ঢাকা , বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর  প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় নি’হ’ত ফিরোজার পরিবারকে গাভী দিল উপজেলা প্রশাসন বিবাহ-তালাক নিবন্ধনের ডিজিটাইজেশন হচ্ছে, কমবে বাল্যবিয়ে ও বহুবিবাহ: আইনমন্ত্রী ফ্যাসিস্টের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু মূল্য দিয়েছি অনেক বেশি: জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসজল রাষ্ট্রপতি বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়ির সামনে বজ্রপাতে আগুন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দলীয় লোক দিয়ে দুদক গঠন করে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে: আসিফ মাহমুদ জিয়াউর রহমান ঘোষণা না দিলে দেশ স্বাধীন হতো কি না সন্দেহ আছে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী  চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর দুই সৈনিক নিহত, আহত ১ জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে আবারও রাজপথে নামতে হতে পারে: সারজিস

নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর 

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৫:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

২০৩০৩১ সালের মধ্যে নতুন ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে এই মহাপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ তার প্রশ্নে জুলাই ২০২৬এ একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি জানতে চান, ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক সংকটে শিল্পখাত যেন বড় ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেজন্য গ্যাস সরবরাহের বিকল্প উৎস, এলএনজি রিজার্ভ সক্ষমতা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার সরবরাহ এবং জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে কি না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটকালে শিল্পখাত যেন গ্যাস সংকটের সম্মুখীন না হয়, সেজন্য সরকার ২০৩০৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। একইসঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট ৪,৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ ও এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করার বিষয়ে তিনি জানান, দেশে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে বর্তমানে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক সংকট সামাল দিতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ডবেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তারেক রহমান জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোম ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ডবেইজড টার্মিনাল থেকে ২০৩০ নাগাদ রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।

ভোলা৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ভোলার গ্যাসকে দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণে ও জাতীয় স্বার্থে ব্যবহারের বিস্তারিত পরিকল্পনাও তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে বা মেইনল্যান্ডে নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছরের মতো সময় লেগে যাবে। তাই সরকার বিকল্প ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। ভোলায় যাতে বিপুল পরিমাণ শিল্পকারখানা স্থাপন করা যায়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। অনেক শিল্প উদ্যোক্তা সেখানে গ্যাসভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আন্তরিক চেষ্টা চালাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে এই গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পায়ন হলে একদিকে যেমন ভোলায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতির আকারও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তারেক রহমান বলেন, সেখানে একটি বড় সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এর পাশাপাশি একই স্থানে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভোলার গ্যাস সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদি এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভোলার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ, সাধারণ মানুষের চাহিদা, উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়েই সাজানো হচ্ছে এই সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান।

অন্য এক প্রশ্নে মেহেরপুর১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খান দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিকল্প উৎসের সমন্বিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। এসময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আগামী দিনের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের বিশাল চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানি খাতের রূপান্তর নিশ্চিত করতে সরকার এরই মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদেজাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রআনুষ্ঠানিকভাবে প্রণয়ন করেছে।

তিনি বলেন, কৌশলপত্র অনুযায়ী, সার্বিক সম্ভাবনা ও বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে একক প্রযুক্তি হিসেবে সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুতের ওপর। তারেক রহমান আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুসারে, দেশের বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং বিশালাকার ভূমিভিত্তিক সৌরপ্রকল্প থেকে আরও ৪,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংস্থান রাখা হয়েছে। বাকি ঘাটতি পূরণে বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও কৃষিভিত্তিক অ্যাগ্রিভোলটেইক্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা হবে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলতে সরকার আমদানিনীতি ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির জন্য অতীব জরুরি উপাদান যেমনসোলার প্যানেল, ইনভার্টার, বিশেষায়িত ব্যাটারি ও স্ট্রাকচার আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশের অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের গতি আরও ত্বরান্বিত করতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের সম্পৃক্ত করতে সম্প্রতি একটি বিশেষ মূল্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ সরকারি প্রণোদনা হিসেবে এই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম হিসাব করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা স্থির করা হয়েছে। এ সুবিধার আওতায় নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুসরণ করে যেসব সাধারণ বা বাণিজ্যিক গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তারা নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে টানা ৩ বছর, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত ইউনিট প্রতি নির্ধারিত এই ১০ টাকা ৫০ পয়সা হার সুবিধা পাবেন।

তিনি জানান, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকে সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামোয় আনতে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা কার্যকর করেছে। সরকারি মালিকানাধীন ভূমিতে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প তৈরির নির্দেশিকা ২০২৬, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিশেষ নীতিমালা ২০২৫, সার্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং হালনাগাদ নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সরকারপ্রধান আরও জানান, পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গ্রহণ করা হয়েছে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ২০২৫, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত সমন্বিত ব্যবসায়িক মডেল, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত পথনির্দেশিকা, যা দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর 

নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর 

আপডেট সময় ০৫:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০৩০৩১ সালের মধ্যে নতুন ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে এই মহাপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ তার প্রশ্নে জুলাই ২০২৬এ একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি জানতে চান, ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক সংকটে শিল্পখাত যেন বড় ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেজন্য গ্যাস সরবরাহের বিকল্প উৎস, এলএনজি রিজার্ভ সক্ষমতা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার সরবরাহ এবং জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে কি না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটকালে শিল্পখাত যেন গ্যাস সংকটের সম্মুখীন না হয়, সেজন্য সরকার ২০৩০৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। একইসঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট ৪,৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ ও এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করার বিষয়ে তিনি জানান, দেশে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে বর্তমানে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক সংকট সামাল দিতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ডবেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তারেক রহমান জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোম ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ডবেইজড টার্মিনাল থেকে ২০৩০ নাগাদ রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।

ভোলা৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ভোলার গ্যাসকে দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণে ও জাতীয় স্বার্থে ব্যবহারের বিস্তারিত পরিকল্পনাও তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে বা মেইনল্যান্ডে নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছরের মতো সময় লেগে যাবে। তাই সরকার বিকল্প ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। ভোলায় যাতে বিপুল পরিমাণ শিল্পকারখানা স্থাপন করা যায়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। অনেক শিল্প উদ্যোক্তা সেখানে গ্যাসভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আন্তরিক চেষ্টা চালাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে এই গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পায়ন হলে একদিকে যেমন ভোলায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতির আকারও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তারেক রহমান বলেন, সেখানে একটি বড় সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এর পাশাপাশি একই স্থানে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভোলার গ্যাস সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদি এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভোলার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ, সাধারণ মানুষের চাহিদা, উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়েই সাজানো হচ্ছে এই সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান।

অন্য এক প্রশ্নে মেহেরপুর১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খান দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিকল্প উৎসের সমন্বিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। এসময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আগামী দিনের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের বিশাল চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানি খাতের রূপান্তর নিশ্চিত করতে সরকার এরই মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদেজাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রআনুষ্ঠানিকভাবে প্রণয়ন করেছে।

তিনি বলেন, কৌশলপত্র অনুযায়ী, সার্বিক সম্ভাবনা ও বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে একক প্রযুক্তি হিসেবে সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুতের ওপর। তারেক রহমান আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুসারে, দেশের বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং বিশালাকার ভূমিভিত্তিক সৌরপ্রকল্প থেকে আরও ৪,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংস্থান রাখা হয়েছে। বাকি ঘাটতি পূরণে বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও কৃষিভিত্তিক অ্যাগ্রিভোলটেইক্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা হবে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলতে সরকার আমদানিনীতি ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির জন্য অতীব জরুরি উপাদান যেমনসোলার প্যানেল, ইনভার্টার, বিশেষায়িত ব্যাটারি ও স্ট্রাকচার আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশের অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের গতি আরও ত্বরান্বিত করতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের সম্পৃক্ত করতে সম্প্রতি একটি বিশেষ মূল্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ সরকারি প্রণোদনা হিসেবে এই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম হিসাব করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা স্থির করা হয়েছে। এ সুবিধার আওতায় নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুসরণ করে যেসব সাধারণ বা বাণিজ্যিক গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তারা নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে টানা ৩ বছর, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত ইউনিট প্রতি নির্ধারিত এই ১০ টাকা ৫০ পয়সা হার সুবিধা পাবেন।

তিনি জানান, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকে সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামোয় আনতে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা কার্যকর করেছে। সরকারি মালিকানাধীন ভূমিতে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প তৈরির নির্দেশিকা ২০২৬, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিশেষ নীতিমালা ২০২৫, সার্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং হালনাগাদ নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সরকারপ্রধান আরও জানান, পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গ্রহণ করা হয়েছে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ২০২৫, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত সমন্বিত ব্যবসায়িক মডেল, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত পথনির্দেশিকা, যা দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।