ঢাকা , রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির গরু কাটতে বিমানে ঢাকায় আসবেন কসাইরা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:২৫:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

নীলফামারীর সৈয়দপুরের শতাধিক কসাই এবারও পশু কাটার জন্য রাজধানী ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ট্রেন ও বাসে করে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কসাই ঢাকা পৌঁছেছেন। এদিকে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থাকায় কেউ কেউ বিমানের টিকিট কেটেছেন ঈদের এক দুদিন আগে দ্রুত ঢাকায় পা রাখতে।

 

এভাবে পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই সৈয়দপুরের মাংসহাটিগুলোতে শুরু হয় অন্যরকম ব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, মাংস টুকরো ও ভাগ-বাটোয়ারার কাজে দক্ষ সৈয়দপুরের শতাধিক কসাই এবারও রাজধানী ঢাকামুখী হচ্ছেন।

 

ঈদের তিন দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির গরু কাটার কাজ করবেন তারা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই কয়েকদিনেই সৈয়দপুরের কসাইরা সম্মিলিতভাবে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় করবেন।

 

সৈয়দপুর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাদিম কোরাইশি, যিনি এলাকাজুড়ে ‘ছোটু নাদিম’ নামে পরিচিত, তিনি বলেন, এবার ঈদের আগের দিন ১০ জনের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় যাচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যে টিকিটও কাটা হয়েছে। দলটিকে তিন ভাগে ভাগ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাপ-দাদারাও ঢাকায় গিয়ে কোরবানির কাজ করতেন। পশু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া অক্ষত রেখে ছাড়ানো, মাংস পিস করা ও হাড় আলাদা করা সব কাজেই দক্ষতা লাগে। ছোটবেলা থেকেই আমরা এসব শিখে বড় হয়েছি।

 

সৈয়দপুর গোলাহাটের কসাই সুলতান ইতিমধ্যে বিমানে করে ঢাকায় চলে গিয়েছেন। তারা বলেন, মাসখানেক আগেই ঢাকার অনেক পরিবার বুকিং দিয়ে রাখেন। ঢাকার মোহাম্মদপুরে আমার আত্মীয় থাকায় আমি গত ২১ মে তিনজনের একটি দল নিয়ে বিমানে করে ঢাকায় চলে এসেছি। হাজারে ২০০ টাকা রেটে চুক্তি হয়। অর্থাৎ এক লাখ টাকার গরু কাটলে কসাই পান প্রায় ২০ হাজার টাকা। আয় যেহেতু হবে তাই বিমানে যাওয়া বলে জানান তিনি।

 

সৈয়দপুর পৌর মাংসহাটির কসাই ফজলে রাব্বি, নওশাদ আলী, মিন্টু ও খয়রাত হোসেনসহ আরও অনেকে ইতোমধ্যে বিমানের টিকিট বুকিং করেছেন। তারা জানান, ঈদের আগে ঢাকাগামী ফ্লাইটে যাত্রী কম থাকায় অনেক সময় ভাড়া তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। সেই সুযোগেই বিমানে যাওয়া।

 

কলিম মোড় এলাকার কসাই মোস্তাকিম, ইলিয়াস ও জাম্বুর ভাষ্য, সাধারণত চারজনের একটি দল গঠন করে তারা কাজ করেন। ঈদের তিন দিনে একটি দল অন্তত ১২ থেকে ১৬টি গরু জবাই ও মাংস কাটার কাজ করতে পারে। এতে প্রতিটি দলের আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। মোস্তাকিম কসাই বলেন, আগে বাবা ঢাকায় যেতেন। এখন আমি যাচ্ছি। গুলশান-বনানীর অনেক বাসায় নিয়মিত কাজ করি। অনেকে আমাদের মোবাইল নম্বর আগেই সংরক্ষণ করে রাখেন।

 

ছোটু নাদিমের মতে, কসাইয়ের কাজ শুধু শক্তির নয়, এটি একধরনের শিল্পও। নিখুঁতভাবে পশু জবাই, চামড়া অক্ষত রাখা কিংবা সুন্দরভাবে মাংস ভাগ করার জন্য অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রয়োজন। তিনি জানান, একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা’র বাসাতেও কোরবানির গরু জবাইয়ের কাজ করেছেন তিনি।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, সৈয়দপুরের কসাইদের বড় একটি অংশ বিহারি সম্প্রদায়ের। বংশপরম্পরায় তারা মাংস ব্যবসা ও পশু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত। ফলে ঢাকার অনেক পরিবার এখন নাম ধরেই সৈয়দপুরের কসাইদের ডাকেন।

 

রাজধানীর মিরপুরে বসবাসকারীরা জানান, চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন সৈয়দপুরে থাকায় এখানকার অনেক কসাইয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। এবারও ঈদের দিন সকালে বাসায় গিয়ে গরু কাটার জন্য সৈয়দপুরের এক কসাইয়ের সঙ্গে আগেই চুক্তি করেছেন তিনি।

 

কসাই মিন্টুর কণ্ঠে ধরা পড়ে ঈদের অন্য বাবতা। তিনি বলেন, সবাই পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়। কিন্তু আমরা বাড়তি আয়ের আশায় ঢাকায় যাই। সৈয়দপুরে যেখানে এক লাখ টাকার গরু কাটলে ৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়, ঢাকায় একই কাজের জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মেলে।

 

ঈদ শেষে আবার কেউ বিমানে, কেউ ট্রেনে কিংবা বাসে করে ফিরে আসবেন সৈয়দপুরে। তারপর শুরু হবে পুরোনো জীবনের ব্যস্ততা। তবে কোরবানির ঈদ এলেই আবারও ঢাকামুখী হবে এই দক্ষ কসাইদের দল।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

কোরবানির গরু কাটতে বিমানে ঢাকায় আসবেন কসাইরা

আপডেট সময় ১০:২৫:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

নীলফামারীর সৈয়দপুরের শতাধিক কসাই এবারও পশু কাটার জন্য রাজধানী ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ট্রেন ও বাসে করে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কসাই ঢাকা পৌঁছেছেন। এদিকে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থাকায় কেউ কেউ বিমানের টিকিট কেটেছেন ঈদের এক দুদিন আগে দ্রুত ঢাকায় পা রাখতে।

 

এভাবে পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই সৈয়দপুরের মাংসহাটিগুলোতে শুরু হয় অন্যরকম ব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, মাংস টুকরো ও ভাগ-বাটোয়ারার কাজে দক্ষ সৈয়দপুরের শতাধিক কসাই এবারও রাজধানী ঢাকামুখী হচ্ছেন।

 

ঈদের তিন দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির গরু কাটার কাজ করবেন তারা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই কয়েকদিনেই সৈয়দপুরের কসাইরা সম্মিলিতভাবে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় করবেন।

 

সৈয়দপুর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাদিম কোরাইশি, যিনি এলাকাজুড়ে ‘ছোটু নাদিম’ নামে পরিচিত, তিনি বলেন, এবার ঈদের আগের দিন ১০ জনের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় যাচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যে টিকিটও কাটা হয়েছে। দলটিকে তিন ভাগে ভাগ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাপ-দাদারাও ঢাকায় গিয়ে কোরবানির কাজ করতেন। পশু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া অক্ষত রেখে ছাড়ানো, মাংস পিস করা ও হাড় আলাদা করা সব কাজেই দক্ষতা লাগে। ছোটবেলা থেকেই আমরা এসব শিখে বড় হয়েছি।

 

সৈয়দপুর গোলাহাটের কসাই সুলতান ইতিমধ্যে বিমানে করে ঢাকায় চলে গিয়েছেন। তারা বলেন, মাসখানেক আগেই ঢাকার অনেক পরিবার বুকিং দিয়ে রাখেন। ঢাকার মোহাম্মদপুরে আমার আত্মীয় থাকায় আমি গত ২১ মে তিনজনের একটি দল নিয়ে বিমানে করে ঢাকায় চলে এসেছি। হাজারে ২০০ টাকা রেটে চুক্তি হয়। অর্থাৎ এক লাখ টাকার গরু কাটলে কসাই পান প্রায় ২০ হাজার টাকা। আয় যেহেতু হবে তাই বিমানে যাওয়া বলে জানান তিনি।

 

সৈয়দপুর পৌর মাংসহাটির কসাই ফজলে রাব্বি, নওশাদ আলী, মিন্টু ও খয়রাত হোসেনসহ আরও অনেকে ইতোমধ্যে বিমানের টিকিট বুকিং করেছেন। তারা জানান, ঈদের আগে ঢাকাগামী ফ্লাইটে যাত্রী কম থাকায় অনেক সময় ভাড়া তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। সেই সুযোগেই বিমানে যাওয়া।

 

কলিম মোড় এলাকার কসাই মোস্তাকিম, ইলিয়াস ও জাম্বুর ভাষ্য, সাধারণত চারজনের একটি দল গঠন করে তারা কাজ করেন। ঈদের তিন দিনে একটি দল অন্তত ১২ থেকে ১৬টি গরু জবাই ও মাংস কাটার কাজ করতে পারে। এতে প্রতিটি দলের আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। মোস্তাকিম কসাই বলেন, আগে বাবা ঢাকায় যেতেন। এখন আমি যাচ্ছি। গুলশান-বনানীর অনেক বাসায় নিয়মিত কাজ করি। অনেকে আমাদের মোবাইল নম্বর আগেই সংরক্ষণ করে রাখেন।

 

ছোটু নাদিমের মতে, কসাইয়ের কাজ শুধু শক্তির নয়, এটি একধরনের শিল্পও। নিখুঁতভাবে পশু জবাই, চামড়া অক্ষত রাখা কিংবা সুন্দরভাবে মাংস ভাগ করার জন্য অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রয়োজন। তিনি জানান, একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা’র বাসাতেও কোরবানির গরু জবাইয়ের কাজ করেছেন তিনি।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, সৈয়দপুরের কসাইদের বড় একটি অংশ বিহারি সম্প্রদায়ের। বংশপরম্পরায় তারা মাংস ব্যবসা ও পশু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত। ফলে ঢাকার অনেক পরিবার এখন নাম ধরেই সৈয়দপুরের কসাইদের ডাকেন।

 

রাজধানীর মিরপুরে বসবাসকারীরা জানান, চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন সৈয়দপুরে থাকায় এখানকার অনেক কসাইয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। এবারও ঈদের দিন সকালে বাসায় গিয়ে গরু কাটার জন্য সৈয়দপুরের এক কসাইয়ের সঙ্গে আগেই চুক্তি করেছেন তিনি।

 

কসাই মিন্টুর কণ্ঠে ধরা পড়ে ঈদের অন্য বাবতা। তিনি বলেন, সবাই পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়। কিন্তু আমরা বাড়তি আয়ের আশায় ঢাকায় যাই। সৈয়দপুরে যেখানে এক লাখ টাকার গরু কাটলে ৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়, ঢাকায় একই কাজের জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মেলে।

 

ঈদ শেষে আবার কেউ বিমানে, কেউ ট্রেনে কিংবা বাসে করে ফিরে আসবেন সৈয়দপুরে। তারপর শুরু হবে পুরোনো জীবনের ব্যস্ততা। তবে কোরবানির ঈদ এলেই আবারও ঢাকামুখী হবে এই দক্ষ কসাইদের দল।