ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের সহকারী প্রকৌশলী মো. শফিকুল হাসান জনস্বস্থ্যের প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। এর আগে তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদের মাধ্যমে ও নিজ বাড়ি গোপালগঞ্জের প্রভাব খাটিয়ে নিয়ম বর্হিভূত ও অবৈধভাবে একাধিক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ছিল। প্রকল্পগুলি হচ্ছে, (১) গোপালগঞ্জ জেলার পল্লী এলাকার নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প। (২) পার্বত্য চট্টগ্রামে সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প। ও (৩) শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।

অভিযোগ উঠেছে, যেকোনো প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হওয়ার জন্য নূন্যতম নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল হাসানকে ৩টি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক বানানো হয় ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। জানা গেছে, ৩ বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও বিদেশে থাকার অভিযোগে মো. শফিকুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান থাকা ও ৫ বছরের জন্য পদন্নোতিও স্থগিত থাকার পরেও তাকে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হয়। এছাড়াও আওয়ামী সরকারের আশির্বাদপুষ্ট হওয়ায় অধিদপ্তরে অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ৬৩ জন সদ্য পদন্নোতি পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে একজন সহকারী প্রকৌশলীকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক বানানো হয় তাকে।

মোঃ শফিকুল হাসান, সহকারী প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং প্রকল্প পরিচালক, গোপালগঞ্জ জেলার পানি সরবরাহ প্রকল্প ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প (জিওবি-এডিবি) মোঃ শফিকুল হাসান ১৯৯৭ সালে জিওবি-৪ প্রকল্পে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জে।

স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায়, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তিনি গোপালগঞ্জ জেলায় পানি সরবরাহ প্রকল্পে সহকারী প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আসলে তাঁর বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হয়। মোটা অঙ্কের অর্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময় অব্যাহতি পান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের নভেম্বরে, ১/৭/২০০৪ হতে কার্যকরী মর্মে অস্থায়ী রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হওয়ার পরই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব পান। ২০১০ সালে স্থায়ী রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হওয়ার এবং ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পিএসসির সুপারিশক্রমে তিনি নিয়মিত হন। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে তিনি মাঝারি শহর প্রকল্প (জিওবি এডিবি) এর উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন এবং সেখানেও সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং ব্যাপক পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করে আমেরিকায় বসবাসরত তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি এবং স্ত্রীর ভাই-বোনদের নিকট অবৈধ পথে গোপালগঞ্জের ঠিকাদার কামরুজ্জামান কামালের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনির ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার করেছেন।

পাচার ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে, তিনি আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুয়া ভর্তি দেখিয়ে তৎকালীন উপ-সচিব খায়রুল ইসলাম (মান্নান) এর সহযোগিতায় ছুটি অনুমোদন করান এবং দেশ ত্যাগ করেন। তাঁর ভর্তির বিষয়টি ভুয়া এবং তিনি দেশ থেকে পলায়ন করেছেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রকাশ পায়। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে ফিরে চাকরিতে যোগদান করেন এবং তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদ ও অতিরিক্ত-সচিব খায়রুল ইসলামকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে, এবং শেখ পরিবারের সদস্য গোপালগঞ্জের সাবেক এমপি শেখ সেলিমের এর অনিয়মতান্ত্রিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর যোগদান পত্র গ্রহণ করান। তাঁর দীর্ঘ তিন বছরের অবৈধ অনুপস্থিতির সময়কে নামমাত্র শাস্তির বিনিময়ে বৈধ করে নেওয়া হয়। এটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।

কিছুদিন পরেই, দণ্ডিত এই কর্মকর্তা ৯ম গ্রেডভুক্ত সহকারী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পঞ্চম গ্রেডের প্রকল্প পরিচালক সমমানের দুটি প্রকল্পের, ২৮০ কোটি টাকার গোপালগঞ্জ জেলার পানি সরবরাহ প্রকল্প এবং ১২০০ কোটি টাকার পার্বত্য চট্টগ্রামে সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প (জিওবি-এডিবি) একই সাথে প্রকল্প পরিচালক হন। এ কাজে তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং ‘র’ এর এজেন্ট জনাব খায়রুল ইসলাম তাঁর সহযোগিতা করেন। দুটি প্রকল্প থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে তিনি আমেরিকাতে পাচার করেছেন। এ সময় তিনি একাধিকবার ব্যক্তিগত কারণে আমেরিকা সহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ ভ্রমণ করেছেন।

বিষয়টি তাঁর পাসপোর্ট যাচাই করলে পাওয়া যাবে। তাঁর ক্ষমতার হাত এতই বড় যে, তিনি নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা কিন্তু তাঁর অধীনে পঞ্চম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা মোঃ আল আমিন উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি এখনও বহাল তবিয়তে আছেন এবং তাঁর এই দুটি প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ তাঁর মামা গোপালগঞ্জের কামরুজ্জামান কামাল এর মনির ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কস্নট্রাকশন অথবা তার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানকে উর্ধ্বদরে দেয়া হয়েছে এবং তার পরেও রিভাইজ করে বিল বেশি প্রদান করা হয়েছে। প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা হয়েও, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ক্যডারভুক্ত হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্যডারভুক্তি বাতিল করে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সেই সাথে তাঁকে দ্রুত ঢাকা থেকে বদলী করা দরকার। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার স্ত্রী এবং ২ সন্তানসহ তিনি আমেরিকার নাগরিক এবং দ্বৈত পাসপোর্টধারী। তিনি এখনও দেশে আছেন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তিনি দেশ ত্যাগে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর দেশ ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করে তাঁকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি।