন, যদি কেউ ঢাকার আদি ভাষায় কোনো কিছু রচনা করতে চান, তাহলে তা নিয়ে কিঞ্চিৎ গবেষণা করে লেখা উচিত। নাটক-সিনেমার সংলাপ লিখতে গেলেও বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। আমি মনে করি, নাটক-সিনেমায় যারা বাংলা ভাষাকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছেন, তারা ঠিক করছেন না। ভুল পথেই হাঁটছেন তারা।

আফসানা মিমি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম আর রক্ত ঝরিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার পেয়েছি আমরা। তাই নাটকে নিজের ভাষা বিকৃত করে উপস্থাপন করায় আমাদের ভাষার অনেক বড় ক্ষতি হচ্ছে বলেই আমি মনে করি। আমরা নাটকে শুদ্ধ বাংলায় সংলাপের ব্যবহার শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। যদি আঞ্চলিক কোনো নাটক হয় সেটা ভিন্ন কথা। বিনা কারণে টিভি নাটকে বাংলা ভাষার উচ্চারণে অশুদ্ধতা, অসংলগ্নতা একেবারেই সমর্থন করি না। আমি মনে করি, আমাদের খুব দ্রুত ভাষা বিকৃতির এ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা উচিত। তা না হলে এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সূত্রঃ সমকাল