এবার বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে আবারও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বুধবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার নথি ভারত পেয়েছে কিনা এবং এসব নথির ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয়। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং ভারত আগেও এ কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন জয়সওয়াল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী। জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই ভারতের লক্ষ্য। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছাড়েন। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে দেশে ফেরাতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত গত জুলাইয়ে জানিয়েছিল, সেই অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পরীক্ষা করছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দুই দেশের ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালে ওই চুক্তির একটি ধারা সংশোধন করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করার ব্যবস্থা করা হয়।
সংশোধনের পর প্রত্যর্পণের অনুরোধের ক্ষেত্রে অপরাধের বিস্তারিত প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা কমানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে চুক্তিতে প্রত্যর্পণ না করার কিছু সুযোগও রয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ, সন্ত্রাসবাদসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও বলা হয়েছে।
আবার ৮ নম্বর ধারায় অভিযোগ সৎ উদ্দেশ্যে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে করা হয়নি বলে মনে হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। হাসিনা ওই বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই মৃত্যুদণ্ডের পরও ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বরং নয়াদিল্লির বক্তব্য হলো, বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এদিকে গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারও জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে এবং তার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ভারত দিতে পারছে না। ফলে বুধবারের বক্তব্যে নতুন কোনো প্রত্যর্পণ সিদ্ধান্তের ঘোষণা না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর প্রশ্নে ঢাকা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে যতই চাপ দিক, নয়াদিল্লি আপাতত বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যেই রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তাও দিয়েছে ভারত।

ডেস্ক রিপোর্ট 




















