ঢাকা , শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::

গোপন ট্রেন, নকল অফিস:পুতিনকে আড়ালে রাখার রাশিয়ার নতুন কৌশল

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:৩৬:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্কে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে গোপনে অন্য বিমানে ওঠার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্টের অবস্থান ও গতিবিধি গোপন রাখতে রাশিয়ার ব্যবস্থা আরও জটিল ও কঠোর বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কোথায় অবস্থান করছেন, তা জানতে সাংবাদিকদের কখনো কখনো তাঁর কার্যালয়ের গাছপালার অবস্থাও বিশ্লেষণ করতে হয়েছে।

শুকিয়ে যাওয়া গাছেও মিলছে সূত্র

চলতি বছরের শুরুতে ক্রেমলিনে পুতিনের বৈঠকের টেলিভিশন ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। বৈঠকের ভিডিওতে থাকা গাছের পাতার অবস্থা ঘোষিত সময়ের সঙ্গে মিলছিল না। পাতার শুকিয়ে যাওয়ার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, কিছু ভিডিও ঘোষিত তারিখে ধারণ করা হয়নি।

এমনকি বৈঠকগুলোর প্রকৃত সময় ও ক্রমও ক্রেমলিনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলছে না বলে দাবি করা হয়।

রুশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন ট্রাম্পের গোপন বিমান পরিবর্তনের ঘটনাকে রাশিয়ার ব্যবস্থার তুলনায় ‘ছেলেখেলা’ বলে মন্তব্য করেছেন। নির্বাসিত রুশ সাংবাদিক ফরিদা রুস্তামোভাও বলেন, পুতিনের অবস্থান নিয়ে সরকারি তথ্যের অসঙ্গতি রুশ সাংবাদিকদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়।

একই রকম অফিস, গোপন ট্রেন

পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু বৈঠকের ভিডিও বিলম্বে প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট একাধিক বাসভবনে প্রায় একই ধরনের কার্যালয় ব্যবহার করেন। ফলে ভিডিও দেখে তিনি আসলে কোথায় অবস্থান করছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে দরজার হাতল, দেয়ালের জোড়া লাগার রেখা কিংবা অন্যান্য ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সাংবাদিকেরা কখনো কখনো ভিডিওর স্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।

পুতিনের যাতায়াত ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে কঠোর গোপনীয়তায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত প্রেসিডেন্ট ট্রেন ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে। স্যাটেলাইট ছবি ও সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর কয়েকটি বাসভবনের কাছে গোপন রেলস্টেশন ও রেলপথের অস্তিত্বের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

সাবেক এক রুশ নিরাপত্তা কর্মকর্তার দাবি, নজরদারি এড়াতে পুতিন ট্রেন ব্যবহার করতেন। ফাঁস হওয়া কিছু নথিতে সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো দেখতে একটি সাঁজোয়া প্রেসিডেন্ট ট্রেনের উল্লেখ রয়েছে। এতে জিম, স্পা ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

বিলম্বিত ভিডিওতে তৈরি হয় ‘পুতিনের উপস্থিতি’

ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ রয়েছে—পুতিনের বৈঠকের ভিডিও ধারণের কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর তা প্রকাশ করা হয়। পরে এসব ফুটেজকে সাম্প্রতিক ঘটনা বা সরাসরি সম্প্রচারিত বৈঠক হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে দাবি করেন রুশ সাংবাদিকেরা।

তারা এমন বিলম্বিত ফুটেজকে ‘কনসার্ভি’ বা ‘ক্যানড গুডস’ নামে অভিহিত করেন।

কখনো কখনো ভিডিওতেই ধরা পড়ে অসঙ্গতি। বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এমন কোনো ঘটনার উল্লেখ করেন, যা ভিডিও ধারণের সময়ের আগেই ঘটে গেছে। আবার পোশাক বা চুলের ধরনও অন্য সময়ের ফুটেজের সঙ্গে মিলে যায়।

সাংবাদিক মিখাইল রুবিনের মতে, ক্রেমলিন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, জনসমক্ষে পুতিনের যে ভাবমূর্তি দেখা যায়, তার বড় একটি অংশই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও কঠোর নিরাপত্তা

করোনাভাইরাস মহামারির সময় পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে কর্মকর্তাদের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হতো।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হওয়ায় পুতিনের অবস্থান গোপন রাখার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

এমনকি তাঁর গাড়িবহর নিয়েও রয়েছে নানা রহস্য। রাজধানীর রাস্তায় দ্রুতগতিতে চলা কিছু গাড়িবহর পুতিনের প্রকৃত বহর না হয়ে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য ব্যবহৃত ডামি বহর হতে পারে বলেও ধারণা করা হয়।

সব মিলিয়ে, পুতিনের অবস্থান ও গতিবিধি গোপন রাখতে রাশিয়ার এই বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কৌশল শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নয়; বরং তথ্য নিয়ন্ত্রণ, বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং নিখুঁত পরিকল্পনার সমন্বয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়: নাছির

গোপন ট্রেন, নকল অফিস:পুতিনকে আড়ালে রাখার রাশিয়ার নতুন কৌশল

আপডেট সময় ১১:৩৬:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্কে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে গোপনে অন্য বিমানে ওঠার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্টের অবস্থান ও গতিবিধি গোপন রাখতে রাশিয়ার ব্যবস্থা আরও জটিল ও কঠোর বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কোথায় অবস্থান করছেন, তা জানতে সাংবাদিকদের কখনো কখনো তাঁর কার্যালয়ের গাছপালার অবস্থাও বিশ্লেষণ করতে হয়েছে।

শুকিয়ে যাওয়া গাছেও মিলছে সূত্র

চলতি বছরের শুরুতে ক্রেমলিনে পুতিনের বৈঠকের টেলিভিশন ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। বৈঠকের ভিডিওতে থাকা গাছের পাতার অবস্থা ঘোষিত সময়ের সঙ্গে মিলছিল না। পাতার শুকিয়ে যাওয়ার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, কিছু ভিডিও ঘোষিত তারিখে ধারণ করা হয়নি।

এমনকি বৈঠকগুলোর প্রকৃত সময় ও ক্রমও ক্রেমলিনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলছে না বলে দাবি করা হয়।

রুশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন ট্রাম্পের গোপন বিমান পরিবর্তনের ঘটনাকে রাশিয়ার ব্যবস্থার তুলনায় ‘ছেলেখেলা’ বলে মন্তব্য করেছেন। নির্বাসিত রুশ সাংবাদিক ফরিদা রুস্তামোভাও বলেন, পুতিনের অবস্থান নিয়ে সরকারি তথ্যের অসঙ্গতি রুশ সাংবাদিকদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়।

একই রকম অফিস, গোপন ট্রেন

পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু বৈঠকের ভিডিও বিলম্বে প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট একাধিক বাসভবনে প্রায় একই ধরনের কার্যালয় ব্যবহার করেন। ফলে ভিডিও দেখে তিনি আসলে কোথায় অবস্থান করছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে দরজার হাতল, দেয়ালের জোড়া লাগার রেখা কিংবা অন্যান্য ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সাংবাদিকেরা কখনো কখনো ভিডিওর স্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।

পুতিনের যাতায়াত ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে কঠোর গোপনীয়তায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত প্রেসিডেন্ট ট্রেন ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে। স্যাটেলাইট ছবি ও সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর কয়েকটি বাসভবনের কাছে গোপন রেলস্টেশন ও রেলপথের অস্তিত্বের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

সাবেক এক রুশ নিরাপত্তা কর্মকর্তার দাবি, নজরদারি এড়াতে পুতিন ট্রেন ব্যবহার করতেন। ফাঁস হওয়া কিছু নথিতে সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো দেখতে একটি সাঁজোয়া প্রেসিডেন্ট ট্রেনের উল্লেখ রয়েছে। এতে জিম, স্পা ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

বিলম্বিত ভিডিওতে তৈরি হয় ‘পুতিনের উপস্থিতি’

ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ রয়েছে—পুতিনের বৈঠকের ভিডিও ধারণের কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর তা প্রকাশ করা হয়। পরে এসব ফুটেজকে সাম্প্রতিক ঘটনা বা সরাসরি সম্প্রচারিত বৈঠক হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে দাবি করেন রুশ সাংবাদিকেরা।

তারা এমন বিলম্বিত ফুটেজকে ‘কনসার্ভি’ বা ‘ক্যানড গুডস’ নামে অভিহিত করেন।

কখনো কখনো ভিডিওতেই ধরা পড়ে অসঙ্গতি। বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এমন কোনো ঘটনার উল্লেখ করেন, যা ভিডিও ধারণের সময়ের আগেই ঘটে গেছে। আবার পোশাক বা চুলের ধরনও অন্য সময়ের ফুটেজের সঙ্গে মিলে যায়।

সাংবাদিক মিখাইল রুবিনের মতে, ক্রেমলিন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, জনসমক্ষে পুতিনের যে ভাবমূর্তি দেখা যায়, তার বড় একটি অংশই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও কঠোর নিরাপত্তা

করোনাভাইরাস মহামারির সময় পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে কর্মকর্তাদের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হতো।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হওয়ায় পুতিনের অবস্থান গোপন রাখার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

এমনকি তাঁর গাড়িবহর নিয়েও রয়েছে নানা রহস্য। রাজধানীর রাস্তায় দ্রুতগতিতে চলা কিছু গাড়িবহর পুতিনের প্রকৃত বহর না হয়ে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য ব্যবহৃত ডামি বহর হতে পারে বলেও ধারণা করা হয়।

সব মিলিয়ে, পুতিনের অবস্থান ও গতিবিধি গোপন রাখতে রাশিয়ার এই বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কৌশল শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নয়; বরং তথ্য নিয়ন্ত্রণ, বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং নিখুঁত পরিকল্পনার সমন্বয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।