মেহেরপুরে ভুয়া হত্যা মামলার খসড়া (ড্রাফট) তৈরি করে প্রতারণা করছে একটি চক্র। নাম যুক্ত করে বিবাদীদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে পাঠানো হচ্ছে মামলার খসড়া নথি। সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে একটি বার্তা।
সম্প্রতি এমন একটি মামলার খসড়া নথি পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় বিবাদী করা হয়েছে ৩৮ জনকে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার, অনলাইন জুয়ার এজেন্ট এবং অতীতে সাইবার স্ক্যামিংয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি।
মামলার খসড়া নথি সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্টদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে বলা হচ্ছে, ‘আপনার নামে মার্ডার মামলা হচ্ছে, টাইপিং করা শেষ। যেকোনো সময় আদালতে ফাইলিং হবে। আসামির তালিকা থেকে নাম কাটাতে চাইলে মামলার বাদী অথবা আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
বিবাদী করা একজনের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামলার খসড়ায় গাংনী আমলী আদালতের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। বাদী হিসেবে নাম রয়েছে গাংনী পৌরসভার চৌগাছা এলাকার বাসিন্দা রেজানুল হক ঈমনের। তিনি জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
এশিয়া পোস্টের কাছে আসা মামলার খসড়া নথি নিয়ে যাচাই করতে যোগাযোগ করা হয় গাংনী আমলী আদালতে। তবে গাংনী আমলী আদালতে এমন কোনো মামলার আবেদন করা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য যাচাইয়ে এশিয়া পোস্টকে সহায়তা করেন মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য আল মামুন অনল। এ বিষয়ে আইনজীবী আল মামুন অনল বলেন, ধারণা করা হচ্ছে কোনো সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারা মামলা সংক্রান্ত ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের জন্য এসব করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, ভুয়া মামলার খসড়া নথিতে বাদীর নাম থাকা রেজানুল হক ঈমন অতীতে দুটি মামলা করেছিলেন। এর মধ্যে একটি ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট গাংনী থানায় নথিভুক্ত হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন ধারায় ৩৫ জনের নাম উল্লেখ এবং ১০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয় মামলায়। আরেকটি মামলা হয় ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল মেহেরপুরের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। সেখানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৫০ জনের নাম উল্লেখ এবং দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
ভুয়া মামলার খসড়ার বিষয়ে জানতে গত কয়েকদিন রেজানুল হক ঈমনের সঙ্গে ফোনে কল দিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কল রিসিভ না করায় পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তাকে না পেয়ে এশিয়া পোস্ট যোগাযোগ করে মেহেরপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আকিব জাভেদ সেনজিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থতার কারণে চেকআপের জন্য ঢাকায় আছি। এরকম একটি বিষয় আমিও শুনেছি। মেহেরপুরে ফিরে ঈমনের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত ঘটনা কী, সেটি আপনাকে জানাব।’
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুর ২টা ২২ মিনিট, ২টা ২৭ মিনিট, ২টা ৩১ মিনিট, ৩টা ১০ মিনিট এবং বিকেল ৪টা ৬ মিনিটে পাঁচবার ফোনে কল এবং দুপুর ২টা ৩৩ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে রেজানুল হক ঈমনের সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরে বিকেল ৪টা ১৪ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে এশিয়া পোস্টের পক্ষে রেজানুল হক ঈমনকে জানানো হয়, বক্তব্য না পেলে তা ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ করা হবে। এরপর ঈমন হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে জানান, গতকাল থেকে তিনি বিভিন্ন জনের কাছে হত্যা মামলা সংক্রান্ত বিষয়টি শুনছেন।
তিনি জানান, এসব ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। অতীতে তার করা দুটি মামলা থেকেও তিনি কোনো আসামির সঙ্গে অর্থ বাণিজ্য করেননি।
এ বিষয়ে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে গুরুতর ধারার নাম ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হলে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট থানা অথবা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অভিযোগ দিতে পারে। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 























