মোদির সফরে বাংলাদেশের লাভ বেশি: ইকোনমিক টাইমস

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশ আসবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর এটিই হবে তার প্রথম বিদেশ সফর।

এই সফরের মাধ্যমে প্রতিবেশী দুই গণতান্ত্রিক দেশের অবকাঠামো এবং অন্যান্য কানেক্টিভিটি উদ্যোগ আরও জোরদার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কানেক্টিভিটি এবং সংশ্লিষ্ট খাতে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

ভৌগোলিক গুরুত্বঃ ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক বিনির্মাণে বাংলাদেশের অবস্থান একটি প্রজাপতির মতো। এই প্রজাপতির মূল দেহ হচ্ছে বাংলাদেশ, যার একপাশে রয়েছে রাশিয়া এবং মরিশাসের মতো বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চল এবং অন্য পাশে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া।

আরও পড়ুন… মোদিকে বাংলাদেশে ঢুকতে না দেয়ার ঘোষণা দিলেন তারা
এর ফলে ‘মুক্ত, অবাধ, সুরক্ষিত এবং সমৃদ্ধশালী’ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বৃহৎ অর্থনীতির প্রতিবেশী দেশ থেকেও সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ। যেহেতু বাংলাদেশ ২০২৬ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তাই দেশটির ভৌগোলিক অর্থনীতি এবং ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থান ইন্দো-প্যাসিফিক বিনির্মাণে সহায়তা করবে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক (কানেক্টিং টু থ্রাইভ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস অব ট্রান্সপোর্ট ইন্টিগ্রেশন ইন ইস্টার্ন সাউথ এশিয়া) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে অবাধ কানেক্টিভিটি স্থাপিত হলে তাতে দেশটির মোট জাতীয় আয়ের পরিমাণ ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের সব জেলাই লাভবান হবে। তবে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের সরকার এসব নিয়ে কাজ করছে; যা বেশ কয়েকটি অবকাঠামো কানেক্টিভিটি প্রকল্পের মাধ্যমে গতি পেয়েছে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হলো সম্প্রতি ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সেতু; যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং ত্রিপুরার সাবরুম জেলার মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছে।

সড়কপথে যোগাযোগ বৃদ্ধি ছাড়াও রেলপথ, বিমান, অভ্যন্তরীণ নৌপথ এবং উপকূলীয় পণ্য-পরিবহনের সব ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করছে। ছয়টি অচল রেলপথের মধ্যে ইতোমধ্যে পাঁচটি সচল করা হয়েছে এবং নতুন দুটিসহ ষষ্ঠ রেলসংযোগ পথটিও চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আসামের গুয়াহাটি এবং ঢাকার মধ্যে পুনরায় বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং পূর্বাঞ্চলীয় অনেক ছোট শহর ও নগরীর সঙ্গে আকাশপথে চট্টগ্রাম এবং সিলেটসহ বাংলাদেশের অনেক জেলা সংযুক্ত হবে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন এবং সম্প্রসারিত বন্দর ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় পণ্য পরিবহনের বিষয়ে একটি চুক্তি সই হয়েছে। এর ফলে মোংলা এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে।

বাণিজ্য ছাড়িয়েঃ বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দৃঢ়ভাবে বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ এবং জ্ঞানের আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে ভারতের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়া উচিত নরেন্দ্র মোদির সরকারের।

এর ফলে দ্বিপাক্ষিক মান উন্নয়ন জোরদারের পাশাপাশি এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অ-কৃষি অর্থনীতি, বিশেষ করে হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্যের মতো খাতগুলোতে আরও বেশি অর্ধদক্ষ কর্মী সৃষ্টি করবে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক জ্ঞানের আদানপ্রদান গুরুত্বপূর্ণ এক স্তম্ভ; যেখানে বিশেষ মনোযোগ দেয়া দরকার।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুনির্ভর আধুনিক কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতগুলোতে সঙ্কট এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে ভারত।

মোদির পরীক্ষাঃ নরেন্দ্র মোদির ‌‘আত্মনির্ভর ভারত’ ভাবনার অন্যতম একটি পরীক্ষা হচ্ছে বাংলাদেশ। যদিও আত্মনির্ভরশীলতার পথে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে ভারত। তারপরও ‘জিরো ডিফেক্ট, জিরো ইফেক্ট’ নীতি নিয়ে বিশ্বের কাছে সেবা এবং পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে দেশটির। ভারতের এই উদ্যোগ থেকে যথাযথভাবে সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ এমন এক প্রতিবেশী যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দর্শন ‘সবার সাথে, সবার বিকাশ, সবার বিশ্বাস’ এই মতবাদ পরীক্ষা করার ক্ষেত্র। এর কারণ হলো এটা উদ্ভব হয়েছে ভারতের বহু প্রাচীন দর্শন থেকে; যা বর্তমানে মানবকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের অন্যতম একটি ধাপ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর শুভক্ষণে সোনার বাংলা গড়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও গতি পাক। যদিও আমরা রাজনৈতিক সীমানায় আমাদের দেশ আলাদা, তারপরও আসুন বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জ্ঞানের সহযোগিতায় আমরা নতুন ধরনের কনফেডারেশন সন্ধান করি।

ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ইকোনমিক টাইমসে বৈশ্বিক থিঙ্ক ও অ্যাকশন-ট্যাঙ্ক কাটস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক বিপুল চ্যাটার্জির লেখা নিবন্ধ।