এবার চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনে শুধু সেনাবাহিনী নয়, প্রয়োজন হলে বেসামরিক নাগরিক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ধরনের সম্পদকে জাতীয় প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে নতুন আইনটি কার্যকর হবে। ২০১০ সালে আইনটি প্রণয়নের পর এটিই এর প্রথম বড় ধরনের সংশোধন। চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটি গত ২৮ আগস্ট সংশোধিত আইনটি অনুমোদন করে। নতুন আইনে মোট ১৪টি অধ্যায় ও ৮২টি ধারা রয়েছে। আগের আইনের ৭২টি ধারার সঙ্গে আরও ১০টি ধারা যুক্ত হয়েছে। সংশোধনের মূল লক্ষ্য হিসেবে আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত ধরন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামরিক–বেসামরিক সম্পদের সমন্বয় জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
সংশোধিত আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুদ্ধ বা বড় ধরনের জাতীয় সংকটের সময় বেসামরিক সম্পদকে দ্রুত সামরিক কাজে ব্যবহারের আইনি কাঠামো তৈরি করা। এর আওতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, তথ্য ও অন্যান্য কৌশলগত সম্পদকে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকেও দ্রুত যুদ্ধের কাজে রূপান্তর করার সুযোগ বাড়ছে। এআই, ডেটা সেন্টার, ড্রোন, রোবটিকস এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগের মতো প্রযুক্তিও নতুন ব্যবস্থার আওতায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা, তথ্যপ্রবাহ ও ড্রোনের ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে। চীন তার বেসামরিক প্রযুক্তি খাতের বিশাল সক্ষমতাকে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তিতে রূপান্তরের পথ আরও সুগম করছে।
নতুন আইনে নাগরিকদেরও জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতির ব্যবস্থার আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে। সামরিক অভিযান, দুর্যোগ মোকাবিলা বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার মতো পরিস্থিতিতে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তলব করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে বাড়ি, ভবন, যানবাহন বা অন্যান্য সরঞ্জাম সীমিত ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় কাজে নেওয়ার ক্ষমতাও সরকারের থাকবে। এই পরিবর্তনের ফলে চীনের সামরিক–বেসামরিক সমন্বয়ের ধারণা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। যুদ্ধের সময় অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন, পরিবহন, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতকে সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত করা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
আইনটি ভারতের জন্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ভারতের মধ্যে লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশ সীমান্তে বিপুল সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ফলে চীনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসামরিক সম্পদকে যুদ্ধের কাজে দ্রুত ব্যবহারের নতুন আইনি ব্যবস্থা ভারতের কৌশলগত মহলে নজর কেড়েছে। ভারতীয় বিশ্লেষণে বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় চীনের অবকাঠামো, রসদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে এই নতুন আইনকে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে আইন সংশোধন হয়েছে বলেই চীন শিগগির যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। চীনা কর্তৃপক্ষ আইনটির উদ্দেশ্য হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংহতির আধুনিকায়ন এবং শান্তি ও যুদ্ধ উভয় পরিস্থিতিতে সম্পদের সমন্বয়ের কথা বলেছে। একই ধরনের আইন ও প্রস্তুতি অনেক দেশেই বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান। তাই নতুন আইনকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের সময়সূচি হিসেবে ব্যাখ্যা করা এখনই যুক্তিসংগত নয়।
তবে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে আইনটির গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়ে যায়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান নিয়ে কোনো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে চীনকে শুধু বিপুল সামরিক বাহিনী নয়, বেসামরিক জাহাজ, পরিবহন, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাও কাজে লাগাতে হতে পারে। নতুন আইন সেই ধরনের দ্রুত জাতীয় সংহতি বা ‘ফুল–স্পেকট্রাম’ প্রস্তুতির আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করছে। ফলে চীনের নতুন প্রতিরক্ষা সংহতি আইনকে শুধু একটি প্রশাসনিক আইন সংশোধন হিসেবে দেখছে না আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। এটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনে চীনের বিশাল বেসামরিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকে সামরিক সক্ষমতায় দ্রুত রূপান্তর করা সম্ভব হবে। ভারতসহ ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এটাই এই সংশোধনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা। সূত্র: আনন্দবাজার, এনপিসি অবজার্ভার, সিপিপিআর ও ইন্ডিয়া টুডে

ডেস্ক রিপোর্ট 


















