ঢাকা , রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে ‘অনুকূল পরিবেশ’ চায় ঢাকা আকরাম-টেটের পরই ইতিহাসের সেরা হাসান মাহমুদ বগুড়া নয়, ও বাংলাদেশের ছেলে— ম্যাচ জয়ের পর তানজিদকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী ভিসার মেয়াদ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরতে হবে: আলবার্টার প্রিমিয়ার সারা দেশে বসছে ১০ লাখ এআই ক্যামেরা, ব্যয় ১৩০০ কোটি টাকা লাখাইয়ে জমি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫ গাছ কেটে পাখির বাসা-ডিম নষ্টের মামলায় গ্রেপ্তার ১ সংসদ সদস্য আমির হামজার ওপর হামলা, থানায় অভিযোগ দায়ের ফ্যাসিস্ট সরকার বিদ্যুৎ খাতকে চুরির ভান্ডারে পরিণত করেছিল: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সৌদির অর্থ-তুরস্কের প্রযুক্তি-পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের

সৌদির অর্থ-তুরস্কের প্রযুক্তি-পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১২:৩৬:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

এই চুক্তি ঘিরে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে। রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কি সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এনে দেবে? তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি কি পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হবে? আর এই চুক্তির মাধ্যমে কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনও শক্তিশালী জোটের উত্থান ঘটছে? ভারতে মহাসড়কে রহস্যময় সিসিটিভি: সেনাবাহিনীর চলাচলে গোপন নজরদারি, ভিডিও চলে যায় পাকিস্তানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে দুইভাবে দেখা যায়। চুক্তির সমালোচকদের মতে, এই প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তব গুরুত্ব খুব বেশি নয়। কারণ সাধারণত সামরিক জোট গড়ে ওঠে অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই চুক্তিতে তেমন কোনও অভিন্ন শত্রুর বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি বলেন, ‘পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের শত্রু এক নয়। এটি সামরিক জোটের চেয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিই বেশি। এর ফলে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান ও যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে কেউ কেউ যে এটিকেমুসলিম ন্যাটোবলছেন, এটি তা হবে না।হাক্কানির মতে, চুক্তিটিবাস্তবের চেয়ে প্রতীকী বেশিতবে চুক্তিটিকে দেখার আরেকটি দিকও আছে। তিন দেশের কী নেই, সেটির দিকে না তাকিয়ে তারা একে অপরকে কী দিতে পারে, সেটি দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সৌদি আরব এই জোটে নিয়ে আসছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা। দেশটির বিশাল তেলসম্পদ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মিত্রদের সহায়তা করার মতো অর্থ জোগানের সুযোগ দেয়।

তুরস্কের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটি নিয়ে আসছে সামরিক দক্ষতা এবং ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রতিরক্ষা শিল্প। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক বহু বছর ধরে নিজেদের অস্ত্রশিল্প গড়ে তুলেছে। এখন দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র রপ্তানি করে। রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এসব ড্রোন ভূমিকা রাখে এবং আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে। অন্যদিকে পাকিস্তান এমন একটি সক্ষমতা নিয়ে এসেছে, যা অন্য দুই দেশের নেই। আর তা হলোবিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পারমাণবিক অস্ত্র।

এই পারমাণবিক সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত জোটে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব দিচ্ছে অর্থ, তুরস্ক দিচ্ছে প্রযুক্তি আর পাকিস্তান দিচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক্ষমতা। এই পারমাণবিক ছাতাই জোটটিকে এমন কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে, যা রিয়াদ বা আঙ্কারা একা অর্জন করতে পারত না। চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনও একটি সদস্য দেশে হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে দেশ তিনটির কৌশলগত স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি হুবহু পালন করা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্য কোনও সদস্য দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিপুল ঝুঁকি বিবেচনা করেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ বা অন্যান্য সহায়তা দেয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় তুরস্কের সামরিক সদস্যরা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। একই সময়ে আঙ্কারা পাকিস্তানকে বায়রাকতার টিবি২সহ শত শত ড্রোন সরবরাহ করেছে বলেও খবর রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামান মনে করেন, এই জোটে তুরস্কের ভূমিকার সামরিক প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান রামান বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে ভারতের জন্য ঝুঁকি হলো, তুরস্ক ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেও তারা অনেক বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

তার মতে, ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত অস্ত্রব্যবস্থা ও দক্ষতা ক্রমেই পাকিস্তানে আসতে দেখা যাবে। আগামী এক বছরে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নে তুরস্ক কীভাবে আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে, সেটি নজরে রাখতে হবে।তুরস্ক ভারতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করলে সৌদি আরবের বিষয়টি আরও ভিন্ন ও জটিল। আঙ্কারার বিপরীতে রিয়াদের ভারত ও পাকিস্তানদুই দেশের সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। সৌদি আরব ভারতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। জ্বালানি থেকে প্রযুক্তিবিভিন্ন খাতে দেশটি ভারতে ১০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ক্রেতাও ভারত। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হচ্ছে ভারত। একইভাবে সৌদি আরবে বসবাস ও কাজ করা প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয়ও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে রিয়াদকে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাকারীদের উদ্বেগ হলো, ভারতে সৌদি আরবের বড় বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ভারতপাকিস্তান সংকটের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে। কোনও এক পক্ষের সরাসরি পাশে দাঁড়ানোর বদলে রিয়াদ দ্রুত সংঘাত থামানোর চেষ্টা করতে পারে, যাতে পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ না করে। রামান বলেন, ‘শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আমাদের জয়ী হতে হবে। এর জন্য বাহিনী প্রস্তুত করা, হামলা চালানো এবং বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরি করতে সময় দরকার।

তিনি আরও বলেন, ‘(পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত বাঁধলে) সৌদি আরব হয়তো যত দ্রুত সম্ভব সংঘাত থামাতে চাইবে। একটি কারণ হলো, তারা চায় না পাকিস্তান বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ুক। দ্বিতীয় কারণ, ভারতে তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে।এই ভারসাম্যের কারণেই হয়তো ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে এতটা নজর রাখছে। গত ছয় মাসে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তিনবার সৌদি আরব সফর করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এসব সফরের বড় অংশের আলোচনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রইরান সংঘাতের প্রভাব। তবে এসব আলোচনায় মক্কা চুক্তি যে উঠে আসেনিএমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের চুক্তিটিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, তা হলোআসলে কাকে লক্ষ্য করে এই প্রতিরক্ষা জোট করা হলো? ভারত এই চুক্তির সরাসরি টার্গেট নয়। তবে কৌশলগতভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে কোনও সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্রের তেমন প্রাসঙ্গিকতা নেই। ইরানও একটি সম্ভাব্য পক্ষ হতে পারে। তবে তিন দেশের কেউই তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না। আর তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, কোনও নির্দিষ্ট শত্রুকে লক্ষ্য করে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই চুক্তিকে দেখা উচিত।

সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস চুক্তিটিকে উপসাগরীয় দেশগুলোরযুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতা হারানোর ঝুঁকি কমানোর চেষ্টাহিসেবে বর্ণনা করেছে। আঞ্চলিক অনেক পর্যবেক্ষকও এমনটাই মনে করেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে চাইছে না। আর এই উদ্বেগ থেকেই এই চুক্তির সূত্রপাত। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলভাবে চলে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের বদলে যাওয়া অগ্রাধিকার মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশকে নিজেদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য করেছে।

এই দিক থেকে দেখলে, চুক্তিটি যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রামান বলেন, ‘সৌদি আরব নিরাপত্তা চেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতার নিচে থাকা দেশগুলো আফগানিস্তানের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেযুক্তরাষ্ট্র যদি একদিন হঠাৎ চলে যেতে পারে, তাহলে আমাদের কী হবে?’

কিছু বিশ্লেষক আবার মনে করেন, এই জোটের পেছনে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ইসরায়েলতুরস্কের বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হিসাব বদলে দিয়েছে। রামানের ভাষায়, ‘এটি ইরানবিরোধী জোটের চেয়ে ইসরায়েলবিরোধী জোট বেশি এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য এর গুরুতর প্রভাব রয়েছে।

এখান থেকে আরেকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন সামনে আসেপাকিস্তান কি ভবিষ্যতে তার পারমাণবিক প্রযুক্তির কিছু অংশ মিত্রদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে? এমনটা ঘটবে বলে এখনই মনে হয় না। তবে কিছু কৌশলবিদ মনে করেন, সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকায় বিষয়টি আলোচনায় আসছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে ‘অনুকূল পরিবেশ’ চায় ঢাকা

সৌদির অর্থ-তুরস্কের প্রযুক্তি-পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের

আপডেট সময় ১২:৩৬:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

এই চুক্তি ঘিরে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে। রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কি সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এনে দেবে? তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি কি পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হবে? আর এই চুক্তির মাধ্যমে কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনও শক্তিশালী জোটের উত্থান ঘটছে? ভারতে মহাসড়কে রহস্যময় সিসিটিভি: সেনাবাহিনীর চলাচলে গোপন নজরদারি, ভিডিও চলে যায় পাকিস্তানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে দুইভাবে দেখা যায়। চুক্তির সমালোচকদের মতে, এই প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তব গুরুত্ব খুব বেশি নয়। কারণ সাধারণত সামরিক জোট গড়ে ওঠে অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই চুক্তিতে তেমন কোনও অভিন্ন শত্রুর বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি বলেন, ‘পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের শত্রু এক নয়। এটি সামরিক জোটের চেয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিই বেশি। এর ফলে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান ও যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে কেউ কেউ যে এটিকেমুসলিম ন্যাটোবলছেন, এটি তা হবে না।হাক্কানির মতে, চুক্তিটিবাস্তবের চেয়ে প্রতীকী বেশিতবে চুক্তিটিকে দেখার আরেকটি দিকও আছে। তিন দেশের কী নেই, সেটির দিকে না তাকিয়ে তারা একে অপরকে কী দিতে পারে, সেটি দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সৌদি আরব এই জোটে নিয়ে আসছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা। দেশটির বিশাল তেলসম্পদ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মিত্রদের সহায়তা করার মতো অর্থ জোগানের সুযোগ দেয়।

তুরস্কের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটি নিয়ে আসছে সামরিক দক্ষতা এবং ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রতিরক্ষা শিল্প। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক বহু বছর ধরে নিজেদের অস্ত্রশিল্প গড়ে তুলেছে। এখন দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র রপ্তানি করে। রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এসব ড্রোন ভূমিকা রাখে এবং আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে। অন্যদিকে পাকিস্তান এমন একটি সক্ষমতা নিয়ে এসেছে, যা অন্য দুই দেশের নেই। আর তা হলোবিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পারমাণবিক অস্ত্র।

এই পারমাণবিক সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত জোটে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব দিচ্ছে অর্থ, তুরস্ক দিচ্ছে প্রযুক্তি আর পাকিস্তান দিচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক্ষমতা। এই পারমাণবিক ছাতাই জোটটিকে এমন কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে, যা রিয়াদ বা আঙ্কারা একা অর্জন করতে পারত না। চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনও একটি সদস্য দেশে হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে দেশ তিনটির কৌশলগত স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি হুবহু পালন করা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্য কোনও সদস্য দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিপুল ঝুঁকি বিবেচনা করেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ বা অন্যান্য সহায়তা দেয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় তুরস্কের সামরিক সদস্যরা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। একই সময়ে আঙ্কারা পাকিস্তানকে বায়রাকতার টিবি২সহ শত শত ড্রোন সরবরাহ করেছে বলেও খবর রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামান মনে করেন, এই জোটে তুরস্কের ভূমিকার সামরিক প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান রামান বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে ভারতের জন্য ঝুঁকি হলো, তুরস্ক ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেও তারা অনেক বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

তার মতে, ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত অস্ত্রব্যবস্থা ও দক্ষতা ক্রমেই পাকিস্তানে আসতে দেখা যাবে। আগামী এক বছরে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নে তুরস্ক কীভাবে আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে, সেটি নজরে রাখতে হবে।তুরস্ক ভারতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করলে সৌদি আরবের বিষয়টি আরও ভিন্ন ও জটিল। আঙ্কারার বিপরীতে রিয়াদের ভারত ও পাকিস্তানদুই দেশের সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। সৌদি আরব ভারতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। জ্বালানি থেকে প্রযুক্তিবিভিন্ন খাতে দেশটি ভারতে ১০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ক্রেতাও ভারত। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হচ্ছে ভারত। একইভাবে সৌদি আরবে বসবাস ও কাজ করা প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয়ও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে রিয়াদকে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাকারীদের উদ্বেগ হলো, ভারতে সৌদি আরবের বড় বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ভারতপাকিস্তান সংকটের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে। কোনও এক পক্ষের সরাসরি পাশে দাঁড়ানোর বদলে রিয়াদ দ্রুত সংঘাত থামানোর চেষ্টা করতে পারে, যাতে পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ না করে। রামান বলেন, ‘শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আমাদের জয়ী হতে হবে। এর জন্য বাহিনী প্রস্তুত করা, হামলা চালানো এবং বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরি করতে সময় দরকার।

তিনি আরও বলেন, ‘(পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত বাঁধলে) সৌদি আরব হয়তো যত দ্রুত সম্ভব সংঘাত থামাতে চাইবে। একটি কারণ হলো, তারা চায় না পাকিস্তান বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ুক। দ্বিতীয় কারণ, ভারতে তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে।এই ভারসাম্যের কারণেই হয়তো ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে এতটা নজর রাখছে। গত ছয় মাসে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তিনবার সৌদি আরব সফর করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এসব সফরের বড় অংশের আলোচনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রইরান সংঘাতের প্রভাব। তবে এসব আলোচনায় মক্কা চুক্তি যে উঠে আসেনিএমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের চুক্তিটিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, তা হলোআসলে কাকে লক্ষ্য করে এই প্রতিরক্ষা জোট করা হলো? ভারত এই চুক্তির সরাসরি টার্গেট নয়। তবে কৌশলগতভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে কোনও সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্রের তেমন প্রাসঙ্গিকতা নেই। ইরানও একটি সম্ভাব্য পক্ষ হতে পারে। তবে তিন দেশের কেউই তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না। আর তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, কোনও নির্দিষ্ট শত্রুকে লক্ষ্য করে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই চুক্তিকে দেখা উচিত।

সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস চুক্তিটিকে উপসাগরীয় দেশগুলোরযুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতা হারানোর ঝুঁকি কমানোর চেষ্টাহিসেবে বর্ণনা করেছে। আঞ্চলিক অনেক পর্যবেক্ষকও এমনটাই মনে করেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে চাইছে না। আর এই উদ্বেগ থেকেই এই চুক্তির সূত্রপাত। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলভাবে চলে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের বদলে যাওয়া অগ্রাধিকার মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশকে নিজেদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য করেছে।

এই দিক থেকে দেখলে, চুক্তিটি যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রামান বলেন, ‘সৌদি আরব নিরাপত্তা চেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতার নিচে থাকা দেশগুলো আফগানিস্তানের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেযুক্তরাষ্ট্র যদি একদিন হঠাৎ চলে যেতে পারে, তাহলে আমাদের কী হবে?’

কিছু বিশ্লেষক আবার মনে করেন, এই জোটের পেছনে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ইসরায়েলতুরস্কের বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হিসাব বদলে দিয়েছে। রামানের ভাষায়, ‘এটি ইরানবিরোধী জোটের চেয়ে ইসরায়েলবিরোধী জোট বেশি এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য এর গুরুতর প্রভাব রয়েছে।

এখান থেকে আরেকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন সামনে আসেপাকিস্তান কি ভবিষ্যতে তার পারমাণবিক প্রযুক্তির কিছু অংশ মিত্রদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে? এমনটা ঘটবে বলে এখনই মনে হয় না। তবে কিছু কৌশলবিদ মনে করেন, সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকায় বিষয়টি আলোচনায় আসছে।