ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন তিনটি কূপ খননের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৩১ নম্বর কূপটি দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ। উচ্চচাপ ও উচ্চতাপের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা হবে।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নতুন তিনটি কূপ থেকে আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ৩১ নম্বর কূপের খনন চলছে। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কূপটির খনন শুরু হয়। ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৬৩৭ মিটার পর্যন্ত খনন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরেই খননকাজ শেষ করে কূপটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার আশা করছে বিজিএফসিএল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিতাসের প্রচলিত গ্যাস অনুসন্ধানের সীমা পেরিয়ে আরও গভীরে গ্যাসের মজুদ রয়েছে কি না, ৩১ নম্বর কূপের মাধ্যমে তা জানা যাবে। সিসমিক জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে ওই গভীর স্তরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (২ টিসিএফ) গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে পুরোনো কূপগুলোতে গ্যাসের মজুদ ও চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও ধীরে ধীরে কমছে।
এ অবস্থায় তিতাসের উৎপাদন বাড়াতে ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ খননের প্রকল্প নিয়েছে বিজিএফসিএল। এর মধ্যে ২৯ ও ৩১ নম্বর কূপের খননকাজ চলছে। ২৯ নম্বর কূপের কাজ শেষ হলে একই রিগ ব্যবহার করে ৩০ নম্বর কূপের খনন শুরু করা হবে।
গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, ‘খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে গড়ে এই তিনটি কূপ থেকে ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘২৯ নম্বর কূপে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮৬০ মিটার খনন হয়েছে। কোনো কারিগরি জটিলতা না হলে আগামী দুই মাসের মধ্যে এর কাজ শেষ হতে পারে। এরপর ৩০ নম্বর কূপের খনন শুরু হবে। আর ৩১ নম্বর কূপের কাজ শেষ করতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। কারণ এটি অনেক গভীর এবং উচ্চচাপ ও উচ্চতাপের স্তর অতিক্রম করে খনন করতে হচ্ছে।’
তিনটি কূপের কাজ আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে শেষ করার প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।
৩১ নম্বর কূপের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বাংলাদেশে তিতাসে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। কিন্তু এর নিচে কী আছে, সে বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই। ১৯৬৯ সালে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় একটি উচ্চচাপের জোন পাওয়া যাওয়ার পর আর গভীরে যাওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে জ্বালানি সংকট রয়েছে। এ কারণে তিতাসের আরও গভীর স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি আছে কি না, তা শনাক্ত করা জরুরি। এই কূপের বিশেষত্ব হলো এটি একটি গভীর অনুসন্ধান কূপ। উচ্চচাপ ও উচ্চতাপের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা হবে। এর মাধ্যমে তিতাসের ৩ হাজার ৭০০ মিটারের নিচে গ্যাসের উপস্থিতি আছে কি না, তা জানা যাবে।’
বিজিএফসিএল সূত্র জানায়, শুধু তিতাস নয়, কোম্পানির অধীন অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কূপে ওয়ার্কওভার করার পাশাপাশি নতুন কূপ খননের প্রকল্পও নেওয়া হচ্ছে।
বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুল জলিল প্রামাণিক বলেন, ‘আশা করছি আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই তিনটি কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করতে পারব। চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ গ্যাস খুব বেশি নয়, তবে দেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘এই গ্যাসের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। দেশীয় উৎপাদন কোম্পানি থেকে সরকার যে দামে গ্যাস পাচ্ছে, এলএনজি আমদানি করতে তার তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে। ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। তিনটি কূপ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে সমপরিমাণ গ্যাস বাইরে থেকে আমদানি করতে হবে না।’
উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ১৯৬৮ সালে এ গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম প্রধান গ্যাস সরবরাহকারী ক্ষেত্র হিসেবে তিতাস জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















