জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জামায়াত আমির। ছবি: সংগৃহীত
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকারি দলের প্রতি ফের আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির। তিনি বলেন, আমি মনে করি-সময় এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। জনরায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জনআকাঙ্খাকে আমরা যেন বাস্তবায়ন করতে পারি। তাহলে স্বাধীনতার ঘোষণা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে এই দলটি (বিএনপি) যেভাবে সম্মানিত হয়েছেন, এবার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে তারা আরেকদফা সম্মানিত হবেন বলে মনে করি। গোটা সংসদ সম্মানিত হবে। আমরা তার অপেক্ষায় থাকলাম।
তিনি বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মাগরিবের বিরতির পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রায় ৪৫ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এত শহীদের রক্ত, জীবন, পঙ্গুত্ব, জেল-জুলুম, এত ত্যাগ, এত গুম-খুন, এত আয়নাঘর, সবকিছুর অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করে যে নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হলো, তার আগে জাতীয় ঐকমত্যের জন্য একটা কনসেন্সাস কমিশন হয়েছিল; দীর্ঘদিন মাসের পর মাস সেখানে বৈঠক হয়েছে, মত বিনিময় হয়েছে, কথা হয়েছে, কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তারই আলোকে এই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
একসাথে দুটো—একটা সংসদ নির্বাচন, আরেকটা গণভোট। সংসদ নির্বাচনের আমরা যতটুকু হোক কার্যকারিতা পেলাম, কিন্তু গণভোটের কোনো সুরাহা এখনো হলো না।
তিনি বলেন, আমরা কোনো দলীয় শাসন চাইনি; আমরা চেয়েছিলাম যে দলটি নির্বাচিত হয়ে দেশ এবং জনগণকে পরিচালনা করবে, সরকার গঠন করবে, তাদের মধ্যে আর যেন ফ্যাসিবাদ ভর না করে, আর যেন কোনো বৈষম্য না হয়, আর যেন কোনো মায়ের বুক অপ্রয়োজনে অহেতুক খালি না হয়, দেশে যেন সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর জন্যই প্রয়োজন ছিল একটি আমূল পরিবর্তনের, সেই পরিবর্তনের লক্ষ্যেই ছিল গণভোট।
সংস্কার আর সংশোধনের পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশোধনের সমস্যা হচ্ছে, আজকে এখানে কোন বিল আকারে আসবে, আমরা এটা পাশ করে দেব, কালকে আদালত চাইলে এটাকে চ্যালেঞ্জ করে শেষ করে দেবে।
কিন্তু যদি এটা গণপরিষদ কিংবা একটা সংস্কার পরিষদের মধ্য দিয়ে এই আইন তৈরি হয়, তাহলে আদালত কোনো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায় না।
তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদ পালিয়ে গিয়েও এই জাতিকে বারবার বিরক্ত করছে, উসকানি দিচ্ছে, সমাজ এবং দেশকে অস্থির করার চেষ্টা করছে। এই আসি ওই আসি আসি আসি বলে, এতো আসি আসি বলেন তো- গেলেন কেন, থাকতেন, রাজনীতি করেছেন, যদি বিশ্বাস করেন যে এই দেশকে জাতিকে ভালোবাসেন তাহলে মাটি কামড়ে থাকতেন, অপরাধ করলে অপরাধের শাস্তি নিতেন, না করলে নিজেকে পরিষ্কার করতেন। রাজনৈতিকবই
তিনি বলেন, পালায় কে? পালায় যে দোষী, পালায় যে অপরাধী, পালায় যে চোর, পালায় যে লোটেরা, তারা শুধু পালায়; কোন সৎ মানুষ পালায় না।
ভারতের আচরণ ব্যতীত করে
তিনি ভারতের আচরণের সমালোচনা করে বলেন, আমরা বিশ্বিত এবং আমরা দুঃখিত, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ, আমাদের জন্য তাদের অবদানকে আমরা অস্বীকার করি না; কিন্তু এইরকম খুনিদেরকে তারা অবলীলায় শুধু আশ্রয় দিবে না, তাদেরকে রাজনৈতিক অপতৎপরতা চালানোরও সুযোগ দেবে, এটা আমাদেরকে ব্যতীত করে।
তিনি বলেন, তারা আমাদের সঙ্গে সৎ সম্পর্ক চান, আমরাও চাই; প্রতিবেশীর সৎ সম্পর্ক গড়তে চান, আমরাও চাই। যদি সত্যিই আমরা সৎ প্রতিবেশী হতে চাই, তাহলে উভয়পক্ষকেই আমাদের সদিচ্ছা ব্যক্ত করতে হবে।
তাহলে আমরা আর সীমান্তে কাঁটাতারে ফেলানির লাশ জ্বলতে দেখতে চাই না, নির্বিচারে আমাদের দেশের নাগরিকদেরকে ধরে নিয়ে হত্যা করবে এটা আমরা দেখতে চাই না, উত্তরবঙ্গের কান্না তিস্তার কোন সমাধান হবে না এটা আর আমরা সহ্য করতে রাজি নই, পদ্মা গঙ্গাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে আগামীতে এটা সুরাহা কি হবে, এই বছরেই তা আবার এই চুক্তি শেষ হবে, নবায়নের সময় আসবে।
তিনি সরকারকে অনুরোধ করে বলেন, এখন থেকে এই শক্তিশালী নীতিমালা নিয়ে সাহস করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে তাদের সাথে যেন মোকাবিলা করা হয়। এখানে আলোচনা হবে, লড়াই হবে সমানে সমান, আমরা কারো অধীনতা আর মেনে নেব না। বাংলাদেশ আর কারো অধীনে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে না, ওই চ্যাপ্টার ক্লোজড, ওইটা রিওপেন হবে না, আমাদের সেই জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। জাতীয়খবর
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে রাষ্ট্রপতি যেন সই না করেন
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনকে কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক দাবি করে এই আইন অনুমোদন না দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে আইনটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামাদের মতামত নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি আসলেই কোরআন এবং সুন্নাহর সঙ্গে একেবারে সাংঘর্ষিক। আইনটি এরইমধ্যে সংসদে পাস হলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি যেন এতে স্বাক্ষর না করেন।
তিনি বলেন, দেশের প্রসিদ্ধ ও শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা এই আইনটির বিষয়ে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছেন এবং এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। সরকার ও বিএনপির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তিনি বলেন, যেহেতু তারা অতীতে বলেছেন যে কোরআন-সুন্নাহর বিপরীতে কোনো আইন করা হবে না, তাই এই ওয়াদা রক্ষার্থে আইনটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে ফেরত পাঠানো যেতে পারে।
এর আগে এই বিতর্কিত আইনের প্রতিবাদে তাদের দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ বর্জন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান।
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ দেখতে চাই
সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে দুর্নীতি ঢুকে গেছে মন্তব্য করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, দেশে দুর্নীতির মাত্রা আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা শুধু আমার কথা নয়। বর্তমান রাষ্ট্রপতিও বলেছেন, গত চার পাঁচ মাসে কোন পরিবর্তন হয়নি বরঞ্চ দুর্নীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছে। শুধু প্রধানমন্ত্রী তার নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা করে চলছেন। তিনি বলেন, সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল না করলে এই সমাজ মাজা সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। আমরা যদি এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে না পারি তাহলে যত পরিকল্পনাই করি না কেন কোন পরিকল্পনাই সফলতার মুখ দেখবে না। দুর্নীতিবাজদের পেটের ভিতরে সব কিছু ঢুকে যাবে। আমরা এই সমাজটাকে দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ হিসেবে দেখতে চাই এবং এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব দিবেন সেটা আমরা দেখতে চাই।
মেধার মূল্যায়ন চাই
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি আশা করেছিল মেধাভিত্তিক একটা সমাজ হবে। আমিও বলেছি প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন আমরা মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলবো। কিন্তু এখনতো আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি না। বিভিন্ন জায়গায় যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার কথা সেখানে দলীয় প্রশাসন বসানো হয়েছে। এমনকি সরকারি বিভিন্ন করপোরেশন সংস্থায় বসানো হয়েছে। সম্প্রতি চাকরিতে ভাইবা আর লিখিতের মার্ক সমান করা নিয়ে একটা নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। তরুণ সমাজ ইতোমধ্যেই তার প্রতিবাদ করেছে। আমরাও তার প্রতিবাদ করি। যা চলে আসছে সেটাই বহাল রাখা হোক। মেধাকে সবাই মিলে সম্মান করি। মেধাবীরা এসে আমাদের আগামী সমাজটা তৈরি করে দিক এটা আমরা চাই। এই ক্ষেত্রে আমরা কোন দলীয় আনুকল্য দেখতে চাই না।
ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান
দেশকে বিভক্ত না করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদে তাদের বক্তব্য হবে যৌক্তিক ও শালীন এবং কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাই না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা সামনে এগোতে চাই। সংসদে আমাদের বক্তব্য হবে যৌক্তিক এবং শালীন, কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হবে না। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পার্লামেন্টে একটি নতুন ইতিহাস তৈরি হবে। জাতীয়খবর
দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজার অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও উভয় খাতেই বিপর্যয় নেমে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১৫ বছর ধরে গুম, খুন ও মামলা দিয়ে বিরোধী দলকে নিগ্রহ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-তরুণদের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির অবসান হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিল্প খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে পোশাক খাতের উৎপাদন ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প মালিকরা দেউলিয়া হয়ে গেলে ব্যাংক ও সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প খাতকে রক্ষার দাবি জানান তিনি। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধেরও আহ্বান জানান।
এছাড়া তিনি সংসদকে বৈষম্যমুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নারী সদস্যদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। সরকারি দলের সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের তাদের দলীয় এমপিদের এলাকায় দায়িত্ব দেয়া এবং এমপিদের অফিস স্থানীয় সরকারের কোন স্থাপনার পরিবর্তে অন্যত্র ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করেন তিনি।
নিজ নির্বাচনি এলাকার সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদী কলেজ মেডিকেল কলেজের বিরাজমান সংকট সহ ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন সমাধানের আহবান জানান তিনি। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কিছু সমাধান হওয়ারয় সরকারকে ধন্যবাদ জানান জামায়াত আমির।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















