ঢাকা , শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
শেষ আবদার পূরণ হলো না: পিআইসিইউতে বাবার সামনে পানির জন্য কাঁদতে কাঁদতেই নিভে গেল আকিরা বাউফলে তিনটি বসতঘর পুড়ে ছাই, প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি ইরানের হরমুজ নিয়ন্ত্রণ: ক্রিপ্টোতে টোল আদায়, ব্যারেল প্রতি গুনতে হবে ১ ডলার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সাক্ষাৎ, ফের খুলছে শ্রমবাজার আবু সাঈদের মরদেহে গুলির অস্তিত্ব প্রমাণ হয়নি: আসামিপক্ষের আইনজীবী হেলিকপ্টারে গিয়ে নয়, নিজ কক্ষে বসেই দেখব কোন স্কুলে কী হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী ভোট বর্জন করলেন শেরপুর-৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে রাশিয়ান দূতাবাসে মাওলানা মামুনুল হক এই সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচনেই কারচুপি-অনিয়ম ঘটছে: পরওয়ার ‘জঙ্গি এমপি’ অপবাদে খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যের বিশেষ অধিকারের নোটিশ

স্বপ্ন ছিল গ্রিস: ভিটেমাটিও গেল সঙ্গে ১৮ লাখ টাকাও, সন্তান হারালেও লাশ পাবেন না দুলন মিয়া

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১২:১০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
  • ৪৬ বার পড়া হয়েছে

এবার ইউরোপের নীল জলরাশি আর সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর সুনামগঞ্জের ১২ জন তরুণের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভে গেছে উত্তাল ভূমধ্যসাগরে। প্রিয়জনদের নিথর দেহগুলো শেষবারের মতো দেখার সুযোগটুকুও হারিয়েছে পরিবারগুলো। যার ফলে সুনামগঞ্জ জেলা জুড়ে এখন কেবলই শোকের মাতম আর বুকফাটা আর্তনাদ। জানা যায়, লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার এই ভয়ঙ্কর নেশা কেড়ে নিয়েছে এই ১২টি তাজা প্রাণ। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে সুনামগঞ্জের আকাশবাতাস এখন বিলাপ আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। এদিকে নিহতদের একজন নাঈম আহমেদ (২৪) সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের দুলন মিয়ার তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট তিনি। গ্রামে বাবার চায়ের দোকানে সহযোগিতা করতেন তিনি। তবে এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৭ ডিসেম্বর ঢাকা ছাড়েন এই তরুণ। 

এ জন্য দুলন মিয়া ১৬ শতকের ঘরভিটা বন্ধক রাখেন। নাঈমকে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৮ লাখ টাকা দালালকে দিয়েছেন তিনি। দুলন মিয়া বলেন, ছেলেও গেল, বাড়িঘরও হারালাম। ঋণ শোধ করে ভিটেমাটি উদ্ধার করার মতো অবস্থা আমার নেই। ছেলের লাশও পেলাম না।  তিনি আরও বলেন, যাওয়ার সময় ছেলের হাতে ৭০০ ডলার দিই। ২৫ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল সেট কিনে দিয়েছি। বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর থেকে একবারও ছেলের সঙ্গে কথা হয়নি। তবে অন্যের মোবাইল দিয়ে মেসেজ পাঠাত। খাবার ও পানির কষ্টের কথা বলত। দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাত। ২০ মার্চ সর্বশেষ খুদে বার্তা পাঠায়।

নৌকায় চড়ে ইউরোপের উদ্দেশে সাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন নাঈমের মতো আরও অনেক বাংলাদেশি। দালালরা অনেক বড় স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত নিয়ে যায়। সাগর পথে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। নিহত কারও লাশ মেলেনি। সাগরে নিথর দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, রাবারের নৌকায় করে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসের দিকে নেওয়া হচ্ছিল কিছু বাংলাদেশিকে। এদের মধ্যে মৃত ১৮ জনকে দুদিন নৌকায় রেখে পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। জীবিত উদ্ধার ২১ বাংলাদেশিসহ ২৬ জনকে রাখা হয়েছে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে। তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ। 

শনিবার বেঁচে ফেরা একই নৌকার ২১ বাংলাদেশি গ্রিসের কোস্টগার্ডকে জানান, ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন। ১৮ বাংলাদেশি ছাড়া বাকি চারজন বিভিন্ন দেশের নাগরিক। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছয় দিন ভাসছিল। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।  বাংলাদেশ মিশন ইতোমধ্যে গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং নিহতদের মরদেহের সন্ধান পেলে ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজা হচ্ছে।  সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন জানান, একটি ছোট নৌকায় তারা ৪৩ জন ছিলেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। তাদের একটি বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বলে শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। 

এদিকে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা বলেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশি মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দূতাবাস। যেসব দালাল তাদের নিয়েছে তাদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। ভূমধ্যসাগরে নিহতদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুরের পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজারের একজন রয়েছেন। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের বাসিন্দাও রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থেকে তাদের মৃত্যু হয়েছে। 

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

শেষ আবদার পূরণ হলো না: পিআইসিইউতে বাবার সামনে পানির জন্য কাঁদতে কাঁদতেই নিভে গেল আকিরা

স্বপ্ন ছিল গ্রিস: ভিটেমাটিও গেল সঙ্গে ১৮ লাখ টাকাও, সন্তান হারালেও লাশ পাবেন না দুলন মিয়া

আপডেট সময় ১২:১০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

এবার ইউরোপের নীল জলরাশি আর সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর সুনামগঞ্জের ১২ জন তরুণের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভে গেছে উত্তাল ভূমধ্যসাগরে। প্রিয়জনদের নিথর দেহগুলো শেষবারের মতো দেখার সুযোগটুকুও হারিয়েছে পরিবারগুলো। যার ফলে সুনামগঞ্জ জেলা জুড়ে এখন কেবলই শোকের মাতম আর বুকফাটা আর্তনাদ। জানা যায়, লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার এই ভয়ঙ্কর নেশা কেড়ে নিয়েছে এই ১২টি তাজা প্রাণ। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে সুনামগঞ্জের আকাশবাতাস এখন বিলাপ আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। এদিকে নিহতদের একজন নাঈম আহমেদ (২৪) সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের দুলন মিয়ার তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট তিনি। গ্রামে বাবার চায়ের দোকানে সহযোগিতা করতেন তিনি। তবে এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৭ ডিসেম্বর ঢাকা ছাড়েন এই তরুণ। 

এ জন্য দুলন মিয়া ১৬ শতকের ঘরভিটা বন্ধক রাখেন। নাঈমকে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৮ লাখ টাকা দালালকে দিয়েছেন তিনি। দুলন মিয়া বলেন, ছেলেও গেল, বাড়িঘরও হারালাম। ঋণ শোধ করে ভিটেমাটি উদ্ধার করার মতো অবস্থা আমার নেই। ছেলের লাশও পেলাম না।  তিনি আরও বলেন, যাওয়ার সময় ছেলের হাতে ৭০০ ডলার দিই। ২৫ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল সেট কিনে দিয়েছি। বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর থেকে একবারও ছেলের সঙ্গে কথা হয়নি। তবে অন্যের মোবাইল দিয়ে মেসেজ পাঠাত। খাবার ও পানির কষ্টের কথা বলত। দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাত। ২০ মার্চ সর্বশেষ খুদে বার্তা পাঠায়।

নৌকায় চড়ে ইউরোপের উদ্দেশে সাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন নাঈমের মতো আরও অনেক বাংলাদেশি। দালালরা অনেক বড় স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত নিয়ে যায়। সাগর পথে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। নিহত কারও লাশ মেলেনি। সাগরে নিথর দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, রাবারের নৌকায় করে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসের দিকে নেওয়া হচ্ছিল কিছু বাংলাদেশিকে। এদের মধ্যে মৃত ১৮ জনকে দুদিন নৌকায় রেখে পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। জীবিত উদ্ধার ২১ বাংলাদেশিসহ ২৬ জনকে রাখা হয়েছে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে। তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ। 

শনিবার বেঁচে ফেরা একই নৌকার ২১ বাংলাদেশি গ্রিসের কোস্টগার্ডকে জানান, ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন। ১৮ বাংলাদেশি ছাড়া বাকি চারজন বিভিন্ন দেশের নাগরিক। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছয় দিন ভাসছিল। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।  বাংলাদেশ মিশন ইতোমধ্যে গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং নিহতদের মরদেহের সন্ধান পেলে ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজা হচ্ছে।  সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন জানান, একটি ছোট নৌকায় তারা ৪৩ জন ছিলেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। তাদের একটি বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বলে শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। 

এদিকে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা বলেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশি মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দূতাবাস। যেসব দালাল তাদের নিয়েছে তাদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। ভূমধ্যসাগরে নিহতদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুরের পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজারের একজন রয়েছেন। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের বাসিন্দাও রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থেকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।