যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা চলছে। তবে চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে দুই পক্ষই লুকোচুরি করছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, কূটনৈতিক সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় চুক্তির অনুলিপি এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দাবি করেছে, তাদের হাতে শান্তিচুক্তির অনুলিপি এসেছে। সেখানে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া, ইরানের জন্য কিছু আর্থিক প্রণোদনা এবং তেহরানের পক্ষ থেকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করার অঙ্গীকার উঠে এসেছে।
সিএনএন দাবি করেছে, চুক্তির অনুলিপি একজন মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে পেয়েছে তারা। চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে নথিটি দেখেছেন, এমন একজন কূটনীতিক এর বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও দুটি কূটনৈতিক সূত্রও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
তবে নথির ভাষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষের গোপনীয়তার কারণে সিএনএনের হাতে আসা খসড়াটি-ই চূড়ান্ত নথির অনুলিপি, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারিগরি বিষয়গুলোও এখনো চূড়ান্ত করা হচ্ছে, ফলে ভাষায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেছেন, সিএনএনের হাতে আসা অনুলিপি আর মূল শান্তিচুক্তি এক নয়।
১ – ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করছে। উভয় পক্ষ অঙ্গীকার করছে যে, তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো বৈরি পদক্ষেপ নেবে না এবং শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য অনুচ্ছেদের বিধান নিশ্চিত করা হবে।
২ – ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে। একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩ – ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করছে।
৪ – এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনও বাধা বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে সমুদ্রপথে চলাচল স্বাভাবিক করবে। জাহাজ চলাচলের পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ব সময়ে ইরানের অংশে যে পরিমাণ ছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহারেরও অঙ্গীকার করছে।
৫ – সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইরান অবিলম্বে পদক্ষেপ নেবে যাতে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং ওমান সাগর থেকে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাতা মাইন নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
৬ – যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে। যাতে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করা হবে। এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করা হবে।
৭ – যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গভর্নর বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮ – ইরান পুনর্ব্যক্ত করছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না। সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের ভবিষ্যৎ এবং ইরানের পারমাণবিক চাহিদাসহ পারমাণবিক কর্মসূচি-সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে যথাযথভাবে সমাধান করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধান নিশ্চিত করা হবে।
৯ – চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করবে না।
১০ – এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদিত দ্রব্য রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র জারি করবে। এর সঙ্গে ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
১১ – চূড়ান্ত চুক্তির দিকে আলোচনার অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়ে ইরানের জব্দকৃত তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে সম্পূর্ণ ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে। এসব অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত সুবিধাভোগীকে প্রদানের জন্য ব্যবহার করা যাবে এবং তা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারযোগ্য থাকবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব অনুমতি ও লাইসেন্স প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
১২ – চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে তা মেনে চলা নিশ্চিত করতে একটি তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে একমত হয়েছে দুই পক্ষ।
১৩ – এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে—এ মর্মে নিশ্চয়তা পাওয়ার পর অবশিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় প্রবেশ করবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
১৪ – চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























