আবুল হোসেন, সিলেট প্রতিনিধিঃ এবার দ্বিতীয় লোভাছড়ায় পরিণত হয়েছে সিলেট নগরীর শাহজালাল ব্রিজ সংলগ্ন কদমতলী ফেরিঘাট এলাকা। সেখানে সুরমা নদীর চড়ে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে পাথরের বড় বড় স্তুপ আর ক্রাশার মেশিন দিয়ে পরিবেশের বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ। তার পাশেই রয়েছে ডিআইজি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় অফিস।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নাকের ডগায় ও তাদের কর্তাব্যক্তিদেরকে ম্যানেজ করে ১২/১৫টি ক্রাশার মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙ্গার উৎসব চলছে। এলাকার মানুষ ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। পরিবেশ অধিদপ্তরের উচ্ছেদ অভিযানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সিলেট বিভাগীয় জুনিয়র কেমিস্ট মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ক্রাশার মেশিন নিয়ে রহস্যজনক কারণে কোন প্রকার বক্তব্য দিতে নারাজ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৬নং ওয়ার্ডের কদমতলী ফেরিঘাট এলাকায় সুরমা নদীর চড়ে প্রায় একমাস ধরে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে পাথররাজ্য। যদিও সে এলাকাটি কোম্পানীগঞ্জের শারপিন টিলা বা লোভাছড়া পাথর কোয়ারী নয়, তারপরও এখন সে এলাকাটি এখন দ্বিতীয় লোভাছড়ায় পরিণত হয়েছে।

সেখানে কারো নেই কোন তোয়াক্কা, নেই কোন ভয়, নেই কোন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আনাগুনা, নেই কোন বাঁধা, মনে হয় তারা যেন সকল কিছু থেকে নিরাপদ ও অন্য এক স্থানে ক্রাশার মেশিন দিয়ে নির্বিদ্ধায় চালিয়ে যাচ্ছেন ধ্বংস যজ্ঞ। কারণ ফেরিঘাট থেকে বিশাল জায়গা নিয়ে একেবারে ডিআইজি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পিছন পর্যন্ত রয়েছে ক্রাশার মেশিনের দীর্ঘ লাইন আর পাথরের স্তুপ। সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে এক শ্রেণীর কিছু অসাধু সাংবাদিক ওই ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে বড় অংকের টাকা আদায় করছেন। এমনকি অন্যান্য পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ না করার আশ্বাস দিয়ে সকল পত্রিকার নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এই গুণধর চাঁদাবাজ সাংবাদিকদের নাম অবশ্যই প্রকাশ করা হবে। ওই সাংবাদিকরা না কি অবৈধ ভাবে পাথর ব্যবসা পরিচালনা করার জন্যে ইজারা দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ফেরিঘাট থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলছে ক্রাশার মিল। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে লোভছড়া থেকে রাতে গোপনে আসা পাথরগুলো ক্রাশার মেশিন দিয়ে ভাঙ্গা হয়। আর সেখান থেকে বিক্রি করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। সকল ট্রাক ও পাথর ক্রয়কারী প্রতিষ্টান এখন সেই পরিবেশ অধিদপ্তরের পিছনে আর কদমতলী ফেরিঘাটে।

প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার পাথর কেনাবেচা হয় সেখানে। পাথর স্পটে গেলে মনে হয় এটি যেন নতুন কেন কোম্পানীগঞ্জ বা লোভাছড়া কিংবা স্থান। সেই ক্ষমতাধর ও মুল্যবান স্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় নজরুল ইসলাম, কবির মিয়া, লিটন, নাসির, কামরুল’সহতাদের সন্তান ও স্বজনরা। আর তাদের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন আরো অর্ধশত নিরাপত্তা রক্ষীলোক। অভিযোগ রয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতা সেখানে তাদেরকে সেল্টার দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

নদীরপাড় ও রাস্তা ভেঙ্গে সাজিয়ে রাখা ক্রাশার মিলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শ্রমিক এসে কাজে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় হাজারো শ্রমিক সেখানে পাথর ভাঙ্গা, পাথরের স্তুপ নির্মাণ, গাড়িতে লোড-আনলোড, বালু উত্তোলন’সহ নানা কাজে রয়েছেন। ফলে সেখানে এখন শুধু টাকা উড়ছে। তাই তাতে বিক্রি হচ্ছে মাদক, ইয়াবা ও মদ। সেবন করা হয় পাশে গড়ে উঠা বিভিন্ন কলোনী অস্থায়ী রুমে। সেখানে অভিযোগ উঠেছে কদমতলী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফয়েজ এর উপর। তবে সিলেট বিভাগীয় জুনিয়র কেমিস্ট মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন প্রতিদিন তার পাওনা হিসাব রাতেই বুঝে নিচ্ছেন।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন এলাকাবাসীর অভিযোগ করেন, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ফেরিঘাট থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস পর্যন্ত চলে ক্রাশার মেশিন। এলাকার ছাত্রছাত্রীরা শব্দে পড়ালেখায় বিগ্ন ও বেড়েছে অসুস্থ মানুষদের কষ্ঠ এবং ধুলা-বালির কারনে সেখানকার মানুষের মধ্যে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করছেন না। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, ডিআইজি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের পিছনে সুরমা নদীর তীর ও রাস্তা ভেঙ্গে, কিভাবে পরিবেশ বিধ্বংসী ক্রাশার মিল দিয়ে অবৈধ ভাবে কোটি কোটি টাকার পাথর ভাঙ্গা ও বিক্রি হচ্ছে? এটা কার ইন্ধনে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

অপর দিকে ক্রাশার মেশিন নিয়ে স্থানীয় সমাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে অনেকেই বলেছেন, যদিও তা অবৈধ, তবে সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে।

কদমতলী ফেরিঘাটে দীর্ঘ সাত মাস পর আবারো চালু হয়েছে সেই ক্রাশার মেশিন ও পাথররাজ্য। ২০১৯ সালে নভেম্বর মাসে টাকা ভাগভাটোয়ারা নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে দ্বন্ধ হওয়ায় দীর্ঘদিন পর তাদেরকে উচ্ছেদ করে পরিবশ। সে সময় কুচাই এলাকায়ও থাকা ক্রাশার মিলগুলোও উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু প্রায় সাত মানের মাথায় আবারো তারা স্ব স্থানে ফিরে এসেছে ক্রাশার মেশিন।

ক্রাশার মিল মালিক ও সেখানকার শীর্ষ নেতৃত্বদাতা লিটন মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকল অনুমতি আছে। তাই অফিসে এসে দেখা করার জন্য।

সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তৌফিক বক্স লিপন বলেন, ফেরিঘাট রাস্তা দিয়ে যে পরিমাণ পাথর বুঝাই ওভারলোডের গাড়ি চলাচল করছে, তাতে রাস্তা ভেঙ্গে যাবে। বিষয়টি আমি সিটি করপোরেশনকে অবগত করেছি। তিনি বলেন, নদীর তীরে বেশ কিছু ক্রাশার মেমিন বসিয়ে পে-লোডার দিয়ে নৌকা থেকে ট্রাক লোড করা পারশ্ববর্তী বাড়িগুলো হুমকির মধ্যে পড়েছে। বেশ কিছু দিন বন্ধ থাকলেও আবার চালু হয়েছে। তবে কিভাবে চালু হয়েছে আমার জানা নেই।

ইতিমধ্যে বিভাগীয় কমিশনারকে আমি উক্ত বিষয়ে অবগত করেছি। তিনি তাৎক্ষনিক পরিবেশ অধিদফর ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেন। কিন্তু আজো কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা আমার জানা নেই। তবে যারা পরিবেশ ধ্বংস করছেন, তা সমাজের জন্য ঘিন্ন কাজ। তাই সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

এ ব্যাপারে অবৈধ ক্রাশার মিলগুলো উচ্ছেদের দায়িত্বে থাকা ও সিলেট বিভাগীয় জুনিয়র কেমিস্ট মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন সাক্ষাৎ না দিয়ে মোবাইলেও কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি তার ব্যস্থতা ও কথা সময় নেই বলে জানান। এক পর্যায়ে এক মিনিটের জন্য তিনি বলতে গিয়ে প্রথমে জানেন না বলে অস্বীকার করেন। পরে প্রতিবেদক তাকে জেলা প্রশাসনের নির্দেশের কপির কথা বললে তিনি বলেন, হে অতীতেও আমি অভিযান করেছি। কয়েকটা দিন সময় দেন। আমি অভিযান করবো। প্রতিদিন টাকা আদায়ের অভিযোগটি অস্বিকার করেন।