স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে তার বাস্তবায়নের সুপারিশ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটির দাবি, সনদে সুস্পষ্টভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (অমতসূচক মন্তব্য) উল্লেখ থাকলেও তা বাস্তবায়ন প্রস্তাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে বিএনপি “জনগণের সঙ্গে প্রতারণা” বলে অভিহিত করেছে।
বিএনপি বলছে, ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবনা আসলে আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি ও ইয়াহিয়া খানের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার অনুসরণে তৈরি করা হয়েছে। দলটির অভিযোগ, “কমিশন রেফারির ভূমিকায় থেকে নিজেই গোল দিয়ে দিয়েছে।”
গণভোটের সময়কাল নিয়েও আপত্তি তুলেছে বিএনপি। তাদের দাবি, দু-একটি দলকে সুবিধা দিতে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। দলটি বলছে, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে হতে হবে—এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি বলেছে, “সংস্কার সম্পন্ন করে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে।” নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসা পার্লামেন্টই দেশের সংকট সমাধান করবে; এর বাইরে গেলে “সরকারকেই দায় নিতে হবে।”
এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা শেষে অবস্থান জানানো হবে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, তারা শুধু সুপারিশ দিয়েছে, তা গ্রহণ করা বা না করা সরকারের এখতিয়ার।
বিতর্কের মূল কেন্দ্র ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়া:
জুলাই সনদে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি–সহ কয়েকটি দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, সংবিধানসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ২৬টির ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলোর অমত ছিল।
বিএনপির অমতের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
- উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতি
- প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ আলাদা রাখা
- চার সাংবিধানিক পদে (দুদক, পিএসসি, ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক) স্পিকারের মাধ্যমে নিয়োগ
- সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সমর্থন বাধ্যতামূলক করা
- প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে নিয়োগ
গণভোটের সময় নিয়েও বিভক্তি:
সরকার চাইলে নির্বাচনের আগে অথবা নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজন করতে পারবে বলে সুপারিশে উল্লেখ আছে। বিএনপি চাইছে ভোটের দিনেই গণভোট, আর জামায়াত ও এনসিপি চাইছে নির্বাচনের আগে, বিশেষ করে নভেম্বর মাসে।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “আমরা সরকারকে বলেছি, এগুলো জনগণের কাছে নিতে। জনগণের রায় পাওয়ার পর রাজনৈতিক দল সিদ্ধান্ত নেবে।”
বিএনপির তীব্র প্রতিক্রিয়া:
‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “কমিশন ঐকমত্যের বদলে অনৈক্য তৈরির চেষ্টা করেছে।”
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হবে—এটাই চূড়ান্ত অবস্থান।”
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উপেক্ষা করা হয়েছে—এটা ঐক্য নয়, এটা প্রতারণা। জনগণ ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “আপনি (প্রধান উপদেষ্টা) জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ। এখন যদি সংস্কারের নামে জনগণকে বিভক্ত করা হয়, তবে দায় সম্পূর্ণ আপনার ওপরই বর্তাবে।”
বিশ্লেষকদের মত:
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর এম মাহবুব উল্লাহ বলেন,
“সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর এই মুখোমুখি অবস্থান দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। অনৈক্যের পথ ধরে ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনর্বাসন হতে পারে। এখনই ঐক্যের পথে ফেরা জরুরি।”
উপসংহার:
লন্ডনে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যে বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা এখন বদলে গেছে। নির্বাচনের প্রস্তুতির শেষ সময়ে এসে সরকার ও বিএনপি আবারও মুখোমুখি অবস্থানে, যা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 

























