এবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) পদ ছাড়ার এই ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে পুতুল বলেছেন, ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর তার আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রায় এক বছর ধরে বেতন না পাওয়ায় তার আর্থিক পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, জাতিসংঘের এই সংস্থা ও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের করা প্রতারণার অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ। রয়টার্স তার পদত্যাগপত্র দেখেছে। সায়মা ওয়াজেদের এই পদত্যাগের ঘটনা দেখাচ্ছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের পর তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রভাব শুধু রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পরিবারের সদস্যদেরও তা প্রভাবিত করেছে। হাসিনার অনেক মিত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। আবার হাসিনার মতো অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন।
২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা ওয়াজেদ। গত বছরের শেষ দিকে সংস্থাটি তাকে বেতন ছাড়া প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাকে প্রথম ছুটিতে পাঠানো হয়। তার কয়েক মাস আগে, ওই বছরের মার্চে শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচ্যুতিতে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করে।
রয়টার্সের দেখা গত ৩ জুলাই তারিখের সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীদের ডব্লিউএইচওকে দেয়া পৃথক একটি চিঠি অনুযায়ী, সংস্থাটি তার বিরুদ্ধে ‘চীন সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক প্রতারণা’ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগ এনেছে। সায়মা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ডব্লিউএইচও আরও অভিযোগ করেছে, তিনি বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে দখল করেছেন। সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসকে দেয়া পদত্যাগপত্রে সাইমা বলেন, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেয়ার আগেই তিনি ওই জমি কিনেছিলেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের অধীনে তিনি জমিটি পাওয়ার অধিকারী ছিলেন।
বুধবার রাতে টেড্রোসকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, ‘আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আমাকে আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত করা হয়েছিল। আমি আন্তরিকভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘আপনি যেহেতু আমাকে দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনে বাধা দিয়ে যাচ্ছেন, তাই ডব্লিউএইচওর নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আপনার ওপর আমার আর কোনো আস্থা বা বিশ্বাস নেই।’ সায়মা বলেন, বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর ধরে তিনি কোনো পারিশ্রমিক পাননি। এতে তার আর্থিক পরিস্থিতি ‘অসহনীয়’ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে সায়মা আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে ডব্লিউএইচও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি। গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, সাইমা ছুটিতে রয়েছেন। তবে গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে তার বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি তারা। দুটি সূত্র এর আগে জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতিসংঘের সংস্থাটি। তাদের একজন জানান, আগামী ১২ অক্টোবর নতুন আঞ্চলিক পরিচালকের পদে মনোনয়ন আহ্বান করা হবে। ডিসেম্বরে আবেদনগুলো যাচাই–বাছাই করা হবে এবং ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় সূত্র দুটি নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
রয়টার্স বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকরা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্যনীতি–সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে পড়েন। রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডব্লিউএইচওর নীতিমালা বাস্তবায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়। সদস্য দেশগুলোর ভোটে প্রতি পাঁচ বছর পরপর তারা নির্বাচিত হন। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতও রয়েছে।
জুলাইয়ে আইনজীবীদের মাধ্যমে দেয়া চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ চীন সফর নিয়ে কোনো ধরনের প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, নিয়মিত খরচ ফেরতের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বে থাকা একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে বিষয়টি ঘটেছে এবং এর সঙ্গে ৯০১ ডলার জড়িত ছিল। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তার কাজের জন্য তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন এবং এই যোগ্যতার বিষয়টি তিনি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোসের কাছে স্পষ্ট করেছিলেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















