ঢাকা , সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
‘এমপি হয়েও ৭ দিন ধরে ডিআইজিকে পাচ্ছি না, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী’ মুসলিমপ্রধান দেশে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি, তথ্য আড়াল রাখতে দুজনকে হত্যা দক্ষিণ কোরিয়ায় আসিফ মাহমুদকে নাগরিক সংবর্ধনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতি মোছার নির্দেশ সিটি করপোরেশন দেয়নি: চসিক মেয়র ভারতে জনসংখ্যা বাড়াতে নগদ টাকা ও ছুটির ঘোষণা রাজ্য সরকারের এবার ভারতকে পরমাণু হামলার পাল্টা হুঁশিয়ারি দিলো পাকিস্তান লন্ডন থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেন রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রামে জুলাই গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে বিএনপি-এনসিপির মুখোমুখি অবস্থান মাথাবিহীন ৭ টুকরো খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের রহস্য উদঘাটন, বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য করোনার মতো আরেক মহামারির ঝুঁকিতে বিশ্ব

নিঃস্ব থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৯৫ বার পড়া হয়েছে

ছিলেন ছোট একটা পোশাক কারখানার মালিক। ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানাটি চালু করেন। আস্তে ধীরে রপ্তানি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু এতে তিনি সন্তুষ্ট হননি। তিনি চেয়েছিলেন দ্রুত ধনী হতে। নিজেই হিসাব করে বের করেন চটজলদি ধনী হওয়ার একটাই উপায়-সেটা হলো রাজনীতিতে নাম লেখানো। এমপি, মন্ত্রী হয়ে লুটপাট করা। শর্টকাটে ধনী হওয়ার জন্য তিনি রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেন। এই ব্যক্তির নাম শাহরিয়ার আলম। রাজশাহী-৬ আসন থেকে একাধিকবার এমপি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে তার রাজনীতিতে যোগদানের বিষয়টি আদর্শের কারণে হয়নি।

টাকা বানানোর জন্য তিনি রাজনীতিতে আসেন। মজার ব্যাপার হলো, শাহরিয়ার আলম প্রথম দেখা করেন রাজশাহী অঞ্চলের বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মিনু বুঝতে পারেন, এর মতলব মানুষের সেবা করা নয়, নিজের আখের গোছানো। তিনি শাহরিয়ারকে বোঝান, বলেন-সবাই কে কেন রাজনীতি করতে হবে। ব্যবসা করেও মানুষের কল্যাণ করা সম্ভব। শাহরিয়ারকে ব্যবসায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিদায় দেন। এরপর শাহরিয়ার যোগাযোগ করেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। টাকা দিয়ে কিনে নেন রাজশাহী-৬ আসনের মনোনয়ন। পেয়ে যান টাকা বানানোর মেশিন। নিঃস্ব থেকে হয়ে যান হাজার কোটি টাকার মালিক।

রাজশাহী-৬ আসন থেকে ২০০৮ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহরিয়ার আলম। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর। প্রথমবার নির্বাচনি হলফনামায় ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি ভূমিহীন। ছিল ২ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ, যার বিপরীতে ঋণ ছিল ৭৬ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৪২২ টাকা। এমন ‘ঋণগ্রস্ত’ একজন ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে হয়ে যান হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে বদলি, নিয়োগবাণিজ্যসহ নানান দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঢাকা ও নিজ এলাকায় হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন শাহরিয়ার আলম। রাশিয়া, ব্রাজিল ও চীনে অর্থ পাচার করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আটটি পোশাক কারখানার মালিকানা রয়েছে শাহরিয়ার আলমের। নিজেকে আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে নিয়েছেন মিডিয়ার মালিকানাও। রেনেসাঁ গ্রুপের নামে ‘দুরন্ত’ টেলিভিশনের মালিক সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। রাজশাহীতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঢাকার গুলশানে নিজের নামে দুটি, ছেলের নামে একটি এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নিয়েছেন ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট। সর্বশেষ ২০২৪ সালের হলফনামায় কৃষি ও অকৃষি জমি দেখিয়েছেন অন্তত ৫১ বিঘা। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্যানুযায়ী শাহরিয়ার আলমের স্থাবর কোনো সম্পদই ছিল না। নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শাহরিয়ার আলম দুর্নীতি-অনিয়মের পাশাপাশি অর্থ পাচার করে রাশিয়া, ব্রাজিল ও চীনে নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। ২০০৮ সালের হলফনামায় তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল সব মিলিয়ে ২ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিভিন্ন কোম্পানির নামে ঋণ ছিল ৭৬ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৪২২ টাকা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি অস্থাবর সম্পদ দেখান ৮৯ কোটি ২৪ লাখ ৯ হাজার ৯৭৩ টাকার। আর নিজের কোম্পানির নামে থাকা ৭৬ কোটি টাকার ঋণও পরিশোধ হয়েছে দেখান। অর্থাৎ এই সময়ে তিনি অন্তত ১৬৫ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার দুই ছেলের অস্থাবর সম্পদ ছিল মাত্র ৭৯ লাখ ১০ হাজার ৬৬২ টাকা। পাঁচ বছরে তাদের অস্থাবর সম্পদ বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি ৪৫ লাখ ১ হাজার ৪৮২ টাকা।

সম্পদের বিবরণের বিষয়ে আরও জানা যায়, প্রথমবার এমপি হওয়ার পর ২০১০ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চৌধুরীহাট এলাকায় ২৫ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার আলম। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন বাংলো বাড়ি, গরুর খামার, টিস্যু কালচার ল্যাব ও বনসাই গবেষণাগার। ওই জমি দেখিয়ে ২০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণও নিয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন নর্থ বেঙ্গল এগ্রো ফার্মস লিমিটেড। লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায়ও ২০১৭ সালে ১৩ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার আলম। সেখানেও গড়ে তোলা হয়েছে খামারবাড়ি। বিভিন্ন দামি সবজি ও মাছসহ নানান ধরনের ফসলের চাষাবাদ করা হচ্ছে সেখানে। মূলত শাহরিয়ার আলমের ছোটবেলা কেটেছে লালমনিরহাট জেলায়। সেই সুবাদে সেখানে জমি কিনে খামারবাড়ি গড়ে তুলেছেন। তার দীর্ঘদিনের এপিএস সিরাজের বাড়িও এই কালীগঞ্জ উপজেলায়।

শাহরিয়ার আলম তার নির্বাচনি আসন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) এলাকায় পোশাক কারখানা স্থাপনসহ নানান প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকার জমি। যার মধ্যে রয়েছে ৩৩ শতক জমি ও ভবনসহ সিনেমা হল এবং উপজেলা ভূমি অফিসের পূর্ব পাশের ৩৩ শতাংশ জমিসহ আরও অনেক জমি। প্রথম স্ত্রী আয়েশা আক্তার ডালিয়াকে তালাক দিয়ে নাটোরের লালপুরে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কন্যা সিলভিয়া পারভীন লেনিকে বিয়ে করেন শাহরিয়ার আলম। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় স্ত্রী লেনির মা রোকসানা মর্তুজা লিলিকে ২০২১ সালে নিজের প্রভাব খাটিয়ে মেয়র বানান তিনি। স্ত্রী লেনিকেও ঢাকার গুলশানে ৩ হাজার ৬০০ স্কয়ার ফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট উপহার দেন।

সূত্র বলছে, ২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর অর্থসম্পদ গড়ে তোলার নেশায় শাহরিয়ার আলম তার নির্বাচনি এলাকায় ব্যাপক লুটপাট ও চাঁদাবাজি করেন। তিনি তার এপিএস সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন টিআর-কাবিখাসহ সরকারি সব অনুদান ও প্রকল্প। এমনকি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগেও করেন ঘুষবাণিজ্য। চাকরি, বদলিসহ বিভিন্ন কাজে এপিএসের মাধ্যমে নেন মোটা অঙ্কের ঘুষ। ২০০৮ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সময় ১০ লাখ ৫ হাজার টাকা দামের হোন্ডা সিআরভি মডেলের গাড়িতে চড়তেন শাহরিয়ার আলম। সর্বশেষ তাকে ১ কোটি ১ লাখ ৩ হাজার ১০০ টাকা দামের লাক্সারি গাড়িতে চড়তে দেখা যায়। তার স্ত্রীর ব্যবহার করা গাড়িও ১ কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ টাকা দামের বলে জানা গেছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

‘এমপি হয়েও ৭ দিন ধরে ডিআইজিকে পাচ্ছি না, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী’

নিঃস্ব থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম

আপডেট সময় ১১:০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫

ছিলেন ছোট একটা পোশাক কারখানার মালিক। ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানাটি চালু করেন। আস্তে ধীরে রপ্তানি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু এতে তিনি সন্তুষ্ট হননি। তিনি চেয়েছিলেন দ্রুত ধনী হতে। নিজেই হিসাব করে বের করেন চটজলদি ধনী হওয়ার একটাই উপায়-সেটা হলো রাজনীতিতে নাম লেখানো। এমপি, মন্ত্রী হয়ে লুটপাট করা। শর্টকাটে ধনী হওয়ার জন্য তিনি রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেন। এই ব্যক্তির নাম শাহরিয়ার আলম। রাজশাহী-৬ আসন থেকে একাধিকবার এমপি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে তার রাজনীতিতে যোগদানের বিষয়টি আদর্শের কারণে হয়নি।

টাকা বানানোর জন্য তিনি রাজনীতিতে আসেন। মজার ব্যাপার হলো, শাহরিয়ার আলম প্রথম দেখা করেন রাজশাহী অঞ্চলের বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মিনু বুঝতে পারেন, এর মতলব মানুষের সেবা করা নয়, নিজের আখের গোছানো। তিনি শাহরিয়ারকে বোঝান, বলেন-সবাই কে কেন রাজনীতি করতে হবে। ব্যবসা করেও মানুষের কল্যাণ করা সম্ভব। শাহরিয়ারকে ব্যবসায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিদায় দেন। এরপর শাহরিয়ার যোগাযোগ করেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। টাকা দিয়ে কিনে নেন রাজশাহী-৬ আসনের মনোনয়ন। পেয়ে যান টাকা বানানোর মেশিন। নিঃস্ব থেকে হয়ে যান হাজার কোটি টাকার মালিক।

রাজশাহী-৬ আসন থেকে ২০০৮ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহরিয়ার আলম। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর। প্রথমবার নির্বাচনি হলফনামায় ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি ভূমিহীন। ছিল ২ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ, যার বিপরীতে ঋণ ছিল ৭৬ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৪২২ টাকা। এমন ‘ঋণগ্রস্ত’ একজন ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে হয়ে যান হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে বদলি, নিয়োগবাণিজ্যসহ নানান দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঢাকা ও নিজ এলাকায় হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন শাহরিয়ার আলম। রাশিয়া, ব্রাজিল ও চীনে অর্থ পাচার করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আটটি পোশাক কারখানার মালিকানা রয়েছে শাহরিয়ার আলমের। নিজেকে আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে নিয়েছেন মিডিয়ার মালিকানাও। রেনেসাঁ গ্রুপের নামে ‘দুরন্ত’ টেলিভিশনের মালিক সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। রাজশাহীতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঢাকার গুলশানে নিজের নামে দুটি, ছেলের নামে একটি এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নিয়েছেন ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট। সর্বশেষ ২০২৪ সালের হলফনামায় কৃষি ও অকৃষি জমি দেখিয়েছেন অন্তত ৫১ বিঘা। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্যানুযায়ী শাহরিয়ার আলমের স্থাবর কোনো সম্পদই ছিল না। নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শাহরিয়ার আলম দুর্নীতি-অনিয়মের পাশাপাশি অর্থ পাচার করে রাশিয়া, ব্রাজিল ও চীনে নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। ২০০৮ সালের হলফনামায় তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল সব মিলিয়ে ২ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিভিন্ন কোম্পানির নামে ঋণ ছিল ৭৬ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৪২২ টাকা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি অস্থাবর সম্পদ দেখান ৮৯ কোটি ২৪ লাখ ৯ হাজার ৯৭৩ টাকার। আর নিজের কোম্পানির নামে থাকা ৭৬ কোটি টাকার ঋণও পরিশোধ হয়েছে দেখান। অর্থাৎ এই সময়ে তিনি অন্তত ১৬৫ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার দুই ছেলের অস্থাবর সম্পদ ছিল মাত্র ৭৯ লাখ ১০ হাজার ৬৬২ টাকা। পাঁচ বছরে তাদের অস্থাবর সম্পদ বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি ৪৫ লাখ ১ হাজার ৪৮২ টাকা।

সম্পদের বিবরণের বিষয়ে আরও জানা যায়, প্রথমবার এমপি হওয়ার পর ২০১০ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চৌধুরীহাট এলাকায় ২৫ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার আলম। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন বাংলো বাড়ি, গরুর খামার, টিস্যু কালচার ল্যাব ও বনসাই গবেষণাগার। ওই জমি দেখিয়ে ২০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণও নিয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন নর্থ বেঙ্গল এগ্রো ফার্মস লিমিটেড। লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায়ও ২০১৭ সালে ১৩ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার আলম। সেখানেও গড়ে তোলা হয়েছে খামারবাড়ি। বিভিন্ন দামি সবজি ও মাছসহ নানান ধরনের ফসলের চাষাবাদ করা হচ্ছে সেখানে। মূলত শাহরিয়ার আলমের ছোটবেলা কেটেছে লালমনিরহাট জেলায়। সেই সুবাদে সেখানে জমি কিনে খামারবাড়ি গড়ে তুলেছেন। তার দীর্ঘদিনের এপিএস সিরাজের বাড়িও এই কালীগঞ্জ উপজেলায়।

শাহরিয়ার আলম তার নির্বাচনি আসন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) এলাকায় পোশাক কারখানা স্থাপনসহ নানান প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকার জমি। যার মধ্যে রয়েছে ৩৩ শতক জমি ও ভবনসহ সিনেমা হল এবং উপজেলা ভূমি অফিসের পূর্ব পাশের ৩৩ শতাংশ জমিসহ আরও অনেক জমি। প্রথম স্ত্রী আয়েশা আক্তার ডালিয়াকে তালাক দিয়ে নাটোরের লালপুরে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কন্যা সিলভিয়া পারভীন লেনিকে বিয়ে করেন শাহরিয়ার আলম। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় স্ত্রী লেনির মা রোকসানা মর্তুজা লিলিকে ২০২১ সালে নিজের প্রভাব খাটিয়ে মেয়র বানান তিনি। স্ত্রী লেনিকেও ঢাকার গুলশানে ৩ হাজার ৬০০ স্কয়ার ফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট উপহার দেন।

সূত্র বলছে, ২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর অর্থসম্পদ গড়ে তোলার নেশায় শাহরিয়ার আলম তার নির্বাচনি এলাকায় ব্যাপক লুটপাট ও চাঁদাবাজি করেন। তিনি তার এপিএস সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন টিআর-কাবিখাসহ সরকারি সব অনুদান ও প্রকল্প। এমনকি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগেও করেন ঘুষবাণিজ্য। চাকরি, বদলিসহ বিভিন্ন কাজে এপিএসের মাধ্যমে নেন মোটা অঙ্কের ঘুষ। ২০০৮ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সময় ১০ লাখ ৫ হাজার টাকা দামের হোন্ডা সিআরভি মডেলের গাড়িতে চড়তেন শাহরিয়ার আলম। সর্বশেষ তাকে ১ কোটি ১ লাখ ৩ হাজার ১০০ টাকা দামের লাক্সারি গাড়িতে চড়তে দেখা যায়। তার স্ত্রীর ব্যবহার করা গাড়িও ১ কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ টাকা দামের বলে জানা গেছে।