ঢাকা , রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
দিল্লির সড়কে তরুণকে চড় মন্ত্রীর, পাল্টা হাত তুললো তরুণও চকলেট দেয়ার কথা বলে অফিসের সব কর্মীকে আইফোন উপহার দিলেন নারী বস সংবিধানে ফিরছে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এআই ছবিতে নারী সেনা সেজে প্রবাসীর সঙ্গে প্রেম, ৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ সারের ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার আ.লীগ নেতা গারদে মোবাইলে কথা বলার ছবি ভাইরাল নারীদের জন্য চালু হচ্ছে আরও ১০০ পিংক বাস সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর: কারাগারে ৩ জন, রিমান্ড শুনানি বুধবার সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট হবে জাসদ কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার ২৭ জন কারাগারে

সারের ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:৩২:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

রংপুরের পীরগাছায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নয়জনের নামের একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীর নামও রয়েছে।

 

একই সঙ্গে সাত ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়ে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আলোচনায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নয়জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আব্দুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জেমি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি, পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক এবং কান্দিতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নাম রয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

 

রংপুর জেলা প্রশাসনের ৩১ আগস্টের বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে একজন করে মোট নয়জন সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

 

সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ

 

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার সাত ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

 

সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

 

এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। তবে সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।

 

ডিলার নিয়োগের অভিযোগের মধ্যে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুর রহিমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কথোপকথনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার নাম উল্লেখ করে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচের প্রসঙ্গ এসেছে। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

অনুসন্ধানে পাওয়া তালিকায় পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী এবং তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সুইটির নাম রয়েছে।

 

স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সুলতানা ফেরদৌসী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী এবং সুইটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী।

 

এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, নয়টি ইউনিয়নে এত আবেদনকারীর মধ্যে একই উপজেলার শীর্ষ দুই রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী কীভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত হলেন। তাদের যোগ্যতা, আবেদনপত্র, গুদাম, ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।

 

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ডিলার প্রার্থী সুইটিকে নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, তিনি আগে পীরগাছা সদর ইউনিয়নের ভোটার ছিলেন। ডিলার নিয়োগের আবেদনের আগে তাকে তাম্বুলপুর ইউনিয়নে ভোটার হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই ইউনিয়ন থেকে তার আবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর রংপুর জেলা বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

 

কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে দেওয়া ওই নোটিশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও সাংগঠনিক বিরোধ সৃষ্টির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

 

নোটিশে তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে ঘটনার তারিখ, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা মন্তব্যের প্রকৃতি এবং নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।

 

জিয়াউর রহমান এর আগে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

 

ফলে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলার পরই একজন দলীয় নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনাটিও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

 

সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগেও বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্নদানগর ইউনিয়নের ডিলার পদপ্রার্থী আব্দুস ছাত্তার সরকার পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

 

অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

 

ডিলারের আবেদনকারী তৈয়ব হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিশেষ করে সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, অডিও ক্লিপ, লিখিত অভিযোগ এবং নয়জনের নামের তালিকা একই সময়ে সামনে আসায় বিষয়টি এখন শুধু দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি বাছাই কমিটির নথি যাচাইও জরুরি।

 

আরেক আবেদনকারী আব্দুস ছালাম বলেন, সারের ডিলার নিয়োগ সরাসরি কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। রংপুরে এর আগেও সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম, মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারির কথা প্রকাশ্যে এসেছে।

 

রংপুর জেলা বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান বলেন, “আমি যা বলেছি এবং ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি তার সব প্রমাণ আমার কাছে আছে। পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা উপজেলা বিএনপির তৃণমূলকে বিভক্ত করে রেখেছেন। সবকিছুর প্রমাণ আমার কাছে আছে।”

 

পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজ তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সারের ডিলার আবেদনে তার স্ত্রীর নাম থাকার কথা স্বীকার করলেও অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন, “আমরা রাজনীতি করি, আমাদের স্ত্রীরাই সংসারসহ ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করে থাকেন।”

 

পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। তবে ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

 

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

 

তবে সদস্য সচিব পরিতোষ চক্রবর্তী বলেন, “উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক দীর্ঘ ১৭ বছর অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে রাজনীতি করেছে। সেক্ষেত্রে তাদের স্ত্রী-কন্যারা ডিলারশিপ পেতেই পারে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।”

 

তিনি আরও বলেন, “কেউ ডিলারশিপ পেলে চা-মিষ্টি খাওয়াতেই পারেন, এটা দোষের কিছু না।”

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কমিটির সভাপতি হিসেবে ইউএনও মহোদয় বলতে পারবেন।”

 

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, “স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে আমরা পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তিনিই জবাব দেবেন।”

 

গত ২০ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগের কথা অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক রংপুর ইসরাত জাহান বলেন, “সুনির্দিষ্টভাবে কেউ আমাকে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

দিল্লির সড়কে তরুণকে চড় মন্ত্রীর, পাল্টা হাত তুললো তরুণও

সারের ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

আপডেট সময় ১০:৩২:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রংপুরের পীরগাছায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নয়জনের নামের একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীর নামও রয়েছে।

 

একই সঙ্গে সাত ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়ে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আলোচনায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নয়জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আব্দুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জেমি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি, পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক এবং কান্দিতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নাম রয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

 

রংপুর জেলা প্রশাসনের ৩১ আগস্টের বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে একজন করে মোট নয়জন সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

 

সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ

 

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার সাত ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

 

সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

 

এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। তবে সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।

 

ডিলার নিয়োগের অভিযোগের মধ্যে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুর রহিমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কথোপকথনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার নাম উল্লেখ করে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচের প্রসঙ্গ এসেছে। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

অনুসন্ধানে পাওয়া তালিকায় পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী এবং তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সুইটির নাম রয়েছে।

 

স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সুলতানা ফেরদৌসী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী এবং সুইটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী।

 

এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, নয়টি ইউনিয়নে এত আবেদনকারীর মধ্যে একই উপজেলার শীর্ষ দুই রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী কীভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত হলেন। তাদের যোগ্যতা, আবেদনপত্র, গুদাম, ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।

 

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ডিলার প্রার্থী সুইটিকে নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, তিনি আগে পীরগাছা সদর ইউনিয়নের ভোটার ছিলেন। ডিলার নিয়োগের আবেদনের আগে তাকে তাম্বুলপুর ইউনিয়নে ভোটার হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই ইউনিয়ন থেকে তার আবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর রংপুর জেলা বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

 

কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে দেওয়া ওই নোটিশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও সাংগঠনিক বিরোধ সৃষ্টির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

 

নোটিশে তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে ঘটনার তারিখ, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা মন্তব্যের প্রকৃতি এবং নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।

 

জিয়াউর রহমান এর আগে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

 

ফলে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলার পরই একজন দলীয় নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনাটিও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

 

সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগেও বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্নদানগর ইউনিয়নের ডিলার পদপ্রার্থী আব্দুস ছাত্তার সরকার পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

 

অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

 

ডিলারের আবেদনকারী তৈয়ব হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিশেষ করে সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, অডিও ক্লিপ, লিখিত অভিযোগ এবং নয়জনের নামের তালিকা একই সময়ে সামনে আসায় বিষয়টি এখন শুধু দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি বাছাই কমিটির নথি যাচাইও জরুরি।

 

আরেক আবেদনকারী আব্দুস ছালাম বলেন, সারের ডিলার নিয়োগ সরাসরি কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। রংপুরে এর আগেও সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম, মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারির কথা প্রকাশ্যে এসেছে।

 

রংপুর জেলা বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান বলেন, “আমি যা বলেছি এবং ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি তার সব প্রমাণ আমার কাছে আছে। পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা উপজেলা বিএনপির তৃণমূলকে বিভক্ত করে রেখেছেন। সবকিছুর প্রমাণ আমার কাছে আছে।”

 

পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজ তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সারের ডিলার আবেদনে তার স্ত্রীর নাম থাকার কথা স্বীকার করলেও অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন, “আমরা রাজনীতি করি, আমাদের স্ত্রীরাই সংসারসহ ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করে থাকেন।”

 

পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। তবে ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

 

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

 

তবে সদস্য সচিব পরিতোষ চক্রবর্তী বলেন, “উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক দীর্ঘ ১৭ বছর অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে রাজনীতি করেছে। সেক্ষেত্রে তাদের স্ত্রী-কন্যারা ডিলারশিপ পেতেই পারে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।”

 

তিনি আরও বলেন, “কেউ ডিলারশিপ পেলে চা-মিষ্টি খাওয়াতেই পারেন, এটা দোষের কিছু না।”

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কমিটির সভাপতি হিসেবে ইউএনও মহোদয় বলতে পারবেন।”

 

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, “স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে আমরা পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তিনিই জবাব দেবেন।”

 

গত ২০ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগের কথা অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক রংপুর ইসরাত জাহান বলেন, “সুনির্দিষ্টভাবে কেউ আমাকে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।