আব্বাস প্রামাণিক দেশের প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন। দীর্ঘ জীবনে ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দেখেছেন তিনি। ভোটার আইডি কার্ডে ১৯০৩ সালে জন্মতারিখ অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ১২৩ বছর।
কর্মজীবনে মাত্র ৬০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি এলাকায় ছেলে মেয়েদের বিনামূল্যে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তার দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের যোগেন্দ্রনগর গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত সদর উদ্দিনের ছেলে। বয়সের ভারে শরীর এখন অনেকটাই দুর্বল আব্বাস প্রামাণিকের। চলাফেরায় লাঠির প্রয়োজন হয়। কানে কম শোনেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়- ১২৩ বছর বয়সেও তিনি চশমা ছাড়াই নিয়মিত নামাজ ও কোরআন শরিফ পড়তে। খালি চোখে স্পষ্ট দেখতে পান। হাতে তার ক্যাসিও ঘড়ি। তার চেয়ে ৩০-৪০ বছর কম বয়সী অনেকেই চশমা ছাড়া দেখতে পারেন না, সেখানে আব্বাসের দৃষ্টিশক্তি এখনো অনেকটাই স্বাভাবিক।
সরেজমিনে জানা গেছে, নাতি-বউয়েরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আব্বাসের দেখাশোনা করেন। তার স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন। তার সমবয়সীদের কেউ এখন আর বেঁচে নেই। কয়েক যুগ একাই কাটিয়েছেন আব্বাস আলী। তার প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে বাতাসা, গরুর দুধ ও মসুর ডাল। একসময় অর্থ-সম্পদও ছিল তার। তবে এখন ভাঙাচোরা একটি ঘরেই বসবাস করছেন তিনি। তবে শত বছরের অনেক স্মৃতি এখন আর তার মনে নেই। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়লেও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন। এখনো নিজের কাজ নিজেই করার চেষ্টা করেন তিনি।
আব্বাসের নাতি শফিকুল ইসলাম বলেন, তার দাদা ধার্মিক মানুষ। সৎভাবে জীবন কাটিয়েছেন। সাদাসিধে জীবনযাপনই ছিল দাদার পছন্দ। গাড়িতে চড়াকেও বিলাসিতা মনে করতেন। তাই বেশিরভাগ সময় হেঁটেই চলাচল করেছেন। এখন শরীর আগের মতো সায় দেয়না। তবু লাঠিতে ভর করে বাড়ির উঠানে হাঁটেন।
আরেক নাতি বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার দাদার ছেলে মেয়েরা সবাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই দাদাকে দেখাশোনার জন্য নির্দিষ্ট কেউ নেই। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তার পাশে থাকার চেষ্টা করছি। দাদার ঘরটিও ভাঙাচোরা। এই বয়সে পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। কিন্তু সবসময় তা জোগাড় করা সম্ভব হয় না।’
আব্বাসের মেয়ে আলিমা বেগম বলেন, ‘৫ বছর বয়সে তার মা মারা যান। এরপর বাবার কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে সৎ ও সহজসরল জীবনযাপন করতে দেখেছেন। কর্মজীবনে তিনি খুবজীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
আলিমা আরো বলেন, ‘আমার আব্বা এখনো চশমা ছাড়া কোরআন পড়েন। অথচ তার সন্তানরাই এখন চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখেন। আব্বা তার সন্তান ও নাতিদের সঙ্গেই থাকেন। সুযোগ পেলেই তিনি পছন্দের খাবার নিয়ে আব্বাকে দেখতে যান।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, আব্বাস প্রামাণিক উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন। বয়সের কারণে তেমন চলাফেরা করতে পারেন না। তার চলাচলের সুবিধার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির সামনে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও ফাহমিদা বলেন, ‘আব্বাস আলীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে খুবজীপুর প্রবীণ সেবা কেন্দ্র। উপজেলা প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে তাকে সহযোগিতা করে আসছে।’

ডেস্ক রিপোর্ট 


















