জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের (এমপি) ‘ঋণখেলাপি’ বলা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, আইনিভাবে বর্তমান সংসদের কোনো এমপি ‘ঋণখেলাপি’ নন, তারা বড়জোর ‘ঋণগ্রস্ত’ হতে পারেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দাবির কড়া জবাব দিয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে ঋণ পুনঃতফসিল (রিশিডিউলিং) করা হয় এবং উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে নির্বাচন করা হয়, তা সবারই জানা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক হয়। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
‘ব্যাংকগুলো সরকারকে কীভাবে ঋণ দেবে?’
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ব্যাংকিং খাতের বেহাল দশা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ যদি একপাশে সরিয়েও রাখি, ব্যাংক সরকারকে ঋণ দেবে কোথা থেকে? এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে, দেশে মোট মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে অবলোপন, পুনঃতফসিল করা এবং মামলার কারণে আটকে থাকা টাকা– যেটা এখনো খাতায় তোলা হয় নাই, তা যোগ করলে এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি টাকা; যা মোট ঋণের ৫৯.৭৩ শতাংশ। ব্যাংকগুলো চাইলেও সরকারকে বেশি সহায়তা দিতে পারবে না। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো ছাড়া উপায় থাকে না, যাকে আমরা ‘হাই পাওয়ারড মানি’ বলি। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে।’
এ সময় সংসদে ফ্লোর নিয়ে বর্তমান সংসদের মর্যাদা তুলে ধরে ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সবাই বলছেন যে এই সংসদ একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংসদ। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে, একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আমরা সম্মানিত হয়েছি, দেশবাসীও সম্মানিত হয়েছে। বিগত অনেক বছর ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদকে কলুষিত করা হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে এই সংসদের মর্যাদা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক উচ্চে বলে আমরা মনে করি।’
নিজের ভাবমূর্তি নিজেরা ক্ষুণ্ন না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বক্তব্য রাখার সময় হয়তো খেয়াল করি না, কিন্তু অবচেতন বা সচেতন মনে এমন কিছু কথা সংসদে উচ্চারণ করি, যা আমাদের নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, মর্যাদাকে খাট করে। আজকের বক্তব্য চলাকালীন বলা হয়েছে– ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে’।’ (এ সময় তিনি প্রথমে ভুলবশত অন্য এক সংসদ সদস্যের নাম নিলেও পরে উল্লেখ করা হয় যে কথাটি রুমিন ফারহানা বলেছিলেন)।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘কথাটি যেই বলুক, বাংলা ভাষায় একটি কথা আছে– ‘বেড়ায় যদি ক্ষেত খায়, সেই ক্ষেত টিকানো যায় না’। এই সংসদে নির্বাচিত হয়ে নিজেদের মর্যাদা নিজেরা হানি করার জন্য যদি আত্মঘাতী কথা বলি, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন ঋণখেলাপি কখনোই সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না। সেখানে এটিকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ কী করে বলা হয়?’
বক্তব্যের শেষে স্পিকারের রুলিং চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব, আপনি এই শব্দটি এখান থেকে এক্সপাঞ্জ করেন। আর ভবিষ্যতে বক্তব্য রাখার সময় নিজেদের মানসম্মান হানি হয়, অতি উৎসাহিত হয়ে এমন কথা যেন আমরা না বলি, সেই বিনীত অনুরোধ সবার প্রতি রাখছি।’
‘এটি ঋণখেলাপিদের সংসদ’
অধিবেশনে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম অধিবেশনেও অনেক সম্মানিত সংসদ সদস্যের কত ঋণখেলাপি রয়েছে, তার সংখ্যা উল্লেখ করেছিলাম, তবে সম্মানের কারণে নাম প্রকাশ করিনি। এখন যে দল ঋণখেলাপিদের নমিনেশন দিয়ে সংসদে নিয়ে আসে, এটা তাদের দায়। সংসদে এতগুলো ঋণখেলাপি থাকলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলবে।’
তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘সংসদকে আমরা সার্বভৌম বলি। এখন এই সংসদে যদি আমরা ঋণখেলাপিদের ‘ঋণখেলাপি’ বলতে না পারি, তাহলে কোথায় বলব? আমার অনুরোধ থাকবে, এ ধরনের শব্দ এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার মতো কোনো বক্তব্য নয়।’
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের বক্তব্যের জবাব দিতে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মহান জাতীয় সংসদের সব সদস্যকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের উচিত। এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি নন। নির্বাচনী আইন (আরপিও) এবং অন্যান্য বিধিমালা অনুসারে, আদালত কর্তৃক কেউ ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হলে তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হন। তার নমিনেশন অবৈধ হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘যাদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে, তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংকের বা প্রাইভেট মামলা ছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট থেকে সেগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার পরই তারা বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে ‘ঋণগ্রস্ত’ হতে পারেন, কিন্তু ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে তাদের ডিফেম (মানহানি) করা হচ্ছে। এটি মানহানিকর বক্তব্য, এটি এক্সপাঞ্জ হওয়া উচিত।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রুমিন ফারহানার পাল্টা জবাব
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে আইনি ফাঁকফোকরের বিষয়টি তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘টিআইবি সম্প্রতি বলেছে, এই সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।’
আইনজীবী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু একজন আইনজীবী, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে রিশিডিউলিং করা হয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সিআইবির (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম আসার পর কীভাবে রিট পিটিশন দাখিল করে তা স্টে (স্থগিত) করে ইলেকশন করা হয় এবং এরপর আবারও সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, সেটাও আমরা ভালো বুঝি।’

ডেস্ক রিপোর্ট 




















