ঢাকা , শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
৯/১১ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সমস্যা স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী আটক হয়ে মুচলেকায় মুক্তি, ফের মহাসড়কে বাস থামিয়ে চাঁদাবাজি নোয়াখালীতে চলন্ত অটোরিকশায় সন্তান প্রসব, নবজাতককে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা ‘ফেসবুকে মন্তব্যের জেরে’ বাসায় গিয়ে ছাত্রদল নেতাকে পেটাল ছাত্রলীগ নেতা হামজার সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তি বার্সেলোনার চলতি বছরই ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তাকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে না পাকিস্তান: পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাঁদা না দেওয়ায় যুবদল কর্মীকে অপহরণ ও পিটিয়ে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে

৯/১১ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:৫১:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

৯/১১ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল
নিউইয়র্ক শহরের আকাশরেখা আমার কাছে ছিল একেবারেই ঘরের কাছের দৃশ্য। আক্ষরিক অর্থেই। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরটির বিখ্যাত স্কাইলাইন আমার শোবার ঘরের জানালা থেকেই দেখা যেত। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে নিউইয়র্কের ঠিক ওপারে বেড়ে ওঠার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয়দের অনেক সময় শহরটি ঘুরিয়ে দেখাতাম। বিশ্বের অসংখ্য মানুষের মতো তারাও সিনেমা আর নববর্ষের রাতে টাইমস স্কয়ারের সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠা ‘বিগ অ্যাপল’কে নিজের চোখে দেখতে চাইতেন।
আমি তাদের নিয়ে যেতাম স্ট্যাচু অব লিবার্টি, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, সেন্ট্রাল পার্ক এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। ২০০১ সালের আগস্টের শেষ দিকে ছিল আমার শেষ ট্যুর। আমরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ‘টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত পর্যবেক্ষণ ডেকে উঠেছিলাম। তখনও জানতাম না, দুই সপ্তাহের মধ্যেই নিচে ছড়িয়ে থাকা বিশাল নগরীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জায়গাটি পুরো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সঙ্গে ধসে পড়বে। প্রাণ হারাবেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ, আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাবে আমাদের পরিচিত পৃথিবী।

৯/১১-এর হামলার সময় আমি নিউ ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ফিরে গিয়েছিলাম। সেদিন সকালে সহপাঠীদের সঙ্গে মাত্র ১০ ইঞ্চির একটি টেলিভিশন ঘিরে বসে এবিসির সাংবাদিক পিটার জেনিংসের সরাসরি সংবাদ দেখছিলাম।

হামলার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলের তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য কী অর্থ বহন করে—দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা খুবই ভালো।’ পরে নিজের বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, ‘ভালো নয়, তবে এটি তাৎক্ষণিক সহানুভূতি তৈরি করবে।’ তার ভাষায়, এই হামলা ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যকার বন্ধন আরও শক্তিশালী করবে।’

প্রায় ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় গ্রাউন্ড জিরো তখনও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। সেই সময় নেতানিয়াহুর এমন মন্তব্য আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, শুধু পৃথিবীই বদলে যেতে যাচ্ছে না; যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে আমার জীবনও আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল। আর নেতানিয়াহু বুঝতে পারছিলেন, এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য কী ধরনের সুযোগ তৈরি করছে।

৯/১১-এর আগের পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ওপর ৯/১১-এর প্রভাব বুঝতে হলে তার আগের পরিস্থিতিটাও দেখা জরুরি।

শীতল যুদ্ধের অবসান থেকে ৯/১১-এর হামলা পর্যন্ত সময়টি ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য বেশ জটিল। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ছিল শীতল যুদ্ধ। ইসরায়েলের জন্য সেই বাস্তবতা সামলানো তুলনামূলক সহজ ছিল।

আমেরিকানদের কাছে ইসরায়েল নিজেকে উপস্থাপন করত একই মূল্যবোধের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে—যে আরব বিশ্বের সোভিয়েত-সমর্থিত রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

কিন্তু শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ে, পূর্ব ইউরোপজুড়ে গণতন্ত্রের ঢেউ আসে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটে। একই সময়ে ইসরায়েল প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদাকে কঠোরভাবে দমন করছিল।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় হঠাৎ করেই ইসরায়েল আর আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিল না। এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে। প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ হলেও, ওয়াশিংটন ইসরায়েলি সরকারের ওপর বসতি স্থাপন বন্ধের জন্য কিছুটা চাপও প্রয়োগ করেছিল।

৯/১১ বদলে দিল সবকিছু

৯/১১ এবং এর পর শুরু হওয়া বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এই পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দেয়।

তখন দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর হামলা ইসরায়েল ও আমেরিকাকে আবারও একটি নতুন বৈশ্বিক বিভাজনের একই পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

শীতল যুদ্ধের সময়ের ‘খলনায়ক’ ছিল কমিউনিজম। এবার নতুন শত্রু হিসেবে সামনে আসে ‘র‌্যাডিক্যাল ইসলাম’।

নেতানিয়াহু এবং তার মিত্ররা বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। ২৫ বছর আগে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া নেতানিয়াহুর বক্তব্যই এর স্পষ্ট উদাহরণ।

হামলায় আহত আমেরিকা ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের জন্য সহজেই প্রভাবিত হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল। আর ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন মহল সেই বয়ান তুলে ধরতে আগ্রহী ছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই’ নিয়ে আমেরিকা যত বেশি ব্যস্ত হবে, ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্কও তত ঘনিষ্ঠ থাকবে।

এর প্রভাব সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ে, ইসরায়েলের জন্য মার্কিন আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সমর্থকরা এমন বিভিন্ন আইন ও উদ্যোগকে সমর্থন করে, যেগুলো বিস্তৃত সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতা ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের ওপরও কঠোরতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।

এই পরিবর্তন শুধু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অভিন্ন ‘সন্ত্রাসী হুমকির’ বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

আমেরিকান জনগণের কাছে ফিলিস্তিনিদের আরও সহজে একটি ‘নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।

ফিলিস্তিনিরা কেন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে—এই প্রশ্নের বদলে আমেরিকানদের সামনে ইসরায়েলের দমন-পীড়নকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মতো ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আমেরিকান রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় মুসলিমদেরও প্রায়ই দুই ভাগে ভাগ করা হতো—‘মধ্যপন্থী’ ও ‘চরমপন্থী’। ইসরায়েলের সমালোচনাকারীদের নিয়মিতভাবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ঠেলে দেওয়া হতো। এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক কলঙ্ক তৈরি হয় এবং অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতে শুরু করেন।

ইসরায়েলের সামরিক কৌশলও একইভাবে আমেরিকার জন্য ‘কার্যকর’ হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকে।

পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েল যে নজরদারি, বিদ্রোহ দমন, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করত—যেগুলোর কিছু নিয়ে আগে ওয়াশিংটন সমালোচনা করেছিল—পরবর্তীতে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীও সেসব কৌশলের কিছু ব্যবহার করে। ফলে আমেরিকান জনগণের কাছে এসব পদ্ধতি ক্রমেই বৈধতা পেতে থাকে।

ইসলামবিদ্বেষী বয়ান ছড়ানোর অভিযোগ

৯/১১-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বয়ান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকজন ব্যক্তি বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

ডেভিড হোরোভিটজ নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনিদের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং এমনকি ফিলিস্তিনি পরিচয়কেই নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনার জন্য প্রোফাইলিংয়ের পক্ষে কথা বলেন।

ড্যানিয়েল পাইপস প্রায়ই মুসলিম সংগঠনগুলোকে সম্ভাব্য বা গোপনভাবে সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে উপস্থাপন করতেন। এতে মুসলিমদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ওপর সন্দেহ তৈরি হতো।

স্টিভেন এমারসন মূলধারার মুসলিম সংগঠনগুলোর ভেতরে ‘অনুপ্রবেশের’ নানা বয়ান জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেন, যার ফলে এসব সংগঠনও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

ব্রিজিট গ্যাব্রিয়েল নিয়মিতভাবে ইসলামবাদকে একটি সভ্যতাগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরতেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে পশ্চিমা বিশ্বের সামনের সারির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়।

অন্যদিকে ডেভিড ইয়েরুশালমি এই হুমকির বয়ানকে শরিয়াহ আইন ও মুসলিম রাজনৈতিক প্রভাবের দিকেও সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেন। ফলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকেও সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এই বয়ানগুলোর মূল যুক্তি ছিল—সন্ত্রাসবাদকে কার্যত ফিলিস্তিনি, আরব ও মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে একাকার করে দেখা। এর ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মডেলকে আমেরিকানদের কাছে বৈধ, এমনকি আদর্শ হিসেবেও উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়।

২৫ বছর পরও শিক্ষা নেওয়ার সময়

৯/১১-এর ২৫ বছর পর আজ বিষয়গুলো নিয়ে ফিরে তাকানো জরুরি। কারণ, ইসরায়েল ও ইসরায়েলি নীতিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের জন্য আমেরিকান রাজনৈতিক পরিসরে যে বিপজ্জনক রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ঘৃণার বয়ান ছড়িয়েছিল, তার প্রভাব এখনও রয়েছে।

এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও একটি আপাতদৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে জড়িয়ে পড়েছে—এবার ইরানকে ঘিরে। লেখকের মতে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইতোমধ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে; জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে আমেরিকানদের খরচ হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই বাস্তবতায় আজ আমেরিকানদের উচিত ইসলামবিদ্বেষী বয়ান নিয়ে দ্রুত প্রশ্ন তোলা—এসব বয়ান সমাজকে কোন বিপজ্জনক পথে নিয়ে যায় এবং যারা এসব প্রচার করে, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।

লেখক- ইউসুফ মুনাইয়ার

লেখক- ইউসুফ মুনাইয়ার: ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের একজন সিনিয়র নন-রেসিডেন্ট ফেলো। এর আগে তিনি ইউএস ক্যাম্পেইন ফর প্যালেস্টিনিয়ান রাইটসের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আলজাজিরা থেকে অনূদিত।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

৯/১১ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল

৯/১১ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল

আপডেট সময় ১০:৫১:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯/১১ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল
নিউইয়র্ক শহরের আকাশরেখা আমার কাছে ছিল একেবারেই ঘরের কাছের দৃশ্য। আক্ষরিক অর্থেই। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরটির বিখ্যাত স্কাইলাইন আমার শোবার ঘরের জানালা থেকেই দেখা যেত। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে নিউইয়র্কের ঠিক ওপারে বেড়ে ওঠার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয়দের অনেক সময় শহরটি ঘুরিয়ে দেখাতাম। বিশ্বের অসংখ্য মানুষের মতো তারাও সিনেমা আর নববর্ষের রাতে টাইমস স্কয়ারের সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠা ‘বিগ অ্যাপল’কে নিজের চোখে দেখতে চাইতেন।
আমি তাদের নিয়ে যেতাম স্ট্যাচু অব লিবার্টি, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, সেন্ট্রাল পার্ক এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। ২০০১ সালের আগস্টের শেষ দিকে ছিল আমার শেষ ট্যুর। আমরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ‘টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত পর্যবেক্ষণ ডেকে উঠেছিলাম। তখনও জানতাম না, দুই সপ্তাহের মধ্যেই নিচে ছড়িয়ে থাকা বিশাল নগরীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জায়গাটি পুরো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সঙ্গে ধসে পড়বে। প্রাণ হারাবেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ, আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাবে আমাদের পরিচিত পৃথিবী।

৯/১১-এর হামলার সময় আমি নিউ ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ফিরে গিয়েছিলাম। সেদিন সকালে সহপাঠীদের সঙ্গে মাত্র ১০ ইঞ্চির একটি টেলিভিশন ঘিরে বসে এবিসির সাংবাদিক পিটার জেনিংসের সরাসরি সংবাদ দেখছিলাম।

হামলার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলের তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য কী অর্থ বহন করে—দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা খুবই ভালো।’ পরে নিজের বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, ‘ভালো নয়, তবে এটি তাৎক্ষণিক সহানুভূতি তৈরি করবে।’ তার ভাষায়, এই হামলা ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যকার বন্ধন আরও শক্তিশালী করবে।’

প্রায় ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় গ্রাউন্ড জিরো তখনও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। সেই সময় নেতানিয়াহুর এমন মন্তব্য আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, শুধু পৃথিবীই বদলে যেতে যাচ্ছে না; যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে আমার জীবনও আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল। আর নেতানিয়াহু বুঝতে পারছিলেন, এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য কী ধরনের সুযোগ তৈরি করছে।

৯/১১-এর আগের পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ওপর ৯/১১-এর প্রভাব বুঝতে হলে তার আগের পরিস্থিতিটাও দেখা জরুরি।

শীতল যুদ্ধের অবসান থেকে ৯/১১-এর হামলা পর্যন্ত সময়টি ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য বেশ জটিল। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ছিল শীতল যুদ্ধ। ইসরায়েলের জন্য সেই বাস্তবতা সামলানো তুলনামূলক সহজ ছিল।

আমেরিকানদের কাছে ইসরায়েল নিজেকে উপস্থাপন করত একই মূল্যবোধের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে—যে আরব বিশ্বের সোভিয়েত-সমর্থিত রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

কিন্তু শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ে, পূর্ব ইউরোপজুড়ে গণতন্ত্রের ঢেউ আসে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটে। একই সময়ে ইসরায়েল প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদাকে কঠোরভাবে দমন করছিল।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় হঠাৎ করেই ইসরায়েল আর আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিল না। এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে। প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ হলেও, ওয়াশিংটন ইসরায়েলি সরকারের ওপর বসতি স্থাপন বন্ধের জন্য কিছুটা চাপও প্রয়োগ করেছিল।

৯/১১ বদলে দিল সবকিছু

৯/১১ এবং এর পর শুরু হওয়া বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এই পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দেয়।

তখন দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর হামলা ইসরায়েল ও আমেরিকাকে আবারও একটি নতুন বৈশ্বিক বিভাজনের একই পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

শীতল যুদ্ধের সময়ের ‘খলনায়ক’ ছিল কমিউনিজম। এবার নতুন শত্রু হিসেবে সামনে আসে ‘র‌্যাডিক্যাল ইসলাম’।

নেতানিয়াহু এবং তার মিত্ররা বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। ২৫ বছর আগে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া নেতানিয়াহুর বক্তব্যই এর স্পষ্ট উদাহরণ।

হামলায় আহত আমেরিকা ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের জন্য সহজেই প্রভাবিত হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল। আর ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন মহল সেই বয়ান তুলে ধরতে আগ্রহী ছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই’ নিয়ে আমেরিকা যত বেশি ব্যস্ত হবে, ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্কও তত ঘনিষ্ঠ থাকবে।

এর প্রভাব সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ে, ইসরায়েলের জন্য মার্কিন আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সমর্থকরা এমন বিভিন্ন আইন ও উদ্যোগকে সমর্থন করে, যেগুলো বিস্তৃত সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতা ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের ওপরও কঠোরতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।

এই পরিবর্তন শুধু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অভিন্ন ‘সন্ত্রাসী হুমকির’ বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

আমেরিকান জনগণের কাছে ফিলিস্তিনিদের আরও সহজে একটি ‘নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।

ফিলিস্তিনিরা কেন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে—এই প্রশ্নের বদলে আমেরিকানদের সামনে ইসরায়েলের দমন-পীড়নকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মতো ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আমেরিকান রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় মুসলিমদেরও প্রায়ই দুই ভাগে ভাগ করা হতো—‘মধ্যপন্থী’ ও ‘চরমপন্থী’। ইসরায়েলের সমালোচনাকারীদের নিয়মিতভাবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ঠেলে দেওয়া হতো। এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক কলঙ্ক তৈরি হয় এবং অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতে শুরু করেন।

ইসরায়েলের সামরিক কৌশলও একইভাবে আমেরিকার জন্য ‘কার্যকর’ হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকে।

পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েল যে নজরদারি, বিদ্রোহ দমন, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করত—যেগুলোর কিছু নিয়ে আগে ওয়াশিংটন সমালোচনা করেছিল—পরবর্তীতে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীও সেসব কৌশলের কিছু ব্যবহার করে। ফলে আমেরিকান জনগণের কাছে এসব পদ্ধতি ক্রমেই বৈধতা পেতে থাকে।

ইসলামবিদ্বেষী বয়ান ছড়ানোর অভিযোগ

৯/১১-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বয়ান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকজন ব্যক্তি বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

ডেভিড হোরোভিটজ নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনিদের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং এমনকি ফিলিস্তিনি পরিচয়কেই নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনার জন্য প্রোফাইলিংয়ের পক্ষে কথা বলেন।

ড্যানিয়েল পাইপস প্রায়ই মুসলিম সংগঠনগুলোকে সম্ভাব্য বা গোপনভাবে সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে উপস্থাপন করতেন। এতে মুসলিমদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ওপর সন্দেহ তৈরি হতো।

স্টিভেন এমারসন মূলধারার মুসলিম সংগঠনগুলোর ভেতরে ‘অনুপ্রবেশের’ নানা বয়ান জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেন, যার ফলে এসব সংগঠনও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

ব্রিজিট গ্যাব্রিয়েল নিয়মিতভাবে ইসলামবাদকে একটি সভ্যতাগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরতেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে পশ্চিমা বিশ্বের সামনের সারির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়।

অন্যদিকে ডেভিড ইয়েরুশালমি এই হুমকির বয়ানকে শরিয়াহ আইন ও মুসলিম রাজনৈতিক প্রভাবের দিকেও সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেন। ফলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকেও সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এই বয়ানগুলোর মূল যুক্তি ছিল—সন্ত্রাসবাদকে কার্যত ফিলিস্তিনি, আরব ও মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে একাকার করে দেখা। এর ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মডেলকে আমেরিকানদের কাছে বৈধ, এমনকি আদর্শ হিসেবেও উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়।

২৫ বছর পরও শিক্ষা নেওয়ার সময়

৯/১১-এর ২৫ বছর পর আজ বিষয়গুলো নিয়ে ফিরে তাকানো জরুরি। কারণ, ইসরায়েল ও ইসরায়েলি নীতিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের জন্য আমেরিকান রাজনৈতিক পরিসরে যে বিপজ্জনক রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ঘৃণার বয়ান ছড়িয়েছিল, তার প্রভাব এখনও রয়েছে।

এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও একটি আপাতদৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে জড়িয়ে পড়েছে—এবার ইরানকে ঘিরে। লেখকের মতে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইতোমধ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে; জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে আমেরিকানদের খরচ হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই বাস্তবতায় আজ আমেরিকানদের উচিত ইসলামবিদ্বেষী বয়ান নিয়ে দ্রুত প্রশ্ন তোলা—এসব বয়ান সমাজকে কোন বিপজ্জনক পথে নিয়ে যায় এবং যারা এসব প্রচার করে, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।

লেখক- ইউসুফ মুনাইয়ার

লেখক- ইউসুফ মুনাইয়ার: ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের একজন সিনিয়র নন-রেসিডেন্ট ফেলো। এর আগে তিনি ইউএস ক্যাম্পেইন ফর প্যালেস্টিনিয়ান রাইটসের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আলজাজিরা থেকে অনূদিত।