ঢাকা , সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::

লেবানিজদের ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করছে ইসরাইল, ইউনেস্কোর উদ্বেগ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:৫৩:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

ইসরাইলের প্রায় চার মাসব্যাপী বিমান ও স্থল হামলায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে বলেছেন, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলোও রক্ষা পায়নি।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখনো ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।

ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত ওই এলাকায় রয়েছে মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গ এবং শত শত বছরের পুরোনো সীমান্তবর্তী গ্রাম, যেখানে খ্রিস্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। এসব গ্রামের বহু ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

শুধু সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, দক্ষিণ লেবাননের প্রাচীন শহর টাইর, নাবাতিয়েহ ও তেবনিনও ব্যাপক বিমান হামলার শিকার হয়েছে। নাবাতিয়েহর মামলুক আমলের ঐতিহাসিক বাজার ধ্বংস হয়েছে। মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত একটি ধর্মীয় স্থাপনাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তেবনিনের ক্রুসেড আমলের দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর টাইর প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ফিনিশীয়, রোমান, বাইজেন্টাইন, মামলুক ও ক্রুসেডার সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন বহনকারী এই শহরটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত।

সাম্প্রতিক হামলায় শহরের প্রাচীন রোমান স্তম্ভের একটি শীর্ষাংশ ভেঙে গেছে। ধ্বংসাবশেষ রক্ষায় স্থাপন করা প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বিস্ফোরণে উড়ে গিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ওপরই পড়ে।

 

লেবাননের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা আদনান ইস্তানবুলি বলেন, “ক্ষয়ক্ষতি দেখে মনে হচ্ছে যেন নিচ থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে, অথবা ভয়াবহ কোনো ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।”

 

টাইরের উপ-মেয়র আলওয়ান শরাফেদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত এই শহরটি কোনো সংঘাতেই লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কথা নয়।

 

গত মাসে ইউনেস্কো এক বিবৃতিতে টাইরের সংরক্ষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের চামা দুর্গ ও বিউফোর্ট দুর্গ এলাকায় সংঘর্ষে ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবরেও গভীর উদ্বেগ জানায় সংস্থাটি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলাকে তারা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।

 

লেবাননের সংস্কৃতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, টাইরকে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকাভুক্ত করার জন্য ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষার পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

অন্যদিকে, রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা বেসামরিক অবকাঠামোর অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি করতে চায় না এবং কেবল সামরিক প্রয়োজনেই হামলা চালানো হয়। সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রতিটি অভিযান অনুমোদন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

 

তবে লেবাননের সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইসরাইলের এই সামরিক অভিযান দেশটির শত শত বছরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্থায়ীভাবে মুছে দিতে পারে।

 

তার ভাষায়, “এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে গ্রাম, জনপদ এমনকি পুরো শহর ধ্বংস করা হচ্ছে।”

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ বুঝতে পেরেছে, ক্ষতিটা ওদেরই হয়েছে: দিলীপ ঘোষ

লেবানিজদের ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করছে ইসরাইল, ইউনেস্কোর উদ্বেগ

আপডেট সময় ১১:৫৩:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

ইসরাইলের প্রায় চার মাসব্যাপী বিমান ও স্থল হামলায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে বলেছেন, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলোও রক্ষা পায়নি।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখনো ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।

ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত ওই এলাকায় রয়েছে মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গ এবং শত শত বছরের পুরোনো সীমান্তবর্তী গ্রাম, যেখানে খ্রিস্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। এসব গ্রামের বহু ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

শুধু সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, দক্ষিণ লেবাননের প্রাচীন শহর টাইর, নাবাতিয়েহ ও তেবনিনও ব্যাপক বিমান হামলার শিকার হয়েছে। নাবাতিয়েহর মামলুক আমলের ঐতিহাসিক বাজার ধ্বংস হয়েছে। মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত একটি ধর্মীয় স্থাপনাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তেবনিনের ক্রুসেড আমলের দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর টাইর প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ফিনিশীয়, রোমান, বাইজেন্টাইন, মামলুক ও ক্রুসেডার সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন বহনকারী এই শহরটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত।

সাম্প্রতিক হামলায় শহরের প্রাচীন রোমান স্তম্ভের একটি শীর্ষাংশ ভেঙে গেছে। ধ্বংসাবশেষ রক্ষায় স্থাপন করা প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বিস্ফোরণে উড়ে গিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ওপরই পড়ে।

 

লেবাননের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা আদনান ইস্তানবুলি বলেন, “ক্ষয়ক্ষতি দেখে মনে হচ্ছে যেন নিচ থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে, অথবা ভয়াবহ কোনো ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।”

 

টাইরের উপ-মেয়র আলওয়ান শরাফেদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত এই শহরটি কোনো সংঘাতেই লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কথা নয়।

 

গত মাসে ইউনেস্কো এক বিবৃতিতে টাইরের সংরক্ষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের চামা দুর্গ ও বিউফোর্ট দুর্গ এলাকায় সংঘর্ষে ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবরেও গভীর উদ্বেগ জানায় সংস্থাটি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলাকে তারা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।

 

লেবাননের সংস্কৃতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, টাইরকে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকাভুক্ত করার জন্য ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষার পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

অন্যদিকে, রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা বেসামরিক অবকাঠামোর অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি করতে চায় না এবং কেবল সামরিক প্রয়োজনেই হামলা চালানো হয়। সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রতিটি অভিযান অনুমোদন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

 

তবে লেবাননের সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইসরাইলের এই সামরিক অভিযান দেশটির শত শত বছরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্থায়ীভাবে মুছে দিতে পারে।

 

তার ভাষায়, “এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে গ্রাম, জনপদ এমনকি পুরো শহর ধ্বংস করা হচ্ছে।”