এবার ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় কোনও ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায় না। ফলে ট্রাম্পের এই হুমকি কি আদৌ বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব কি না, উঠছে সেই প্রশ্নও। তবে ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে ইরান তা ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে গত জুনে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মেয়াদও রোববার শেষ হওয়ার কথা। মূলত সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। অন্যদিকে এর জবাবে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রও নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। এতে ইরানের অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
কে আগে পিছু হটে—এমন এক পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্পের সামরিক হুমকি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ইরানে হামলার হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে সরে এসেছেন তিনি। ট্রাম্প অবশ্য ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে ‘দাবা খেলার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। হরমুজ নিয়ে কী বলেছেন ট্রাম্প? নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে গত শুক্রবার দেয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করব’। নৌ অবরোধের কথা উল্লেখ করে তিনি এমন ইঙ্গিতও দেন যে হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যেই কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘মূলত এটাই তো হচ্ছে। আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমরা না চাইলে কোনও জাহাজই সেখান দিয়ে যেতে পারবে না।’ তবে ইরান দাবি করছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে। মার্কিন অবরোধের দাবি থাকলেও সামুদ্রিক চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, কিছু জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার কিম্বার্লি হালকেট বলেন, ট্রাম্প যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন তিনি হাসছিলেন। তার মতে, এতে বোঝা যায় ট্রাম্প নিজেও হয়তো বিষয়টিকে পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়ে বলছেন না। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির কর্তৃত্ব ইরান ও ওমানের। তবে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে ট্রাম্প এ ধরনের বক্তব্য দিতে পছন্দ করেন, আর এবার তার লক্ষ্য ইরান। তবে হালকেট বলেন, একটি বিষয় ট্রাম্পের অবস্থান থেকে পরিষ্কার। আর তা হলো—হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এখনও কার্যকর রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের প্রতিক্রিয়া কী- ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অপরাধী ও ‘বুদ্ধিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে দাবি করেন এবং হরমুজ প্রণালি শুধুই ইরানের বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও বলেন, ‘টুইট করে, বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে, কোনও আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা যায় না’। তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে। এই প্রণালি কখন বন্ধ বা খোলা হবে, তা শুধু ইরানের সিদ্ধান্তেই হবে।’
ইরান অবশ্য ওমানের সঙ্গেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করছে। প্রণালিটির অপর উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান ও মাসকাটের আলোচনা শিগগিরই শেষ হতে পারে। তবে প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তার মতে, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে গত জুনের সমঝোতা স্মারকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মানতে হবে। এর মধ্যে নৌ অবরোধ ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ও রয়েছে।
হরমুজ সংকট: ৭০০ বছর আগের ইবনে খালদুনের তত্ত্বই কি সত্যি হলো? অর্থাৎ, চলমান যুদ্ধে ইরানের নতুন অবস্থান হলো—হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এসব ছাড় দিতে হবে। অথচ যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে শুরুতে এসব বিষয়ই তেহরানের দাবি ছিল। ট্রাম্প কি সত্যিই হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বানাতে পারবেন? আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণায় কোনও ভূখণ্ডের মালিকানা বদলে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়ের সহকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প এককভাবে কোনও ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে পারেন না।
তার মতে, কোনও ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে সিনেটের অনুমোদিত চুক্তি বা কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন। লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই ও পানামা খাল যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত করা কিংবা স্প্যানিশ–আমেরিকান যুদ্ধের পর পুয়ের্তো রিকো ও ফিলিপাইন অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। ফেইন বলেন, ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি দখল বা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড করার চেষ্টা করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে, এমনকি জাতিসংঘ সনদের আওতাতেও তা ‘আগ্রাসী যুদ্ধের অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী ডিন নাটালি ক্লেইন বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের দাবির কোনও বাস্তব ভিত্তি তৈরি হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রণালিটির ওপর দখলদার শক্তি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে ইরান বা অন্তত দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ- ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রেও তেমন জনসমর্থন নেই। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও তার রিপাবলিকান দল কংগ্রেসে নিজেদের অল্প ব্যবধানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে ওয়াশিংটনের অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি গ্যালনের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি, যা মার্কিন নাগরিকদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো পেট্রোলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণ করা। আর ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটি এখন দ্বিতীয় অগ্রাধিকার। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক দেশগুলোকে ব্যবহার করে আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ তৈরি করা।
হরমুজ প্রণালি আসলে কার? আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানেরও অবাধ সার্বভৌমত্ব নেই। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, ইরান কেবল তার উপকূলের কাছাকাছি কিছু অংশের ওপর সার্বভৌম অধিকার রাখে। ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, উপকূলীয় দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌম অধিকার রাখে। তবে এই জলসীমা উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ২২ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই এই এলাকায় জাহাজ চলাচলের অধিকারও রয়েছে এবং তা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থিত এবং এর দুই পাশে ইরান ও ওমানের উপকূল। সবচেয়ে সরু অংশে প্রণালীটির প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার। ফলে দুই দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল করে আঞ্চলিক জলসীমা সেখানে একে অপরের ওপর এসে পড়ে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—কোনও দেশই ইউএনসিএলওএস অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালিসংক্রান্ত এই কনভেনশনের নিয়মগুলোকে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্প সাধারণত এ ধরনের বক্তব্য মূলত মার্কিন জনগণ, বিশেষ করে তার সমর্থকদের উদ্দেশে দিয়ে থাকেন। তার মতে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েলিটি টেলিভিশন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে উঠে আসা একজন ‘শোম্যান’। তাই তার কথাকে কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে, তবে সবসময় আক্ষরিক অর্থে নেয়া উচিত নয়। মাসগ্রেভ বলেন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বানানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে নেয়া যায় না। কারণ বাস্তবে ও আইনগতভাবে এটি অসম্ভব। তবে তার বক্তব্যে এটাও স্পষ্ট যে, কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরানের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে পিছু হটতে এখনও রাজি নন ট্রাম্প।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















