প্রিয় নবী (সা.) এর আদর্শ অনুসরণেই রয়েছে ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি

সমস্যা হোক পাহাড়সম, জটিলতা হোক সমুদ্রসম তবুও নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত ধর্মে তার সঠিক সমাধান ও সঠিক উত্তর নিহিত রয়েছে। প্রিয় নবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণেই রয়েছে ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি। তার জীবনের আলোয় জীবনকে আলোকিত করার মধ্যেই রয়েছে সফলতা।

নবী করিম (সা.)-এর প্রদর্শিত মত ও পথকে মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি হিসেবে জীবনের সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করার মধ্যেই রয়েছে কল্যাণ। রাসূলের সামগ্রিক জীবনের মধ্য থেকে আজকে আলোচনা করব উম্মতের প্রতি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা সম্পর্কে।

উম্মতের প্রতি ছিল নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অতুলনীয় ভালোবাসা। উম্মতের প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসার কথা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল এসেছেন, যিনি তোমাদের বিপন্নে কষ্ট পান, তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ -সূরা তওবা: ১২৮

এভাবে উম্মতের প্রতি নবী করিম (সা.)-এর অতুলনীয় ভালোবাসার কথা আল্লাহতায়ালা কোরআনের বহু জায়গায় বর্ণনা করেছেন। নবী করিম (সা.)ও দোয়ার সময় সর্বদা উম্মতের কথা স্মরণ করতেন। সবার জন্য তার মন থাকত ব্যাকুল। তাই প্রতিদিন প্রত্যেক নামাজের পর উম্মতের গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তিনি। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসূল (সা.)-এর অন্তর প্রসন্ন দেখলে আমি বলতাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার জন্য দোয়া করুন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আপনি আয়েশার আগে ও পরের, গোপন ও প্রকাশ্যে করা গোনাহ ক্ষমা করুন। রাসূল (সা.)-এর দোয়া শুনে হজরত আয়েশা (রা.) হেসে নিজের কোলে মাথা নিচু করে ফেলতেন। তার হাসিমাখা মুখ দেখে রাসূল (সা.) বলতেন, আমার দোয়াতে কি তুমি আনন্দিত হয়েছ? হজরত আয়েশা (রা.) বলতেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কেমন কথা, আপনার দোয়ায় আমি আনন্দিত হবো না? তখন রাসূল (সা.) বলতেন, আল্লাহর শপথ, এভাবেই আমি প্রত্যেক নামাজের পর আর উম্মতের জন্য আমি দোয়া করি।’ -ইবনে হিব্বান: ৭১১১

আমরা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। তিনি উম্মতের সব বিষয়ে খেয়াল রাখতেন। উম্মতের ক্ষতিকর বিষয়সমূহ হলো, তাদের বিপদগামিতা, ত্রুটিমুক্ত আমল, পার্থিব জীবনে সুখময়ভাবে জীবন পরিচালনা করা, পরকালীন যাবতীয় ক্ষতিকর ও অনিষ্টকর বিষয় থেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন সারা জীবনভর।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করছেন। কোন কাজ করলে নেক আমল হয় এবং কোনটি করলে নাফরমানি হয়, সে সম্পর্কে তার উম্মতদের শিক্ষা দিয়েছেন। উম্মতের ইহকালীন ও পরকালীন সব সমস্যা এবং সব ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন সবসময়। এ জাতীয় চিন্তায় নবী মুহাম্মদ (সা.) বেশি চিন্তিত থাকতেন। নিজেকে তিনি বিলীন করে দিয়েছিলেন উম্মতের সার্বিক কল্যাণের জন্য।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওই সব লোক ঈমান আনছে না, এ কারণে কি তাদের চিন্তায় ও পেরেশানিতে আপনি নিজেকে শেষ করে দেবেন।’ -সূরা শুরা: ৩

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) গোনাহগার উম্মতের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল ছিলেন। অনাগত উম্মতের প্রতি হজরত রাসূল (সা.)-এর তীব্র ভালোবাসা ছিল। কেননা তারা না দেখে রাসূলের জন্য সাক্ষ্য দেবে। তাই তাদের দেখার বাসনা ছিল তার। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমার ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছা করছে। সাহাবিরা বললেন, আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসূল (সা.) বললেন, তোমরা তো আমার সাহাবি তথা সঙ্গি। আমার ভাই হলো, যারা আমার ওপর ঈমান আনবে, কিন্তু আমাকে দেখবে না।’ -মুসনাদে আহমাদ: ১২৭১৮

উম্মতের সবার পক্ষ থেকে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোরবানি ছিল ভালোবাসার চূড়ান্ত নমুনা। তিনি মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে নিজেই কোরবানি করতেন। হজরত আবু রাফে (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানির সময় দু’টি মোটাতাজা শিং বিশিষ্ট দুম্বা ক্রয় করতেন। নামাজ আদায় করে খুতবা প্রদান করতেন। অতঃপর তিনি নামাজের স্থানে দাঁড়ানো থাকতেই একটি দুম্বা নিয়ে আসা হতো। তা নিজ হাতে ছুরি দিয়ে জবাই করে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এটা আমার পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে, যারা আপনার তাওহিদের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং আমার রিসালাত পৌঁছে দেওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে।’ -মুসনাদে আহমাদ: ২৭৭৮২

নবী মুহাম্মদ (সা.) সবসময় উম্মতের জন্য পেরেশান ছিলেন। বদরের যুদ্ধে ৩১৩ জন সাহাবি যখন যুদ্ধ করতে গেল, তখন প্রিয় নবী (সা.) প্রভুর দরবারে তার সাহাবিদের জন্য দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! এই সাহাবিরা আমার অনেক আদরের, এই সাহাবিদের তুমি মেরো না, এদের তুমি রক্ষা করো। উহুদের যুদ্ধে হজরত রাসূল (সা.)-এর দাঁত ভেঙেছে, মাথা ফেঁটেছে, খন্দকের যুদ্ধে মাটি বহন করতে করতে শরীরে দাগ বসে গেছে; তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গেলে তায়েফের দুষ্ট ছেলেরা রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে ঠাট্টা করেছে, গালমন্দ করেছে, তারা রাহমাতুলিল আলামিনের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ করেছে। তবুও তিনি এসব হাসিমুখে সহ্য করেছেন উম্মাহের সার্বিক মুক্তির জন্য।

মুমিনদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। মানবজাতি কোনো দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে এবং আজাব-গজবে পড়বে- এটা সহ্য করতে পারতেন না। এ কথার প্রমাণ স্বয়ং কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল, তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে সহ্য করা দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। -সূরা তওবা: ১২৮

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, নবী করিম (সা.) মুমিনদের ব্যাপারে এতটুকু স্নেহ-মমতা রাখেন, যতটুকু মুমিনগণ স্বীয় নফস সম্পর্কে স্নেহ-মমতা রাখে না। অর্থাৎ আমরা নিজেকে যতটুকু ভালোবাসি, নবী করিম (সা.) তার চেয়ে বেশি আমাদেরকে ভালোবাসেন। -সূরা আহযাব: ৬

উম্মতের প্রতি নবী করিম (সা.)-এর অপরিসীম ভালোবাসার প্রমাণ তার প্রতিটি কাজ ও কর্ম থেকে প্রকাশ পেয়েছে। এ বিষয়ে প্রচুর হাদিস রয়েছে, অনেক হাদিসে এ বিষয়ের আলোচনা স্থান পেয়েছে।

এসব হাদিস থেকে বুঝা যায়, উম্মতের প্রতি রাসূলের ভালোবাসার প্রমাণ। আল্লাহতায়ালা আমাদের অন্তরেও হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা অধিক থেকে অধিকতর করে দিন। আমাদের জীবনকে সুন্নতের আলোয় উদ্ভাসিত করে দিন।