ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের বিষয়ে সিনেটে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অধিবেশন থেকে ‘ওয়াকআউট’ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পাঁচ সদস্য।
সোমবার (২৯ জুন) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম প্রস্তাবটি পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানালে ছাত্র প্রতিনিধিরা ওয়াকআউট করেন। এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক বি এম ওবায়দুল ইসলাম তাদেরকে ওয়াকআউট না করার অনুরোধ জানান।
এর আগে সভার চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সিন্ডিকেট থেকে সিনেটে পাঠানো একটি প্রস্তাব পড়ে শোনান। এতে শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ওসমান হাদী হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের নাম বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা হল, সুলতানা কামাল হোস্টেলের নাম শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল, রাসেল টাওয়ারের নাম অফিসার্স টাওয়ার এবং বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের নাম শহীদ মিনার টাওয়ার করার প্রস্তাবনা উল্লেখ করা হয়।
উপাচার্য জানান, সংশ্লিষ্ট হলের প্রাধ্যক্ষ, হল সংসদ, কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভা প্রস্তাবটি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটে উপস্থাপনের জন্য পাঠায়।
এ সময় সিনেট সদস্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান জানতে চান, ‘নাম পরিবর্তনের বিষয়ে সিন্ডিকেট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না?’ জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘সিন্ডিকেট কেবল প্রস্তাবটি সিনেটে পাঠিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেনি।’
এ সময় অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি দীর্ঘ নয় বছর একটানা সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও কাজ করেছি। সিনেটে শুধু অনুমোদনের জন্য আসে, সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয় সিন্ডিকেটে। সুতরাং এ প্রস্তাবটি প্রসিডিওর অনুসরণ করে আসতে হবে। যেকোনো ধরনের পরিবর্তন সিন্ডিকেট থেকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত সুপারিশ আকারে আসবে, আমরা সেটা অনুমোদন দিব।’ এক্ষেত্রে অধ্যাপক লুৎফর রহমান নিয়ম মোতাবেক কোনো সিদ্ধান্ত সিনেটে আসার আগে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদনের জন্য আহ্বান জানান।
এ সময় সিনেট সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হলগুলো বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান হল তো আশির দশকে নামকরণ করা, আর সেটি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের পাশেই। পাশাপাশি দুটো হল, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অংশ। এই ইতিহাসের অংশ হওয়া একটা বিষয়কে এত আলোচনাহীনভাবে বদলানো যায় না, এটা খারাপ দৃষ্টান্ত।’
এছাড়া অধিবেশনে সিনেট সদস্য ও গাজীপুর ৫ আসনের সাংসদ ও সিনেট সদস্য ফজলুল হক মিলন শেখ মুজিবুর রহমান হলের নামের পরিবর্তনের জন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নামকরণ করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।
তবে সিনেটেই সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি জানান ডাকসু নেতারা। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ‘সিন্ডিকেটে আসার পূর্বে শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর গণস্বাক্ষর দিয়ে নাম পরিবর্তনের বিষয়টা বলেছে। শিক্ষার্থীরা কয়েকটা প্রেক্ষাপট বলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়েছে, তখন তারা টিশার্টে হলের নামটা লিখতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ নামটা লেখার পর তিনি যখন বাইরে ঘুরবেন তার ওপর অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তারা ইনসিকিউরিটিতে ভোগে। ডিবেটিং ক্লাবসহ অন্যান্য ক্লাবগুলো বলছে, আমরা ১ বছর ধরে কোনো প্রোগ্রাম করতে পারছি না, স্পন্সর পাচ্ছি না।’
ফরহাদ বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানতাম সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেখান থেকে অনুমোদন জন্য সিনেটে ফরওয়ার্ড করা হয়েছে। কিন্তু এখন ব্যতিক্রম শুনতে পাচ্ছি। এমনকি বর্তমান সরকার গঠন করার পরে সংসদের আগে অনেকগুলো নাম পরিবর্তন হয়েছিল, সেগুলো বিল আকারে পাস হয়েছে। আপনাদের শিক্ষার্থীদের দিকে তাকানো দরকার।’
পরবর্তীতে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমরা দেখেছি বিপ্লব পরবর্তী ৮৮০ টি স্থাপনার নাম পরিবর্তন হয়েছে। সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদী আইকন শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও নাম পরিবর্তন হয়েছে, কেন আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে না? সুতরাং নাম পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। নাম পরিবর্তন করে বীরশ্রেষ্ঠসহ অন্যান্য নাম বিবেচনায় আসতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের মতামতগুলো গণতান্ত্রিকভাবে ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আপনাদের কাছে জানিয়েছি। শেখ মুজিবুর রহমান নামের হলের ব্যানার নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে হেনস্তার শিকার হয়েছে। অধিবেশনে শিক্ষার্থীদের মতামত অগ্রাহ্য করা হয়েছে, আমরা ওয়াকআউট করব।’
এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম প্রসিডিওর মেনে প্রস্তাব পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠানোর কথা জানালে পরবর্তীতে ডাকসু থেকে মনোনীত ৫ সদস্য ওয়াকআউট করেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















