নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধসের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে টানা নয় দিন আটকে থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরেছেন সঞ্জয় সাহ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আরও এক সপ্তাহ। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) নিজ গ্রামে ফেরার পর স্বজনদের উচ্ছ্বাস-আনন্দের পাশাপাশি ছুঁয়ে যায় স্বজন হারানোর বেদনাও।
৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় সাহ নেপালের ভারত সীমান্তবর্তী তিলাঠি কোইলাদি গ্রামে পৌঁছে বলেন, ‘টানেলের ভেতর আটকে ছিলাম। হাসপাতালের কক্ষেও নিজেকে বন্দি মনে হচ্ছিল। এখন গ্রামে এসে অবশেষে মুক্ত মনে হচ্ছে।’
গত মাসে চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমালয়ের একটি হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা ও কাদার স্রোত নেমে আসে। এতে পাহাড়ি উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। নেপালজুড়ে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫ হাজার ১৩০ জন। হিমবাহ ধস ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৯০০ কর্মী এখনো নিখোঁজ। সঞ্জয় ছিলেন আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মেকানিক্যাল ফোরম্যান। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে পাহাড়ের গভীরে থাকা টানেলে আটকে পড়া মাত্র তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাদের একজন সঞ্জয়।
উদ্ধারের আগ পর্যন্ত অন্ধকার টানেলের ভেতরে পাহাড়ের গা বেয়ে চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেই বেঁচে ছিলেন তিনি। পরে উদ্ধারকারীরা তাকে খুঁজে বের করেন। রাজধানী কাঠমান্ডুর হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে শুক্রবার ছাড়া পান সঞ্জয়। পরদিন বাসে করে রাতভর যাত্রা করে রবিবার নিজ গ্রামে পৌঁছান তিনি।
বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন
সঞ্জয়কে বরণ করতে রবিবার তিলাঠি কোইলাদি গ্রামে প্রায় ৬০ জন মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন নারী। বাবা-মা, চাচা, স্ত্রী ও মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা ঐতিহ্যবাহী রীতিতে তাকে স্বাগত জানান। এ সময় শুদ্ধিকরণের অংশ হিসেবে তার পা ধুয়ে দেওয়া হয়।
এরপর মা তার কপালে গোলাপি সিঁদুরের টিকা পরিয়ে দেন। মায়ের সামনে মাথা নত করেন সঞ্জয়। পরে মা-ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ‘আমার ছেলে!’—বলে সঞ্জয়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন তার মা এবং গালে চুমু দেন। এই আবেগঘন দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত নারীদের অনেকেই শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে থাকেন।
তবে সঞ্জয়ের ফিরে আসার আনন্দের মধ্যেও শোক কাটেনি গ্রামটিতে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত অনেক স্বজনের এখনো কোনো খোঁজ পাননি গ্রামের বাসিন্দারা। সঞ্জয় বলেন, তার গ্রামের আরও কয়েকজন এখনো নিখোঁজ। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় একটি পরিবার তাকে ফোন করে অন্য একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত নিখোঁজ স্বজনের বিষয়ে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। এখন কিছুদিন গ্রামেই পরিবারের সঙ্গে থাকতে চান সঞ্জয়। তিনি বলেন, ‘আমি কিছুদিন গ্রামেই থাকব। সবার সঙ্গে দেখা করতে চাই। তবে আবার দায়িত্বে ফিরতে বলা হলে আমি ফিরে যাব।’

ডেস্ক রিপোর্ট 


















