ঢাকা , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::

প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপর পুলিশি হামলা: দাবির ন্যায্যতায় নয়, দমনেই ব্যস্ত সরকার

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৭:২৪:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
  • ৩১১ বার পড়া হয়েছে

 

আবারও রাজধানীতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুখে পড়েছেন শিক্ষকরা। এবার ভুক্তভোগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। বেতন গ্রেড উন্নীতকরণসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর শনিবার বিকেলে শাহবাগে পুলিশ হামলা চালায়।

সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা। বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র দিকে পদযাত্রা শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন—বুলেট ছাড়া সব রকম অস্ত্র ব্যবহার করেছে পুলিশ। এতে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা আহত হন এবং অন্তত পাঁচজনকে শাহবাগ থানায় আটক করা হয়।

অন্যদিকে পুলিশের দাবি, শিক্ষকরা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যমুনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই তারা পদক্ষেপ নেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসের মধ্যে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক বছরে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা যখনই বেতন, পদোন্নতি বা ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকায় আসেন, তখনই পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। সম্প্রতি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারীরাও একইভাবে রাবার বুলেট, জলকামান, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জের শিকার হয়েছিলেন।

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলে ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন। তারা দশম গ্রেডে উন্নীতকরণ, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি ও চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের দাবি জানিয়ে আসছেন।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা আবুল কাশেম বলেন,

“দীর্ঘদিন ধরে আমরা দশম গ্রেডের দাবি জানাচ্ছি। সরকার ১১তম গ্রেডের আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়ন করেনি। তাই বাধ্য হয়েই আবার আন্দোলনে নেমেছি।”

মে মাসে টানা কর্মবিরতির পর সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করলেও এবার তারা রোববার (৯ নভেম্বর) থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। ফলে দেশের সাড়ে ৬৫ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী। আসন্ন বার্ষিক ও বৃত্তি পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উদ্বেগে আছেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন,

“সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি, একসঙ্গে সবাইকে ১৩ থেকে ১০ গ্রেডে উন্নীত করা বাস্তবসম্মত নয়। আমরা ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে কাজ করছি।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানান,

“সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই তা কার্যকর হবে।”

তবে শিক্ষক সমাজ বলছে, আশ্বাসে নয়—বাস্তবায়নেই তারা বিশ্বাসী। মে মাসে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর চার মাস পার হয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষকদের এই আন্দোলন কেবল বেতন কাঠামো নয়, সরকারের সামগ্রিক শিক্ষানীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে আগে শিক্ষকদের মানসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি কেরানির চেয়েও নিচের ১৩তম গ্রেডে প্রাথমিক শিক্ষকদের রাখা মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথে বড় বাধা। অথচ এ শিক্ষকরাই শিশুদের প্রথম গুরু।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন স্থবির। পাঠদান বন্ধ, উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। তাই এই ক্ষতির দায় শিক্ষকদের নয়—বরং সরকারেরই। দাবি মেনে, সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত সংকট সমাধান করাই এখন সময়ের দাবি।


 

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আমার এলাকায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে পুলিশ লাগবে না: ফজলুর রহমান

প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপর পুলিশি হামলা: দাবির ন্যায্যতায় নয়, দমনেই ব্যস্ত সরকার

আপডেট সময় ০৭:২৪:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

 

আবারও রাজধানীতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুখে পড়েছেন শিক্ষকরা। এবার ভুক্তভোগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। বেতন গ্রেড উন্নীতকরণসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর শনিবার বিকেলে শাহবাগে পুলিশ হামলা চালায়।

সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা। বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র দিকে পদযাত্রা শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন—বুলেট ছাড়া সব রকম অস্ত্র ব্যবহার করেছে পুলিশ। এতে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা আহত হন এবং অন্তত পাঁচজনকে শাহবাগ থানায় আটক করা হয়।

অন্যদিকে পুলিশের দাবি, শিক্ষকরা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যমুনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই তারা পদক্ষেপ নেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসের মধ্যে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক বছরে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা যখনই বেতন, পদোন্নতি বা ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকায় আসেন, তখনই পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। সম্প্রতি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারীরাও একইভাবে রাবার বুলেট, জলকামান, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জের শিকার হয়েছিলেন।

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলে ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন। তারা দশম গ্রেডে উন্নীতকরণ, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি ও চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের দাবি জানিয়ে আসছেন।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা আবুল কাশেম বলেন,

“দীর্ঘদিন ধরে আমরা দশম গ্রেডের দাবি জানাচ্ছি। সরকার ১১তম গ্রেডের আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়ন করেনি। তাই বাধ্য হয়েই আবার আন্দোলনে নেমেছি।”

মে মাসে টানা কর্মবিরতির পর সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করলেও এবার তারা রোববার (৯ নভেম্বর) থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। ফলে দেশের সাড়ে ৬৫ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী। আসন্ন বার্ষিক ও বৃত্তি পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উদ্বেগে আছেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন,

“সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি, একসঙ্গে সবাইকে ১৩ থেকে ১০ গ্রেডে উন্নীত করা বাস্তবসম্মত নয়। আমরা ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে কাজ করছি।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানান,

“সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই তা কার্যকর হবে।”

তবে শিক্ষক সমাজ বলছে, আশ্বাসে নয়—বাস্তবায়নেই তারা বিশ্বাসী। মে মাসে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর চার মাস পার হয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষকদের এই আন্দোলন কেবল বেতন কাঠামো নয়, সরকারের সামগ্রিক শিক্ষানীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে আগে শিক্ষকদের মানসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি কেরানির চেয়েও নিচের ১৩তম গ্রেডে প্রাথমিক শিক্ষকদের রাখা মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথে বড় বাধা। অথচ এ শিক্ষকরাই শিশুদের প্রথম গুরু।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন স্থবির। পাঠদান বন্ধ, উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। তাই এই ক্ষতির দায় শিক্ষকদের নয়—বরং সরকারেরই। দাবি মেনে, সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত সংকট সমাধান করাই এখন সময়ের দাবি।