ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত সরকারের হাতে তেমন কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, এফএসআরইউ সচল না থাকায় বিদ্যমান গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে নতুন করে দ্রুত গ্যাস উত্তোলন করাও সম্ভব নয়। ফলে বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ শেষ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, সংকটের মধ্যে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে লোডশেডিং যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা এবং শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
মন্ত্রী জানান, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। এ জন্য পুরো সিস্টেম প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হতে পারে। ফলে ওই সময়ে সাময়িকভাবে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০২৯ সালকে লক্ষ্য করে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। এরই মধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিল্প খাতে গ্যাস সংকট কমাতে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০টি ট্রাক পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কনটেইনারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
এদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ‘গরিবের টেসলা’ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ রাতে অবৈধ সংযোগে চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় রাত ১২টার দিকে চলে যাচ্ছে এবং মোট চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে সরকারি কর্মচারীরা বিভিন্ন জায়গায় হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
তেল নিয়ে গুজব না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তেল ব্যবসার একচেটিয়া সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট শর্ত মেনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তেল আমদানির সুযোগ তৈরিতে নতুন নীতি করা হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। সৌরবিদ্যুতের সোলার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং এ খাতে পাঁচ বছরের করছাড় দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডি। সংস্থাটির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির বলেন, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশের জ্বালানি সংকট গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশের ৮৪ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
সংকট মোকাবিলায় দ্রুত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সুপারিশ করে সিপিডি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহ এবং জরুরি ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাময়িক পদক্ষেপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অন্তত ১০ বছরের সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি এবং সুশাসন নিশ্চিত না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সংলাপে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার, সিস্টেম লস কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন।
মন্ত্রী জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 























